যুক্তরাষ্ট্রে লাখ লাখ ডলারের বাড়ির মালিক হয়েও অনেক মানুষ ক্রেডিট কার্ডের ঋণের জন্য ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দেন। অথচ বছরের পর বছর মর্টগেজের কিস্তি পরিশোধ করে তাঁরা নিজেদের বাড়িতে উল্লেখযোগ্য সম্পদ গড়ে তুলেছেন। সেই সম্পদ কাজে লাগিয়ে কম সুদে ঋণ নেওয়ার সুযোগ থাকলে এত বেশি সুদ দেওয়ার প্রয়োজন কী? আমেরিকার প্রচলিত ঋণব্যবস্থার এই অসংগতি নজরে এসেছিল টরন্টোয় বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক তরুণের। প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে তিনি বের করেন ভিন্ন একটি পথ। তাঁর নাম সাদি খান।
সাদি খান এখন যুক্তরাষ্ট্রের আলোচিত আর্থিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান Aven-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। তাঁর প্রতিষ্ঠানের মূল্য ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দাঁড়িয়েছে ২২০ কোটি মার্কিন ডলারে। প্রযুক্তির সাহায্যে ঋণ নেওয়ার খরচ কমিয়ে আনার যে উদ্যোগ তিনি নিয়েছেন, তা ইতোমধ্যে হাজার হাজার মার্কিন পরিবারের কাছে পৌঁছেছে। কোম্পানির হিসাবে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাঁদের গ্রাহকদের সুদ বাবদ সাশ্রয় হয়েছে ২১ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বেশি।
সাদির জন্ম বাংলাদেশে। তাঁর মা-বাবা দুজনই প্রকৌশলী। উন্নত ভবিষ্যতের আশায় পরিবারের অভিবাসী জীবনের শুরু। শৈশবের একটি অংশ কেটেছে টরন্টোয়, কিছু সময় যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডাতেও। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য আবার ফিরে আসেন কানাডায়। পড়াশোনা শুরু করেন অন্টারিওর বিখ্যাত ইউনিভার্সিটি অব ওয়াটারলুতে। বেছে নেন ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং। ২০০৮ সালে সেখান থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
কানাডার ওয়াটারলু বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষত্ব হলো, এখানকার শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষের পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পান। সাদিও সেই পরিবেশে নিজেকে তৈরি করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা শেষ হওয়ার পর চাকরি পান বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফটে। একজন তরুণ প্রকৌশলীর জন্য এর চেয়ে ভালো সূচনা খুব কমই হতে পারে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। কিন্তু নতুন দেশে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রথম ধাপেই তাঁকে একটি অপ্রত্যাশিত সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।
মাইক্রোসফটের মতো প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেয়েছেন, নিয়মিত বেতন পাওয়ার নিশ্চয়তাও রয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর কোনো ক্রেডিট হিস্ট্রি না থাকায় ব্যাংকিং সেবা পেতে অসুবিধা হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত First Tech Credit Union তাঁর মাইক্রোসফটের চাকরির নিয়োগপত্র দেখে অ্যাকাউন্ট খুলে দেয়। ঘটনাটি সাদির মনে গভীর রেখাপাত করেছিল।
মাইক্রোসফটে তাঁর কাজ ছিল সফটওয়্যার ও প্রযুক্তিপণ্য তৈরি নিয়ে। Visual Studio ও Xbox-এর মতো জনপ্রিয় পণ্যের উন্নয়নকাজেও যুক্ত ছিলেন তিনি। ২০১৩ সালে যোগ দেন ফেসবুকে, বর্তমানে যার নাম মেটা। সেখানে তাঁর দায়িত্ব ও কাজের পরিধি আরও বেড়ে যায়। ফেসবুকের সার্চ, ম্যাপ এবং বিজ্ঞাপনব্যবস্থাসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্যের উন্নয়নে কাজ করেন।
বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুবাদে সাদি দেখেছেন, একটি নতুন ধারণা কীভাবে কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে তিনি উপলব্ধি করেন, প্রযুক্তি ব্যবহার করে জটিল কাজ সহজ করা সম্ভব হলেও আর্থিক সেবার অনেক পুরোনো নিয়ম মানুষের জন্য এখনও ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। ফেসবুকে দীর্ঘ কর্মজীবনের পর তিনি নিজের প্রতিষ্ঠান গড়ার সিদ্ধান্ত নেন। তবে আর দশজন উদ্যোক্তার মতো প্রচলিত কোনো প্রযুক্তিপণ্য বাজারে আনার পরিকল্পনা তাঁর ছিল না।
সাদির নজর পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেডিট কার্ড ব্যবস্থার দিকে। দেশটির মানুষ ক্রেডিট কার্ডে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়ে থাকেন। অনেকেই মাসের পর মাস সেই ঋণের সুদ পরিশোধ করেন। অথচ তাঁদের একটি বড় অংশের নিজের বাড়ি রয়েছে, যার বাজারমূল্য থেকে বকেয়া মর্টগেজ বাদ দিলে উল্লেখযোগ্য সম্পদ অবশিষ্ট থাকে। আর্থিক পরিভাষায় এটিই হোম ইক্যুইটি। সাদি বুঝতে পারেন, এই সম্পদকে কাজে লাগিয়ে তুলনামূলক কম সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা গেলে বহু পরিবারের অর্থ সাশ্রয় হবে।
