কত কথাই তো লিখি। আমার কথা, তোমার কথা, তার কথা, আমাদের চারপাশের কথা। লোভীর নিষ্ঠুর লোভ, আর অহংকারের কথা, বঞ্চিত মানুষের ক্ষোভের কথা। প্রতিদিন কত কথা লিখি, কিন্তু কোনো প্রতিকার হয় না। সমাজ নিয়ত বদলে যাচ্ছে। সত্যি কি সমাজটা নষ্টদের অধিকারে চলে যাবে? তবুও সমাজের বেদনা বৈষম্যের কথা লিখতে হয়!
আজ কেন যেন পদ্মা পাড়ের স্নেহময়ী মায়ের আঁচল ছেঁড়া এক দুরন্ত বালকের কথা মনে পড়ছে। ছায়া সুনিবিড়, গাছ-গাছালি ছাওয়া, এক নিভৃত জনপদে জন্ম, পল্লি কবি হিসেবে সমধিক খ্যাত গ্রামীণ মানুষের দুঃখ বেদনার ভাষার জাদুকর কবি জসীমউদ্দীনের কথা বারবার মনে পড়ছে—। জসীমউদ্দীন পল্লি মানুষের গ্রাম জনপদের অশিক্ষিত নিরক্ষর নর-নারীর গোপন বেদনা, দুঃখ যন্ত্রণা হাহাকার, প্রেম ভালোবাসার রূপকার ছিলেন। তাঁর লেখায় গ্রাম বাংলার নিরক্ষর মানুষের মর্ম বেদনা নিখুঁতভাবে ফুটে উঠতো। তাঁর লেখায় একজন মরমি মানুষের ভালোবাসা বেদনা আকুতি উজ্জ্বল হয়ে আছে। তিনি তাঁর এক লেখায় বলেছেন :
‘আমার এ কূল ভাঙিয়াছে যেবা
আমি তার কূল বাঁধি,
যে গেছে বুকেতে আঘাত হানিয়া,
তার লাগি আমি কাঁদি।
যে মোরে দিয়েছে বিষে ভরা বান,
আমি দেই তারে বুক ভরা গান ;
কাটা পেয়ে তারে ফুল করি দান,
সারাটি জনম ভর,–
আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই,
যে মোরে করেছে পর।”
মরমি গানের শিল্পী আব্বাস উদ্দিনের মন উতাল করা ভাওয়াইয়া সংগীত বাংলাদেশের উত্তর অঞ্চলে অর্থাৎ উত্তরবঙ্গে মোষের খুরের ধুলোয় নিভৃত জনপদের মানুষকে উতাল করে ছিল বহুকাল ধরে। ‘ওকি গাড়িয়াল ভাইরে’ গানের মধ্য দিয়ে সুরের ব্যঞ্জনায় মন মাতিয়ে তোলে।
পদ্মা পাড়ের আর এক অমর সংগীতশিল্পী আব্দুল আলীমের সুরেলা কণ্ঠে দরাজ গলার ভাটিয়ালি গান সব বয়সের মানুষকে উতলা করেছিল! এখনো শুনলে আনমনা হয়ে যায় সুর পাগল বাঙালির হৃদয়! আব্দুল আলীমের ভাটিয়ালি গান নদী বিধৌত বাংলাদেশের নিরক্ষর মাঝি মাল্লাকে সুরের প্রবাহে অকৃত্রিমভাবে বেঁধে রেখেছে।
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের শিল্পকলা যতদিন পৃথিবী থাকবে, মানুষের মনে আকাক্সক্ষা স্বপ্ন আর বিদ্রোহের ছবি হয়ে থাকবে। ‘৪৩ এর মন্বন্তর’ যাকে বলা হতো বাংলা পঞ্চাশের মন্বন্তর। মানুষের ক্ষুধা। অনাহারে বিপন্ন অবস্থায় নিরুপায় মৃত্যু। সবই এঁকে রেখেছেন তাঁর শিল্পের তুলি দিয়ে।
প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, ইংরেজি ১৯৪৩ এর মন্বন্তর নিয়ে যে করুণ বিয়োগান্ত কাহিনি লিখেছিলেন ফররুখ আহমেদ, কবি হলেও শিল্পীর সীমারেখাকে তিনি অতিক্রম করে গেছেন। ফররুখ আহমেদ আর জয়নাল আবেদীন যমজ সন্তানের মত তাদের লেখা আর তুলিতে, তুলির আঁচড়ে এই বাংলাদেশের বিপন্ন মুহূর্তের ছবি তুলে ধরেছেন অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে।
