ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়ার অভিযোগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটাকে ২৫ বিলিয়ন ডলার জরিমানা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের একটি আদালত। বুধবার বিচারক এ রায় দেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আরোপিত বৃহত্তম আর্থিক জরিমানাগুলোর একটি এটি। বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কেমব্রিজ অ্যানালিটিকার বিরুদ্ধে ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় লাখ লাখ ফেসবুক ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য তাদের অনুমতি ছাড়াই সংগ্রহের অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্য মেটার বিরুদ্ধে মামলা করে। অঙ্গরাজ্যটির অভিযোগ, ব্যবহারকারীদের তথ্য কারা দেখতে বা ব্যবহার করতে পারে, সে বিষয়ে ফেসবুকের পক্ষ থেকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া হয়েছিল।
রায়ের তিন সপ্তাহের বেশি সময় পর দেওয়া আদেশে বিচারক ফ্রান্সিস ম্যাথিউ বলেন, বছরের পর বছর ধরে ফেসবুকের অনিয়মের বিষয়টি জনসমক্ষে প্রচারিত হয়েছে। এটি প্রতিষ্ঠানটির মূল ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
অঙ্গরাজ্যের আইন অনুযায়ী, মেটার বিরুদ্ধে ২১৯ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি জরিমানা আরোপের যৌক্তিকতা রয়েছে বলে মনে করেন বিচারক। তবে শেষ পর্যন্ত জরিমানার পরিমাণ কমিয়ে ২৫ বিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করেন তিনি।
মেটার প্রধান আইন কর্মকর্তা সি জে মাহোনি এক বিবৃতিতে বলেন, আপিলের মাধ্যমে এ রায় বাতিল করতে পারবে বলে প্রতিষ্ঠানটি আত্মবিশ্বাসী। তার অভিযোগ, এই রায় এবং নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেলের পদক্ষেপ অঙ্গরাজ্যটিতে ব্যবসা পরিচালনা প্রায় অসম্ভব করে তুলবে। তার ভাষ্য, অনলাইনে মানুষ কী বলতে পারবে, সে বিষয়ে নতুন নিয়ম কার্যকর করতে এই মামলা মূলত মতপ্রকাশের ওপর কর আরোপের চেষ্টা।
নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেল রাউল তোরেজ বলেন, করপোরেট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এটি অন্যতম বৃহৎ আর্থিক জরিমানা। আলবুকার্কে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি দীর্ঘদিনের। তার মতে, এই রায় অতীতের অবস্থান থেকে একটি স্পষ্ট পরিবর্তন এবং প্রযুক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সতর্কবার্তা।
২০২১ সালে নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেল মেটার বিরুদ্ধে মামলা করেন। এর আগে প্রকাশ পায়, তৃতীয় পক্ষের একটি অ্যাপের মাধ্যমে কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা সর্বোচ্চ ৮ কোটি ৭০ লাখ ফেসবুক ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করেছিল। পরে এসব তথ্য ব্যবহার করে ভোটারদের প্রোফাইল তৈরি ও নির্দিষ্ট ভোটারদের লক্ষ্য করে প্রচারণা চালানো হয়। প্রতিষ্ঠানটি এখন আর কার্যক্রম পরিচালনা করছে না।
নিউ মেক্সিকোর অভিযোগ ছিল, ব্যবহারকারীদের তথ্যের নাগাল কারা পাচ্ছে, সে বিষয়ে মেটা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছে। পাশাপাশি ফেসবুকে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও ভুল তথ্যের বিস্তার নিয়ন্ত্রণেও প্রতিষ্ঠানটি যথাযথ পদক্ষেপ নেয়নি। অঙ্গরাজ্যটির দাবি, তৃতীয় পক্ষের হাতে ব্যবহারকারীদের তথ্যের ব্যাপক প্রবেশাধিকার থাকার বিষয়টি মেটা জানত। আবার প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বার্থে লাভজনক হলে বিদ্বেষমূলক বক্তব্যসহ ক্ষতিকর বিষয়বস্তুর বিস্তারও সহ্য করত তারা।
কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারির ঘটনায় এর আগে ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ট্রেড কমিশন মেটাকে ৫ বিলিয়ন ডলার জরিমানা করেছিল।
এ ছাড়া কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মেটার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের প্রভাব নিয়ে অঙ্গরাজ্যগুলোর করা মামলাগুলোর মধ্যে ছয়টি অঙ্গরাজ্যের মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। গত আগস্টে ১৭ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের একটি বহুঅঙ্গরাজ্যভিত্তিক সমঝোতার অংশ হিসেবে কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা-সংক্রান্ত অভিযোগে করা ওই ছয়টি মামলাও ৪৫৯ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলারে নিষ্পত্তি করে মেটা।
কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যে ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকের প্রভাব নিয়ে মেটার বিরুদ্ধে হাজারো মামলা এবং আইনপ্রণেতাদের চাপের মধ্যেই নতুন এ রায় এলো। আগামী সপ্তাহে এ-সংক্রান্ত আরেকটি বিচার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
চলতি বছরের শুরুতে ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকে তরুণদের যৌন শোষণের সুযোগ করে দেওয়া এবং প্ল্যাটফর্মগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করার অভিযোগে করা দুটি মামলায় নিউ মেক্সিকো মেটার বিরুদ্ধে ৯৪২ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ আদায়ে সফল হয়।
তবে বিনিয়োগ বিশ্লেষক গিল লুরিয়ার মতে, নতুন এ জরিমানা মেটার জন্য ব্যয়বহুল হলেও প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্যে বড় প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম। ডি এ ডেভিডসনের এই প্রযুক্তি গবেষণা বিভাগের প্রধান বলেন, মেটার বাজারমূল্য প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ডলার। প্রতিষ্ঠানটি সম্ভবত আপিল চালিয়ে যাবে এবং মামলাগুলো দীর্ঘায়িত হবে।
গত সেপ্টেম্বরে জুরিরা দেখতে পান, ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা, বিদ্বেষমূলক বক্তব্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে মেটা ও এর নেতৃত্ব ২৬টি বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়েছিল। সম্ভাব্য দর্শক ও ব্যবহারকারীর সংখ্যার ভিত্তিতে জুরিরা হিসাব করেন, এসব বক্তব্যের মাধ্যমে নিউ মেক্সিকোর ভোক্তা সুরক্ষা আইন ৪ কোটি ৩০ লাখেরও বেশি বার লঙ্ঘন করা হয়েছে।
গত ১ অক্টোবরের শুনানিতে নিউ মেক্সিকোর আইনজীবী র্যান্ডি ম্যাকগিন অঙ্গরাজ্যটির জন্য ৩৫ থেকে ৪০ বিলিয়ন ডলার জরিমানা নির্ধারণের আবেদন জানিয়েছিলেন। আদালতে তিনি বলেন, মেটাকে বোঝানোর একমাত্র কার্যকর ভাষা হলো অর্থ এবং শেয়ারমূল্যের ওপর এর প্রভাব।
অন্যদিকে, আদালতে মেটা জরিমানার পরিমাণ সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারে সীমাবদ্ধ রাখার আবেদন করেছিল। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তারা ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রি করে না এবং কোনো ভোক্তা বাস্তবে বিভ্রান্ত হয়েছেন নিউ মেক্সিকো তা প্রমাণ করতে পারেনি।
