বাম হাতে জ্বলজ্বল করছে ‘সুমন’ লেখা উল্কি। শিখার জীবনের ছন্দে আজও ছুঁয়ে যায় তাঁর কথাই। দুই সন্তানের মায়ের চোখ ছলছল করে ওঠে চলতি বছরের অভিশপ্ত দিনের কথা ভাবলে! ঘুম আসে না আর, শুধুই মনে পড়ে প্রায় ১৬ বছরের ভালোবাসার সংসারের কথা। সুমন কর্মকার, শ্যামনগর এলাকার বাসিন্দার আকস্মিক মৃত্যু হয়েছিল অভিশপ্ত তারাতলায়। ঘটনার দিন সকালে স্ত্রীকে ভিডিও কলের পর আর খোঁজ পাওয়া যায়নি তাঁর! দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টার দুর্বিষহ অপেক্ষার পর বিকৃত মুখের সুমনের খোঁজ মেলে! প্রিয়জনের দেহ আঙুল দেখে চিনতে পারে পরিবার! পেটের জ্বালায় কাজে গিয়ে প্রাণ হারানোর জ্বলন্ত নিদর্শন দেখে গোটা দেশ!
সুমন হারিয়ে গিয়েছেন কয়েক মাস আগেই। আগুনে পুড়েছে ভালো থাকার সব অঙ্গীকার। বর্তমানে দুই ছেলেকে নিয়ে বাবার কাছে থাকেন শিখা। সুমনের পুরনো সংসারে গেলেই কান্না বাড়ে শিখার। চিন্তা ঘিরে ধরে সব। যদিও সরকারি সাহায্য মিলেছে ঘটনার পরেই। কিন্তু স্বামী-হারা স্ত্রী চান সঠিক বিচার! অকারণে দিনমজুরের মৃত্যুতে দায়ীদের কঠিন শাস্তি খোঁজেন তিনি।
শত আলোর পথে শিখার সহযাত্রী যেন শোক! তাঁর কথায়, “গতবার ও কাজ করে টাকা এনে বলেছিল ছেলেদের জন্য, আমার জন্য নতুন জামাকাপড় কিনতে (Durga Puja 2026)। পুজোর আগে থেকে পুরো মাসটা আমরা আনন্দ করতাম। ভালো খেতাম। একসঙ্গে ঘুরতে যেতাম। এবার সব শেষ! আর কিছুই নেই, দিনরাত ওর কথা মনে পড়ে শুধু!” শিখা বলছেন, “সেদিন অর্থাৎ ২৪ জুন ঘটনার ঘণ্টা দেড়েক আগে ভিডিও কলে কথা হয়েছিল শেষবার। সুমন জানতে চেয়েছিলেন ছেলের কথা। কিন্তু আর ফোনে পাওয়া যায়নি তাঁকে! ও বাঁচতে চেয়েছিল শেষ মুহূর্তে, বলতে বলতে ফের ডুকরে কেঁদে ওঠেন সুমনের প্রেয়সী!”
সব বাবার মতোই সন্তান অন্তপ্রাণ ছিল সুমনের। কলকাতায় কাজের পরে বাড়ি ফিরে স্নেহের পরশে ভরতেন সব! আর হয়নি কিছুই। নিষ্পাপ ছেলেটির বিকৃত মুখের যন্ত্রণাবিদ্ধ মৃত্যু বারবার মনে পড়ে শিখা কর্মকারের। তিনি একবারও বুঝতে পারেননি এমন ঘটতে পারে। শিখা বলছেন, “উপর থেকে ঢালাই চলছিল, সুমন আমাকে দেখিয়েছিল। এমন দেখিনি, ভেঙে পড়ার জন্য দায়ী ওই কাজের দায়িত্বে ছিলেন যাঁরা!”

একের পর এক আর্তনাদে নিখোঁজ হন শ্যামনগরের সুমন কর্মকার। তাঁর মতোই শেষ হয়েছে অনেক পরিবার। দুই সন্তানের বাবাকে হারিয়ে আজও পথে-প্রান্তরে দুঃখযাপনে বিচার খোঁজেন শিখা। অসম এক লড়াইয়ের পথে সন্তানদের নিয়ে যেন লেখেন সুমন-স্মৃতির দিননামচা!