বরিশাল বললেই অবিভক্ত ভারতের এক বাঘের কথা মনে পড়ে। তাঁর জন্ম বরিশালে। বরিশালের চির অমর কৃতী সন্তান শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের ছবি মানস পটে ভেসে ওঠে। যিনি ছিলেন ব্রিটিশ শাসনে বিধ্বস্ত ভারতের বাঘ। ব্রিটিশ শাসনামলে অবিভক্ত বাংলার বাঘ। ব্রিটিশ শাসনামলে যখন ভারত মুক্ত করার ‘নন কোঅপারেশন মুভমেন্ট’ বা অসহযোগ আন্দোলন চলছিল, যখন ইংরেজ সরকার ‘গণবিদ্রোহ’ নির্মূল করতে কামানের গোলা দিয়ে তৎকালীন বাংলাদেশ কে নিষ্ঠুরভাবে দমন করার পরিকল্পনা করে। বিপ্লবী বীর শেরে বাংলা একে ফজলুল হক তখন অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। তিনি রুষ্ট ভাবে অত্যন্ত প্রতিবাদমুখর হয়ে বলেছিলেন, “ইংরেজের কামানের গোলা প্রথমে আমার বক্ষ ভেদ করবে, তারপর বাংলার মানুষকে আঘাত করবে এর আগে নয়।”
কতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কবি জসীমউদ্দীনের মতো সংস্কৃতিবান ব্যক্তিত্বকে, ব্যক্তিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়নি, ইংরেজ আমলে এগিয়ে থাকা সম্প্রদায়ের সৃষ্ট সাম্প্রদায়িক বৈষম্যের কারণে! ব্রিটিশ ভারতের এক চোঁখা নীতির কারণে। এসব কথা আজ সময় ও কালের দাবিতে নতুন করে উচ্চারিত হচ্ছে।
অল্প একটু স্মরণ করিয়ে দেই। ১৯২৪ সাল। শেরে বাংলা তৎকালীন বাংলাদেশে মুসলমানদের নিজে চোখে পরখ করলেন। অধিকাংশ শিক্ষাবিদ ছিল অন্য ধর্মাবলম্বী। তারা মুসলিম শিক্ষার্থীদের প্রতি দারুণ অসহিষ্ণু। কারণ এরা অনগ্রসর পিছিয়ে পড়া শ্রেণি। তাই মুসলিম শিক্ষার্থীদের প্রতি দারুণ অসহিষ্ণু বিমাতাসুলভ আচরণ করতো। পরীক্ষার খাতায় মুসলিম শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার্থীদের নাম্বার কম দেওয়া থেকে শুরু করে ভীষণ শত্রুতামূলক আচরণ করতো, যাতে মুসলিম শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্রের সকল সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। এ ধরনের নিদারুণ বৈষম্য দেখে শেরে বাংলা একে ফজলুল হক পরীক্ষা ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতার স্বার্থে রোল নাম্বার এবং কোড নাম্বার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। যাতে শিক্ষার্থী কোনো ধর্মের সহজে শনাক্ত করা না যায়।
এবার একটু অন্যদিকে চোখ ফেরাই। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর ব্রিটিশের ওই সময়ের প্রশাসন ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ পলিসির মাধ্যমে ইংরেজরা যেভাবে ভারত শাসন করতো তার আর অবসান হলো না। পাকিস্তান হবার পর পাকিস্তানি সামরিক শাসক গোষ্ঠী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মেধাবীদের বৃত্তি প্রদানে সব ক্ষেত্রেই পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতি উদারতা দেখিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের মেধাবী সন্তানদের প্রতি বৈষম্য মূলক আচরণ করতে লাগলো।
বৈষম্যের চেহারা এত স্পষ্ট হলো যে, আফ্রো এশিয়া, ল্যাটিন আমেরিকার নির্যাতিত মানুষের নেতা পূর্ব বাংলার গণমানুষের অধিকারের কাণ্ডারি মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ১৯৫৭ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের কাগমারির এক আন্তর্জাতিক কৃষক সম্মেলনে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীকে হুঁশিয়ার করেই দিয়ে পাহাড় সমান বৈষম্যের বিরুদ্ধে হুংকার ছেড়ে বললেন, “পূর্ব পাকিস্তান (সাবেক পূর্ব বাংলা) প্রশাসন শিক্ষা বাণিজ্য প্রতিরক্ষা উন্নয়ন সকল ক্ষেত্রে দুই পাকিস্তানই সমান অধিকার থেকে যদি ক্রমশ বঞ্চিত হতে থাকি, তাহলে আমরা বলবো
