ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফুটে ওঠেনি। পুব আকাশে সবে দেখা দিয়েছে লালচে আভা। সূর্য যেন আকাশের কিনারে দাঁড়িয়ে উঁকি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। চারপাশে নেমে থাকা নরম নীরবতার মাঝেই ব্রহ্মপুত্রের মৃদু স্রোত বয়ে চলছে। সেই স্রোতের বুক চিরে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে একটি ছোট নৌকা। নৌকার একপাশে দুলছে সারি সারি কাশফুল। নদীর পাড়জুড়ে যেন সাদা রঙের মেলা বসেছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে বয়ে চলা ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে শরৎ এলেই এমন দৃশ্যের দেখা মেলে। নদীর কোল ঘেঁষে ফুটে ওঠে কাশফুল। হালকা বাতাসে দুলতে থাকা সাদা ফুলগুলো দূর থেকে দেখে মনে হয়, নদীর এক পাশে সাদা মেঘের আস্তরণ বিছিয়ে রাখা হয়েছে। ভোরের কোমল আলোয় সেই সাদা কাশ আরও বেশি মায়াবী হয়ে ওঠে।
নৌকা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলে। একসময় সূর্যও একটু একটু করে মাথা তুলতে শুরু করে। নদীর জলে পড়ে তার সোনালি আলো। কাশফুলের ফাঁক গলে সূর্যের তীক্ষè রশ্মি এসে চোখে পড়ে। চারপাশে তখন হালকা বাতাস। নদীর জলে নৌকার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, বাতাসে কাশফুলের দোল আর সকালের মিষ্টি আলো- সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অন্যরকম আবহ।
নদী পেরিয়ে অপর পাড়ে পৌঁছাতেই বদলে যায় দৃশ্য। চারদিকে শুধু সাদা আর সাদা। মনে হয়, কাশফুলের সেই বিস্তৃত রাজ্যে এসে পড়েছি। প্রকৃতির এই সৌন্দর্যের মাঝেই শুরু হয়ে যায় মানুষের ব্যস্ততা।
সকাল হতেই নদীর এপার-ওপার থেকে ছোট ছোট নৌকায় করে আসতে শুরু করেন কৃষকরা। কারও নৌকায় টাটকা লাউ, কারও ঝুড়িতে চিচিঙ্গা। কেউ এনেছেন ডাঁটাশাক, কেউ মূলাশাক, আবার কারও সঙ্গে রয়েছে কলমিশাক। নিজেদের জমিতে ফলানো এসব শাকসবজি নিয়ে তারা নদী পাড়ি দিয়ে ছুটছেন বাজারের দিকে।
কাশফুলের নরম সৌন্দর্যের পাশেই তখন জীবনের আরেক ছবি। কেউ নদীর পানিতে শাকসবজি ধুয়ে নিচ্ছেন। কেউ মাথার বোঝা নামিয়ে নৌকায় তুলছেন। কেউ আবার নৌকার দড়ি ধরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। তাদের ব্যস্ততায় ভোরের নীরবতা ধীরে ধীরে ভাঙতে থাকে। প্রকৃতির সৌন্দর্য আর মানুষের জীবনের এই ব্যস্ততা পাশাপাশি মিশে গিয়ে তৈরি করে এক চেনা অথচ মুগ্ধ করার মতো দৃশ্য।
এরই মধ্যে সূর্য পুরোপুরি উঠে আসে। সকালের কোমল আলো বদলে যায় উজ্জ্বল রোদে। কাশফুলগুলোও যেন নতুন করে জ্বলে ওঠে। বাতাসে দুলতে থাকা সাদা ফুলের ওপর সূর্যের আলো পড়ে চারপাশ আরও ঝলমলে হয়ে ওঠে। নদীর জলে সেই আলোর প্রতিচ্ছবি পড়ে তৈরি হয় ছোট ছোট ঝিকিমিকি ঢেউ।
এই দৃশ্য দেখতে হলে খুব বেশি দূরে যেতে হয় না। বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের পাশের ব্রহ্মপুত্রের পাড়েই শরতের এই সৌন্দর্য অপেক্ষা করে। ভোরের নরম আলো, নদীর মৃদু স্রোত, নৌকার দুলুনি আর কাশফুলের সাদা সমারোহ- সবকিছু মিলে কয়েকটি মুহূর্তের জন্য হলেও ব্যস্ত জীবন থেকে দূরে নিয়ে যায়।
ভ্রমণপ্রেমী মানুষের কাছে এমন সকাল হতে পারে একটু স্বস্তির, একটু প্রশান্তির।
