পার্বত্য চট্টগ্রাম আবারও এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখে: এই অঞ্চল কোন পথে এগোচ্ছে—শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানের দিকে, নাকি নতুন করে সশস্ত্র সংঘাতের দিকে? ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পর প্রত্যাশা ছিল, রাজনৈতিক সমাধান, জাতিগত সম্প্রীতি, ভূমির অধিকার, কার্যকর স্থানীয় শাসন ও টেকসই উন্নয়নের পথ সুগম হবে। কিন্তু চুক্তির বিভিন্ন অমীমাংসিত বিষয় এবং রাজনৈতিক সংগঠন ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে আস্থার ঘাটতি সেই প্রত্যাশাকে পূর্ণতা পেতে দেয়নি।
সশস্ত্র হামলা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, অস্ত্রের বিস্তার ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার খবর এ অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায়। ২০২৪ সালে থানচিতে ব্যাংক লুট, থানায় হামলা ও অস্ত্র ছিনতাইয়ের ঘটনা এবং ২০২৬ সালের এই অক্টোবর মাসে সাজেকে অবরোধ ও গোলাগুলির যে ঘটনা, তা নিরাপত্তা ও জনজীবনের ঝুঁকি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। তবে প্রতিটি ঘটনার দায়, উদ্দেশ্য ও পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারণে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও স্বাধীন যাচাই জরুরি। কারণ, এ সংকটকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক ও সামাজিক পটভূমি আড়ালে থেকে যাবে। আবার রাজনৈতিক বঞ্চনা বা চুক্তি বাস্তবায়নের ঘাটতিকে সশস্ত্র অপরাধের অজুহাত হিসেবেও গ্রহণ করা যায় না। স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রশাসনের আইনসম্মত নিরাপত্তা-দায়িত্ব, রাজনৈতিক জবাবদিহি, মানবাধিকার, স্থানীয় অংশগ্রহণ এবং শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
পাহাড়ি রাজনীতির মূল সংকট
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সংঘাত থেকে রাজনৈতিক সমাধানের দিকে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছিল; কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরই স্থায়ী শান্তির নিশ্চয়তা নয়। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি, ভূমি কমিশনের কার্যকারিতা, আঞ্চলিক ও জেলা পরিষদের ক্ষমতা, প্রশাসনিক দায়িত্ব, পুনর্বাসন, প্রতিনিধিত্ব এবং রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রশ্ন রয়ে গেছে। এসব বিষয়ে অগ্রগতি ও সীমাবদ্ধতা তথ্যভিত্তিকভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি।
নির্বাচন ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও বহু মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক অধিকার, সাংস্কৃতিক মর্যাদা ও ভূমির নিরাপত্তা নিয়ে অসন্তোষ থাকতে পারে। অন্যদিকে রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা, সীমান্ত-নিরাপত্তা এবং সাধারণ নাগরিকের জীবন ও সম্পদের সুরক্ষা বড় উদ্বেগ। এই ভিন্ন অভিজ্ঞতার মধ্যে সংলাপ ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে অবিশ্বাস আরও গভীর হয়।
সংকটের অন্তত তিনটি দিক গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। প্রথমত, রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর বিভাজন ও পারস্পরিক প্রতিযোগিতা শান্তিপূর্ণ প্রতিনিধিত্বকে দুর্বল করতে পারে। দ্বিতীয়ত, তরুণদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হলে হতাশা বাড়তে পারে। তৃতীয়ত, রাষ্ট্র ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে আস্থার ঘাটতি থাকলে প্রশাসনিক উদ্যোগের গ্রহণযোগ্যতা কমে যায়। এসব কারণের গুরুত্ব অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীভেদে ভিন্ন হতে পারে; তাই সাধারণীকরণের বদলে স্থানীয় বাস্তবতা যাচাই করা প্রয়োজন।
সশস্ত্র সংঘাতের বদলে অপরাধ ও প্রভাবের রাজনীতি?
পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র তৎপরতার ইতিহাস দীর্ঘ। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বোঝার জন্য রাজনৈতিক সংঘাত, সশস্ত্র সংগঠনের কার্যক্রম এবং অপরাধমূলক অর্থনীতির মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি। চাঁদাবাজি, অপহরণ, অস্ত্র ছিনতাই, ব্যাংক লুট, জমি দখল বা সরকারি স্থাপনায় হামলার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সেগুলোর বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও আইনসম্মত ব্যবস্থা নিতে হবে—অভিযুক্ত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক।
যখন অস্ত্রের ব্যবহার অর্থ, স্থানীয় প্রভাব বা চলাচল নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, ব্যবসা, শিক্ষা, যাতায়াত ও পর্যটন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনার ভিত্তিতে গোটা জনগোষ্ঠী বা রাজনৈতিক ধারাকে দায়ী করা উচিত নয়। প্রতিটি ঘটনার দায় নির্ধারণে যাচাইযোগ্য প্রমাণ, স্বচ্ছ তদন্ত এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ অপরিহার্য।
স্থানীয় অসন্তোষ ও সীমান্তের বাস্তবতা
ভূমি, বন, নদী, পাহাড় ও জীবিকার ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উন্নয়ন, সড়ক, পর্যটন, বাণিজ্যিক বৃক্ষরোপণ ও অন্যান্য প্রকল্প সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে; কিন্তু স্থানীয় মানুষের মতামত, অধিকার ও সুবিধা বণ্টন উপেক্ষিত হলে বিরোধও বাড়তে পারে। উন্নয়ন প্রকল্পের মূল্যায়নে তাই শুধু অবকাঠামো বা বিনিয়োগ নয়, স্থানীয় অংশগ্রহণ, পরিবেশগত প্রভাব, জীবিকা এবং ক্ষতিপূরণের ন্যায্যতাও বিবেচনা করা দরকার।
দুর্গম ভূপ্রকৃতি ও আন্তর্জাতিক সীমান্তের নৈকট্য অবৈধ অস্ত্র, মাদক, মানবপাচার এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনে বাস্তব চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় তথ্যভিত্তিক সীমান্ত-সমন্বয় দরকার। তবে প্রমাণ ছাড়া কোনো বিদেশি শক্তি বা বহিঃস্থ পক্ষকে দায়ী করলে প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান ব্যাহত হয়। একইভাবে বহিঃসীমান্তের ঝুঁকিকে একেবারে উপেক্ষা করাও যথাযথ হবে না। অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ, অপরাধের নেটওয়ার্ক ও সীমান্ত-সংযোগ—প্রতিটি বিষয় আলাদা আলাদা বিশ্লেষণ করে কর্মপন্থা নির্ধারণ করা উচিত।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়
রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলোর প্রথম দায়িত্ব হলো সহিংসতার বিরুদ্ধে দ্ব্যর্থহীন অবস্থান নেওয়া। সশস্ত্র হামলা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, ব্যাংক লুট বা অস্ত্র ছিনতাই কোনোভাবেই বৈধ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়। কোনো গোষ্ঠীকে দলীয় সুবিধার জন্য ব্যবহার করা, সহিংসতার অভিযোগে নীরব থাকা কিংবা জাতিগত বিভাজনকে রাজনৈতিক লাভের উপায় বানানো শান্তির সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের করণীয় হলো—সহিংসতা ও অপরাধের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ও ধারাবাহিক অবস্থান নেওয়া। পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে অবিশ্বাস বা বিদ্বেষ উসকে না দেওয়া। শান্তিচুক্তির অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধানে সময়সীমাভিত্তিক রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তোলা। স্থানীয় সরকার ও প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠানে বিশ্বাসযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা। তরুণদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো। দলীয় প্রতিযোগিতা ও স্থানীয় বিরোধের নিষ্পত্তিতে আইন ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতি মানা।
শান্তি কোনো একক দলের প্রকল্প নয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অধিকার স্বীকার, বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি—এসবকে রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ করতে হবে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের প্রয়োজনে।