২০১৯ সালে বন্ধু ও সাবেক সহকর্মী কলিন উইকম্যান এবং মুর্তাদা শাহকে সঙ্গে নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রতিষ্ঠা করেন Aven। তাঁদের লক্ষ্য ছিল প্রযুক্তির সাহায্যে সাধারণ মানুষের ঋণ নেওয়ার খরচ কমানো।
তাঁদের উদ্যোগে বাজারে আসে Aven Home Equity Visa Card। সাধারণ ক্রেডিট কার্ডের মতোই এটি ব্যবহার করা যায়। তবে এর বিশেষত্ব হলো, গ্রাহকের বাড়ির বাজারমূল্য থেকে বকেয়া মর্টগেজ বাদ দিলে যে সম্পদ অবশিষ্ট থাকে, তার একটি অংশ জামানত হিসেবে ব্যবহার করে তুলনামূলক কম সুদে ঋণ নেওয়া সম্ভব।
২০২৬ সালের অক্টোবরে প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গ্রাহকদের জন্য Aven Home Equity Visa Card-এর বার্ষিক সুদের হার ৬ দশমিক ৪৯ থেকে ১৪ দশমিক ৯৯ শতাংশের মধ্যে। অনুমোদিত ঋণসীমা সর্বোচ্চ চার লাখ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলে কেনাকাটার ওপর দুই শতাংশ পর্যন্ত ক্যাশব্যাকও পাওয়া যায়।
সাদির উদ্যোগের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ক্রমেই বাড়তে থাকে। ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই Aven ঘোষণা করে ১৪ কোটি ২০ লাখ ডলারের নতুন বিনিয়োগ সংগ্রহের কথা। এতে নেতৃত্ব দেয় Khosla Ventures এবং General Catalyst-এর মতো পরিচিত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান। এই বিনিয়োগের পর Aven-এর মূল্যায়ন পৌঁছে যায় ১০০ কোটি মার্কিন ডলারে।
এরপর ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর Aven আরও ১১ কোটি ডলার বিনিয়োগ সংগ্রহের ঘোষণা দেয়। এবার কোম্পানির মূল্যায়ন দাঁড়ায় ২২০ কোটি ডলারে। এক বছরের কিছু বেশি সময়ের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানের মূল্য দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যায়।
ফোর্বসের ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই সময়ের মধ্যেই Aven তিন বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণসীমা অনুমোদনের মাইলফলক অর্জন করে। যুক্তরাষ্ট্রের ৪১টি অঙ্গরাজ্যে প্রতিষ্ঠানটির সেবা সম্প্রসারিত হয়। সাদি খানের লক্ষ্য, প্রযুক্তির সাহায্যে ঋণ গ্রহণের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং গ্রাহকদের সুদের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা।
ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের আর্থিক সেবা সহজলভ্য করতে সাদি খান আরও একটি উদ্যোগ নেন। তাঁর সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত ক্যালিফোর্নিয়ার Haven Federal Credit Union ২০২৫ সালের ৫ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের National Credit Union Administration-এর আনুষ্ঠানিক অনুমোদন লাভ করে। সদস্যদের মালিকানাধীন এই অলাভজনক প্রতিষ্ঠানটি সে বছর যুক্তরাষ্ট্রে অনুমোদন পাওয়া মাত্র তিনটি নতুন ফেডারেল ক্রেডিট ইউনিয়নের একটি।
Haven-এর পরিকল্পনায় রয়েছে বাড়ি কেনার ঋণ, বাড়ির ইক্যুইটিভিত্তিক ঋণ, সঞ্চয় হিসাব, গাড়ির ঋণ এবং সাধারণ মানুষের আর্থিক জ্ঞান বাড়ানোর কর্মসূচি। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এমন জনগোষ্ঠীকে, যাঁরা প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত সুযোগ পান না। একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী হিসেবে নিজের ব্যবসাকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি সদস্যদের মালিকানাধীন আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সহায়তা করা সাদির উদ্যোগকে ভিন্ন মাত্রা দেয়।
এরই মধ্যে Aven নতুন ধরনের ঋণসেবার কাজও শুরু করেছে। ২০২৬ সালের ২৭ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানটি চালু করে Aven Bitcoin Visa Card। এই কার্ডের মাধ্যমে বিটকয়েনের মালিকেরা তাঁদের ডিজিটাল সম্পদ বিক্রি না করে জামানত হিসেবে ব্যবহার করে সর্বোচ্চ ১০ লাখ ডলার পর্যন্ত ঋণসুবিধা নিতে পারেন।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অভিবাসীদের সাফল্যের গল্পে চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, অধ্যাপক ও ব্যবসায়ীদের নাম প্রায়ই উঠে আসে। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছেন আর্থিক প্রযুক্তির উদ্যোক্তা সাদি খান। নিজের মেধা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আমেরিকার মানুষের ঋণের খরচ কমানোর উদ্যোগ নিয়েছেন এই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রকৌশলী। সেই উদ্যোগের সাফল্যই তাঁকে সিলিকন ভ্যালির আলোচিত উদ্যোক্তাদের একজন করে তুলেছে।
তথ্যসূত্র: Forbes, University of Waterloo, Aven, National Credit Union Administration (NCUA)।
সম্পুর্ন খবরটি পড়ার জন্য এই লিঙ্কে ক্লিক করুন ::টরন্টোর বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সাদি খান এখন ২২০ কোটি ডলারের প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার first appeared on DesheBideshe.