জামালপুরের বকশীগঞ্জ ও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় নতুন করে নিয়োগ পাওয়া ১৭ জন সার ডিলারের মধ্যে ১৬ জনই বিএনপির নেতাকর্মী ও তাদের আত্মীয়স্বজন বলে অভিযোগ উঠেছে। চূড়ান্ত তালিকায় দলীয় পদধারী নেতা, তাদের স্ত্রী, ছেলে, ভাই ও নিকটাত্মীয়দের নাম থাকায় স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। এ ঘটনায় বিএনপির তৃণমূলের একাংশের মধ্যেও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। সার ডিলার নিয়োগে যোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা হয়নি।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, বকশীগঞ্জ ও দেওয়ানগঞ্জের ১৫টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভার জন্য মোট ১৮৯টি আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে বকশীগঞ্জে ৭৫টি এবং দেওয়ানগঞ্জে ১১৪টি আবেদন জমা হয়। আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের পর ইউনিয়ন ও পৌরসভাপ্রতি তিনটি প্রতিষ্ঠানের নাম জেলা প্রশাসকের কাছে সুপারিশ করা হয়। পরে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো সুপারিশের ভিত্তিতে গত রোববার ১১ অক্টোবর দুই উপজেলায় ১৭ জন সার ডিলারের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়।
প্রকাশিত তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বকশীগঞ্জের আটজন এবং দেওয়ানগঞ্জের নয়জন ডিলারের মধ্যে ১৬ জনের সঙ্গে বিএনপির রাজনীতির প্রত্যক্ষ বা পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে। বাকি একজন হলেন বকশীগঞ্জ পৌরসভার ডিলার শ্রী দিপক কুমার চৌধুরী। তার মালিকানাধীন মেসার্স জয় লোকনাথ ট্রেডার্স চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পেয়েছে।
দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার নয়জন ডিলারের তালিকায় রয়েছেন ডাংধরা ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি মো. মমতাজুল ফারুক আহামেদের মালিকানাধীন মেসার্স তাহমিদ ট্রেডার্স, বাহাদুরাবাদ ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম মোস্তফার মেসার্স মৌ এন্টারপ্রাইজ, চিকাজানি ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি মো. খুদু মিয়ার হাফসা এন্টারপ্রাইজ এবং পাররামরামপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. শফিউল আলমের মেসার্স সাজিদ এন্টারপ্রাইজ। এ ছাড়া দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভার ডিলার হিসেবে স্থান পেয়েছে বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের চাচাতো ভাই ও উপজেলা বিএনপির কোষাধ্যক্ষ মো. জাহিদুর রহমান সঞ্জয়ের মালিকানাধীন মেসার্স সিদ্দিকা এন্টারপ্রাইজ। দেওয়ানগঞ্জ সদর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি লিয়াকত আলীর স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসের মেসার্স বিসমিল্লাহ ট্রেডার্স, চুকাইবাড়ি ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আলমগীর হোসেনের ছেলে মো. ইউসুফ আহাম্মেদের মেসার্স ইউসুফ ট্রেডার্স, হাতিভাঙ্গা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সহসভাপতি মো. স্বাধীন মণ্ডল রফিকের মেসার্স কৃষি বীজ ভান্ডার এবং চর আমখাওয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল হাসেম মাস্টারের ছোট ভাই মো. আব্দুল মান্নানের মেসার্স রাসেল এন্ড রায়হান এন্টারপ্রাইজও তালিকায় রয়েছে।
বকশীগঞ্জ উপজেলার আটজন ডিলারের মধ্যে সাতজনের সঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মী বা তাদের আত্মীয়স্বজনের সংশ্লিষ্টতার কথা জানা গেছে।
তালিকায় রয়েছেন বগারচর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. শফিউল আলমের মেসার্স থ্রী ট্রেডার্স, নিলক্ষিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. মজিবুর রহমানের আরিফ এন্টারপ্রাইজ, সাধুরপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শাহিনুর ইসলামের মেসার্স আবির এন্টারপ্রাইজ এবং মেরুরচর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল ইসলামের মেসার্স শান্ত ট্রেডার্স।
এ ছাড়া বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের চাচাতো বোনের ছেলে আতিকুর রহমানের মেসার্স উমরাহ এন্টারপ্রাইজ, বকশীগঞ্জ সদর ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. ইউসুফ আলীর মেসার্স রকি এন্টারপ্রাইজ এবং উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি মো. মোতালেব সরকারের ছেলে ও সাবেক জেলা ছাত্রদল নেতা মো. লিমন সরকারের মেসার্স নাফি এন্টারপ্রাইজ ডিলার হিসেবে চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পেয়েছে।
দুই উপজেলার তালিকায় বিএনপির নেতাকর্মী ও তাদের স্বজনদের নাম বেশি থাকায় নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী ও আবেদনকারীদের একাংশ। তাঁদের প্রশ্ন, একই এলাকার একাধিক আবেদনকারীর মধ্য থেকে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোন কোন যোগ্যতা ও মানদণ্ড বিবেচনা করা হয়েছে, তা জনসমক্ষে স্পষ্ট করা প্রয়োজন ছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সার ডিলার আবেদনকারী বলেন, আমরা অনেকেই ডিলারের জন্য আবেদন করেছিলাম। কিন্তু কোনো প্রকার তদন্ত না করেই মনগড়াভাবে তাদের নামে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে বলে আমাদের অভিযোগ। এতে আমরা অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি হয়রানির শিকার হয়েছি।
মেরুরচর ইউনিয়নের নিয়োগপ্রাপ্ত ডিলার ও ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, আমাদের ইউনিয়ন থেকে সার ডিলারের জন্য ১৪ জন প্রার্থী আবেদন করেছিলেন। তাদের মধ্য থেকে কর্তৃপক্ষ আমাকে নিয়োগ দিয়েছে।কীভাবে নিয়োগ পেলেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি নিজের দক্ষতা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করেন।
নিলক্ষিয়া ইউনিয়নের নিয়োগপ্রাপ্ত ডিলার ও ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. মজিবুর রহমান বলেন, আমাদের ইউনিয়ন থেকে মোট আটজন আবেদন করেছিলেন। এর মধ্যে আমার নাম এক নম্বরে সুপারিশ করে পাঠানো হয়েছিল। পরে চূড়ান্ত তালিকায় আমার নাম এসেছে।
বকশীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও উপজেলা সার ডিলার নিয়োগ কমিটির সদস্যসচিব আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে সার ডিলারের জন্য একাধিক প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছিল। এর মধ্যে প্রতি ইউনিয়ন থেকে তিনটি প্রতিষ্ঠানের নাম জেলা কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। জেলা কমিটি ওই তিনটি প্রতিষ্ঠানের নাম মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করে। পরে মন্ত্রণালয় ডিলার নিয়োগ দিয়েছে।
দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও উপজেলা সার ডিলার নিয়োগ কমিটির সদস্যসচিব রতন মিয়া বলেন, এ উপজেলা থেকে মোট ১১৪ জন সার ডিলার প্রার্থী আবেদন করেছিলেন। আমরা আবেদনগুলো জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠিয়েছি। জেলা প্রশাসক সেগুলো মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করেছে।