গণমাধ্যমের দায়িত্ব: যাচাই, প্রেক্ষাপট ও সংযম
সশস্ত্র হামলা বা গোলাগুলির সময় সংবাদমাধ্যমের কাজ অত্যন্ত সংবেদনশীল। যাচাইহীন খবর, অনুমাননির্ভর দায় আরোপ, উসকানিমূলক শিরোনাম কিংবা কোনো জাতিগোষ্ঠীকে সম্মিলিতভাবে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন উত্তেজনা বাড়াতে পারে। তাই নিহত-আহতের সংখ্যা, অভিযুক্তের পরিচয়, ঘটনার স্থান-কাল এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নির্ভরযোগ্যভাবে যাচাই করা জরুরি।
দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার জন্য কয়েকটি নীতি গুরুত্বপূর্ণ: পাহাড়ি বা বাঙালি কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো যাবে না; স্বাধীনভাবে যাচাই না করা অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে প্রচার করা যাবে না; ভুক্তভোগী ও তথ্যদাতার নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা বিবেচনা করতে হবে; নিরাপত্তা অভিযানের এমন কৌশলগত তথ্য প্রকাশে সতর্ক থাকতে হবে, যা মানুষের জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে পারে এবং সরকারি বক্তব্যের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা ও স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্যও তুলে ধরতে হবে।
গণমাধ্যমের কাজ কেবল তাৎক্ষণিক ঘটনা জানানো নয়, বরং তার সামাজিক, রাজনৈতিক ও মানবিক প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করা। আতঙ্ক নয়—যাচাই করা তথ্য, ভারসাম্যপূর্ণ ভাষা এবং সমাধানমুখী অনুসন্ধানই হওয়া উচিত পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর এলাকায় সাংবাদিকতার ভিত্তি।
সুশীল সমাজ, গবেষক ও বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা
সুশীল সমাজ, গবেষক ও বুদ্ধিজীবীদের দায়িত্ব হলো স্বাধীন বিশ্লেষণ, তথ্যভিত্তিক বিতর্ক এবং জবাবদিহির পরিবেশ তৈরি করা। তাঁদের কাজ কোনো পক্ষের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি হওয়া নয়; বরং সশস্ত্র অপরাধ, মানবাধিকার লঙ্ঘন, ভূমি-বিরোধ, উন্নয়নের অসম বণ্টন এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি—সব বিষয়কে প্রমাণ ও ন্যায়ের মানদণ্ডে পরীক্ষা করা।
এ জন্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে নিয়মিত মূল্যায়ন, ভূমি ও জীবিকার বিরোধের নথিবদ্ধকরণ, নারী ও তরুণদের অভিজ্ঞতা অন্তর্ভুক্ত করা, পাহাড়ি-বাঙালি সম্প্রদায়ের মধ্যে সংলাপের সুযোগ সৃষ্টি এবং গুজব ও বিদ্বেষের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর আইনসম্মত আচরণ, অভিযোগ তদন্তের স্বচ্ছতা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহিংসতার জবাবদিহিও আলোচনায় থাকতে হবে।
স্থানীয় জনগণ ও নিরাপত্তার পরিবেশ
স্থায়ী নিরাপত্তার ভিত্তি হলো স্থানীয় মানুষের আস্থা। জনগণ যদি মনে করে প্রশাসন কেবল সংকটের সময় অভিযান চালায়, অথচ ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও জীবিকার মতো দৈনন্দিন প্রশ্নে সাড়া দেয় না, তাহলে রাষ্ট্র ও নাগরিকের দূরত্ব বাড়তে পারে। তাই নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রণয়ন ও মূল্যায়নে স্থানীয় অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, হেডম্যান-কারবারি, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, নারী প্রতিনিধি, তরুণ, ব্যবসায়ী, পরিবহনকর্মী ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। তবে জনগণকে শুধু তথ্যদাতা হিসেবে ব্যবহার করে তাঁদের সুরক্ষা উপেক্ষা করা যাবে না। অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা, তথ্যদাতার পরিচয় রক্ষা এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান নিশ্চিত করা জরুরি।
রাষ্ট্রের দৃঢ়তা ও সংবেদনশীলতা
নাগরিকের জীবন, সম্পদ ও চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। সশস্ত্র হামলা, অপহরণ, ব্যাংক লুট, অস্ত্র ছিনতাই ও সরকারি স্থাপনায় আক্রমণের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা অপরিহার্য। নিরাপত্তা কার্যক্রম হতে হবে লক্ষ্যনির্দিষ্ট, আইনসম্মত ও জবাবদিহিমূলক।
