আদিতমারীর সারপুকুর ইউনিয়নের নিভৃত পল্লি টিপার বাজার এলাকায় গড়ে ওঠা ‘সারপুকুর যুব ফোরাম পাঠাগার’ ঘিরে এভাবেই তৈরি হয়েছে অন্যরকম মমত্ববোধ। পাঠাগারের উন্নয়ন, নতুন বই ও বাদ্যযন্ত্র কেনা এবং ভবনের দ্বিতীয় তলার নির্মাণকাজে সামর্থ্যানুযায়ী অংশ নিতে ২০টি কৃষক পরিবার ‘মাটির ব্যাংক’-এ টাকা জমাচ্ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে এ উদ্যোগ। এ পর্যন্ত এসব ‘মাটির ব্যাংক’ থেকে ৩৯ হাজার ৩০০ টাকা পাওয়া গেছে। গ্রামের মানুষের আশা, তাদের সামান্য সঞ্চয় একসময় পাঠাগারটির বড় উন্নয়নের কাজে লাগবে। ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত পাঠাগারটি একসময় পরিচালিত হতো ছোট ও জীর্ণ টিনশেড ঘরে। প্রতিষ্ঠার সময় সেখানে বই ছিল মাত্র ১০টি। স্থানীয় কলেজ শিক্ষার্থী জামাল হোসেনের উদ্যোগে গড়ে ওঠা পাঠাগারটি ধীরে ধীরে গ্রামের মানুষের জ্ঞানচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। বর্তমানে পাঠাগারটির বইয়ের সংখ্যা ১৮ হাজার ছাড়িয়েছে। ইতোমধ্যে দ্বিতল ভবনের ভিত্তির ওপর একতলার নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। পাঠাগারে রয়েছে কম্পিউটার, ল্যাব, চেয়ার-টেবিল এবং বিভিন্ন ধরনের বাংলা ও আধুনিক বাদ্যযন্ত্র। এখানে শুধু বই পড়ার সুযোগই নেই, নিয়মিত সাংস্কৃতিক চর্চারও সুযোগ রয়েছে। গ্রামের শিক্ষার্থী ও তরুণরা বই পড়ার পাশাপাশি বাদ্যযন্ত্র বাজানো ও সংগীতচর্চায় অংশ নেয়। ২০২৪-২৫ সালে পাঠাগারের ভবন নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩০ লাখ টাকার বেশি। এর প্রায় ৯০ শতাংশ আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন ঢাকার রবিন প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজ লিমিটেডের পরিচালক শাহীন হোসেন ও মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের অষ্টম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। বাকি প্রায় ১০ শতাংশ অর্থ এসেছে স্থানীয় প্রশাসন ও এলাকার মানুষের কাছ থেকে। তবে এককালীন বড় অঙ্কের অর্থ দেওয়ার সামর্থ্য নেই গ্রামের অধিকাংশ মানুষের। তাই তারা বেছে নিয়েছেন নিজেদের মতো করে সহযোগিতা করার পথÑ ‘মাটির ব্যাংক’।
স্থানীয় বাসিন্দা দীপিকা রানী বলেন, তারা কৃষক পরিবার। এক সঙ্গে বড় অঙ্কের টাকা দিয়ে সহযোগিতা করার সামর্থ্য তাদের নেই। তাই সংসারের খরচ মেটানোর পর সামান্য সামান্য করে টাকা ‘মাটির ব্যাংক’-এ জমিয়ে রাখেন। ‘পাঠাগারটিতে যাতে আরও বই ও বাদ্যযন্ত্র কেনা যায় এবং দ্বিতল ভবনের কাজ শুরু করা যায়, সেজন্য আমরা যতটুকু পারি সহযোগিতা করছি। আমাদের ছেলে-মেয়েরা নিয়মিত পাঠাগারে বই পড়তে আসে। এখানে তারা সাহিত্যচর্চাও করে।
আরেক বাসিন্দা সাজেদা বেগম বলেন, গ্রামের পাঠাগারটি প্রতিষ্ঠার পর অবসর সময়ে মানুষের বই পড়ার অভ্যাস তৈরি হয়েছে। তরুণ-তরুণীরা বাদ্যযন্ত্র বাজানো ও সংগীতচর্চার সুযোগ পাচ্ছে। প্রতিটি ব্যাংকে ৫০০-৮০০ টাকা জমা হয়।
মেরিনা বেগম বলেন, পাঠাগারটি গ্রামের শিশু-কিশোরদের অবসর সময়কে কাজে লাগানোর সুযোগ করে দিয়েছে। তারা বই পড়ছে, জ্ঞানচর্চা করছে। সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে যুক্ত হচ্ছে। এতে তাদের মানসিক বিকাশও হচ্ছে। এককালীন বড় অঙ্কের টাকা দেওয়ার সামর্থ্য আমাদের নেই। তাই মাটির ব্যাংক-এ সামান্য সামান্য টাকা জমিয়ে পাঠাগারের উন্নয়নে সহযোগিতা করছি, তিনি বলেন।
পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা জামাল হোসেন বলেন, গ্রামের মানুষের এ ভালোবাসা তাকে অভিভূত করেছে। একসময় মাত্র ১০টি বই নিয়ে যে পাঠাগারের যাত্রা শুরু হয়েছিল, এখন সেটি ১৮ হাজারের বেশি বইয়ের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এর পেছনে এলাকার মানুষের পাশাপাশি বাইরে থাকা শুভাকাক্সক্ষীদেরও অবদান রয়েছে। পাঠাগারের প্রতি গ্রামের কিছু মানুষের যে মমত্ববোধ দেখছি, তা সত্যিই আমাকে অভিভূত করে। তারা ‘মাটির ব্যাংক’-এ টাকা জমিয়ে পাঠাগারের উন্নয়নে সহযোগিতা করছেন। অন্য কোথাও এমন উদ্যোগ আছে কি না, আমার জানা নেই। ঢাকার রবিন প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজ লিমিটেডের পরিচালক শাহীন হোসেন বলেন, গ্রামের সাধারণ মানুষের পাঠাগারের প্রতি যে মমত্ববোধ দেখা গেছে, তাতে এর উন্নয়ন থেমে থাকবে না। বন্ধুরা সবাই মিলে পাঠাগারটির উন্নয়ন কাজে অংশ নেব। গ্রামের এ পাঠাগারটি শুধু বই পড়ার জায়গা নয়, এটি জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।