‘স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান
আসসালামু আলাইকুম।’
প্রকৃত প্রস্তাবে ধানের দেশ, গানের দেশ, সোনালি শস্য সম্পদের দেশ, সংগ্রামের দেশ এই বাংলাদেশ – যেমনটি হওয়ার কথা ছিল, তেমনটি আমরা হতে পারিনি, নানা প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের কারণে। ১৮৫৭ সালের ২৩ জুন থেকে ৪৭ পর্যন্ত ইংরেজের ১৯০ বছরের দুঃশাসনের স্টিম রোলার চলে এবং পাকিস্তানের ২৪ বছর বাংলাদেশ নামক জনপদকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, শিক্ষা বাণিজ্য, পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা সকল ক্ষেত্রেই ন্যুব্জ করে ছেড়ে দেয়।
আমরা ১৯৭১ এ পিণ্ডির বিরুদ্ধে যা এখন পাকিস্তান, নয় মাসের মরণ পণ লড়াই করেছিলাম, সার্বিক মুক্তির জন্য। কিন্তু তাকি সম্ভব হয়েছে? ১৯৬২ সাল থেকে ভারতীয় গোয়েন্দাসংস্থার এই দেশটির ওপর নেপথ্যে ভর করে পাকিস্তান রাষ্ট্রটি ভেঙেছে তাদের নিজেদের স্বার্থে। আমাদের সহায়সম্পদ লুণ্ঠন করে নিয়েছে। ৫৪ বছরের শোষণ লুন্ঠনে জাতি প্রায় সর্বস্বান্ত। ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর থেকে শেখ মুজিবের আমলে ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট পর্যন্ত এটি একটি ভারতীয় কলোনি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এটি শেখ মুজিবের পারিবারিক শাসনের, স্বৈরাচারের, স্বেচ্ছাচারের চারণ ভূমিতে পরিণত হয়েছিল।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট দেশের সার্বভৌমত্ব স্বাধীনতা সম্পর্কে সচেতন সেনাবাহিনীর একটি অংশ স্বৈরাচারের পতন ঘটায়। ১৯৭৫ থেকে ১৯৮২ পর্যন্ত সময়কাল ছিল ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সচেতন একটি ভূখণ্ড। বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন নতুন জেগে ওঠা দ্বীপ দক্ষিণ তালপট্টি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি করে ভারত। জিয়াউর রহমানের দেশপ্রেমিক সরকারকে কব্জা করতে ব্যর্থ হয়ে ভারত নাখোশ ভাবে দিন কাটাতে থাকে।
১৯৮১ সালের মে মাসের ১৭ তারিখ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিজস্ব বদান্যতায় বহুদলীয় গণতন্ত্র বিকাশের জন্য শেখ মুজিব কন্যা শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে তক্কে তক্কে মুজিবের পতনের পর রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা সবকিছু বুঝিয়ে দেন। এত উদারতা সত্ত্বেও দৃশ্যমান এই ঘটনার নেপথ্যে চলে গভীর কুটিল ষড়যন্ত্র। সেই ষড়যন্ত্রের বলি হন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তাঁর ঘাতক মেজর মুজাফফর ৪৫ বছর পর ধরা খেয়ে সবকিছুই স্বীকার করেছে। হাসিনা দেশে ফেরার ১৩ দিনের মাথায় ভারতীয় “র” এর মাস্টার প্ল্যান কার্যকর হয়। প্রাণ হারান জিয়াউর রহমান।
যে মেধা, যে দেশপ্রেমিক মানুষকে আমরা এ দেশে পেয়েছি, তার জন্য আমাদের গর্বিত। তবে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র আগেও ছিল যার ফলে নবাব সিরাজের পতন হয় এবং এখন পর্যন্ত তা থেমে নেই।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
খুলনা গেজেট/এনএম