তবে নিরাপত্তা অভিযান একা দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংকটের সমাধান করতে পারে না। ভূমি-বিরোধ, প্রতিনিধিত্ব, স্থানীয় শাসন, তরুণদের ভবিষ্যৎ ও চুক্তি বাস্তবায়নের প্রশ্ন অমীমাংসিত থাকলে অস্থিরতার কারণগুলো টিকে থাকতে পারে। রাষ্ট্রকে তাই একই সঙ্গে দৃঢ় ও সংবেদনশীল হতে হবে—সশস্ত্র অপরাধের বিরুদ্ধে দৃঢ়, আর সাধারণ পাহাড়ি ও বাঙালি নাগরিকের অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রশ্নে সমানভাবে দায়বদ্ধ।
শান্তিপূর্ণ উত্তরণের রোডম্যাপ
পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তির জন্য ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়নযোগ্য, সময়সীমাবদ্ধ ও জনসম্মুখে মূল্যায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনা বেশি জরুরি। এর প্রধান উপাদান হতে পারে শান্তিচুক্তির অমীমাংসিত বিষয় চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার ও সময়সীমাসহ বাস্তবায়ন পরিকল্পনা প্রকাশ। ভূমি কমিশনের কার্যকারিতা, স্বাধীনতা ও জবাবদিহি জোরদার করা এবং ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তির স্বচ্ছ প্রক্রিয়া গড়ে তোলা। আঞ্চলিক ও জেলা পরিষদসহ প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা এবং স্থানীয় অংশগ্রহণ বৃদ্ধি। ভূমি, বন, নদী ও জীবিকা-সংক্রান্ত বিরোধের ন্যায্য ও দ্রুত নিষ্পত্তি। তরুণদের শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা সহায়তার সুযোগ বাড়ানো। নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা, অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব নিশ্চিত করা। স্থানীয় জনগণের সঙ্গে নিয়মিত নিরাপত্তা সংলাপ এবং অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা চালু রাখা। সীমান্ত-সমন্বয়ের মাধ্যমে অবৈধ অস্ত্র, মাদক, মানবপাচার ও অপরাধের অর্থপ্রবাহ মোকাবিলা। পর্যটন ও উন্নয়ন প্রকল্পে স্থানীয় জনগণের অর্থবহ অংশগ্রহণ, পরিবেশ সুরক্ষা ও সুবিধার ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা। সশস্ত্র অপরাধের বিরুদ্ধে আইনসম্মত ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যক্রমে কার্যকর জবাবদিহি বজায় রাখা। সংকটকালে দ্রুত, স্বচ্ছ ও যাচাইকৃত তথ্য প্রকাশের ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
এই কর্মপরিকল্পনার অগ্রগতি নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা এবং স্থানীয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি ও স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের মাধ্যমে তা মূল্যায়ন করা উচিত।
সংঘাত নয়, রাজনৈতিক উত্তরণ
পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান উদ্বেগ একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা: রাজনৈতিক সমাধানের পথ সংকুচিত হলে সহিংসতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। কিন্তু এই ঝুঁকির মোকাবিলা কোনো জনগোষ্ঠীকে সন্দেহের চোখে দেখে বা কেবল বলপ্রয়োগের ওপর নির্ভর করে সম্ভব নয়। প্রয়োজন অপরাধের নিরপেক্ষ বিচার, মানুষের অধিকার ও মর্যাদার সুরক্ষা, শান্তিচুক্তির অমীমাংসিত বিষয়ের বাস্তবসম্মত সমাধান এবং স্থানীয় মানুষের আস্থা অর্জন।
রাজনৈতিক দলকে সহিংসতার বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে; গণমাধ্যমকে তথ্য যাচাই ও সংযম বজায় রাখতে হবে; গবেষক ও সুশীল সমাজকে প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ ও জবাবদিহির দাবি তুলতে হবে; রাষ্ট্রকে নিরাপত্তা ও অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে; আর স্থানীয় জনগণকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অর্থবহ অংশীদার করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পাশাপাশি জনআস্থা, ন্যায়বিচার, প্রতিনিধিত্ব, জনঅংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক জবাবদিহির সমন্বয়ে হওয়াই কর্তব্য।
