পাবনার ভাঙ্গুড়ায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের চরম অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার কারণে একই দিনে দুই নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। শনিবার (১০ অক্টোবর) উপজেলার শরৎনগরে অবস্থিত ‘ভাঙ্গুড়া হেলথ কেয়ার লিমিটেড’ নামক বেসরকারি ক্লিনিকে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের চিকিৎসক না থাকা সত্ত্বেও তা গোপন রেখে দীর্ঘ সময় রোগীদের অপেক্ষা করানো এবং ক্ষেত্রবিশেষে আয়া দিয়ে প্রসব করানোর চেষ্টার ফলেই এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে ইতোমধ্যে থানায় এবং জেলা সিভিল সার্জন বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, প্রসবব্যথা শুরু হলে শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার চৌবাড়িয়া দক্ষিণপাড়ার বাসিন্দা তারেক হোসেনের স্ত্রী মুসলিমা আক্তার মনা ওই হাসপাতালে ভর্তি হন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত রক্তের ব্যবস্থা করা হলেও সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করার মতো কোনো সার্জন হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন না। কিন্তু বিষয়টি রোগীর স্বজনদের না জানিয়ে নানা অজুহাতে প্রায় তিন থেকে চার ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়। পরবর্তীতে চিকিৎসক এসে অস্ত্রোপচার করলেও নবজাতকের শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে। পরে তাড়াহুড়ো করে পাবনা সদর হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেয় কর্তৃপক্ষ, তবে পথেই নবজাতকটি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। মর্মান্তিক এই ঘটনায় নবজাতক হারিয়ে শোকে স্তব্ধ হয়ে গেলেও প্রসূতি মা মুসলিমা আক্তার মনা এখনো অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসাধীন থাকায় তাকে সন্তানের মৃত্যুর বিষয়টি জানানো সম্ভব হয়নি।
একই দিনে ওই একই ক্লিনিকে ঘটে আরেকটি শিশু মৃত্যুর লোমহর্ষক ঘটনা। উপজেলার ভবানীপুর গ্রামের মাসুদ রানার স্ত্রী অন্তরা খাতুনের প্রসববেদনা উঠলে শনিবার সকাল ১০টার দিকে তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন স্বজনরা। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সিজারিয়ান অপারেশনের সিদ্ধান্ত নিলেও নির্ধারিত সময়ের দীর্ঘ ৩-৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও কোনো চিকিৎসক ক্লিনিকে উপস্থিত হননি। চিকিৎসকের অনুপস্থিতিতে রোগীর জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলে ক্লিনিকে কর্মরত এক আয়াকে দিয়ে জোরপূর্বক স্বাভাবিক প্রসব করানোর চেষ্টা চালানো হয়। সন্তান প্রসবের পর নবজাতকের কোনো সাড়া না পেয়ে স্বজনরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং দ্রুত তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক নবজাতককে মৃত বলে ঘোষণা করেন। দশ মাস গর্ভে ধারণের পর চিকিৎসকদের এমন অপেশাদার আচরণ ও অবহেলায় সন্তান হারিয়ে পাগলপ্রায় প্রসূতি অন্তরা খাতুন ও তার স্বামী মাসুদ রানা এই ঘটনার ন্যায়বিচার দাবি করেছেন।
এদিকে অনুসন্ধানে জানা গেছে, অভিযুক্ত ‘ভাঙ্গুড়া হেলথ কেয়ার লিমিটেড’ হাসপাতালটির বৈধ লাইসেন্সের মেয়াদ গত জুলাই মাসেই উত্তীর্ণ হয়েছে, যা এখন পর্যন্ত নবায়ন করা হয়নি। লাইসেন্স ছাড়াই বছরের পর বছর কীভাবে একটি চিকিৎসাকেন্দ্র কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালক মো. আবদুল জব্বার দায় এড়াতে গিয়ে দাবি করেন, তাদের ক্লিনিকে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক ছিলেন এবং স্বজনদের পরামর্শেই সিজার দেরিতে করানো হয়েছে। লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়ে তার অজুহাত, লাইসেন্স নবায়নের জন্য ফি জমা দেওয়া হয়েছে কিন্তু এখনো কাগজ হাতে পাননি।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ভাঙ্গুড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাকিউল আজম জানান, বিষয়টি জানার পর লিখিত অভিযোগ হাতে পাওয়া গেছে এবং এর ভিত্তিতে আইনগত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। অন্যদিকে পাবনার সিভিল সার্জন মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, অভিযোগে যেভাবে চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার বিষয়টি উঠে এসেছে, তা সত্য প্রমাণিত হলে এবং এ ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধে বিধি মোতাবেক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলো অবিলম্বে এই অবৈধ ক্লিনিকটি সিলগালা করে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছে।
