সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপের অর্থনৈতিক মূল্য এক নয়। কোনো দেশ কাঁচামাল সরবরাহ করলেই চূড়ান্ত পণ্য বিক্রির বড় অংশ সেখানে যায় না। একইভাবে উৎপাদন ও সংযোজনের কাজে বিপুলসংখ্যক কর্মী যুক্ত থাকলেও তাদের শ্রমের বিপরীতে পাওয়া অর্থ চূড়ান্ত পণ্যের মোট মূল্যের তুলনায় হতে পারে কম।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে বিশ্বজুড়ে। নতুন শিল্প ও ব্যবসা গড়ে উঠছে এ প্রযুক্তিকে ঘিরে। বাড়ছে চিপ, সার্ভার ও ডেটা সেন্টারের চাহিদা। এআই ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় এসব পণ্য তৈরিতে যুক্ত রয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠান ও কর্মীরা। কোথাও খনি থেকে তোলা হচ্ছে প্রয়োজনীয় খনিজ, কোথাও তৈরি হচ্ছে সেমিকন্ডাক্টর চিপ, আবার কোথাও হচ্ছে সার্ভারের চূড়ান্ত সংযোজন।
তবে পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে অংশ নিলেও সব দেশ ও প্রতিষ্ঠান সমানভাবে লাভবান হচ্ছে না। এআইয়ের ব্যবসা থেকে অর্জিত মুনাফার বড় অংশ যাচ্ছে প্রযুক্তির নকশা ও মেধাস্বত্বের নিয়ন্ত্রণ থাকা অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছে। এর মধ্যে আছে এনভিডিয়া, এসকে হাইনিক্স ও টিএসএমসির মতো কোম্পানি।
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা ইউএনসিটিএডির এক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে।
সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এআইয়ের সরবরাহ শৃঙ্খলের সবচেয়ে মূল্যবান ধাপগুলোয় কেন্দ্রীভূত হচ্ছে মুনাফা। অন্যদিকে কাঁচামাল সরবরাহ, উৎপাদন ও পণ্য সংযোজনের মতো কাজে যুক্ত অনেক দেশ ও প্রতিষ্ঠান তুলনামূলকভাবে কম অর্থনৈতিক সুবিধা পাচ্ছে। ফলে এআইয়ের বাজার সম্প্রসারণের সুফল বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়লেও এর আর্থিক লাভের বণ্টন সমানভাবে হচ্ছে না।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্যের প্রায় এক-ষষ্ঠাংশের সঙ্গে যুক্ত ছিল এআই চিপ ও সার্ভার। পণ্য বাণিজ্যের মূল্যভিত্তিক প্রবৃদ্ধিতে এসব পণ্যের অবদান ছিল ৪২ শতাংশ। এ পরিসংখ্যান এআই অবকাঠামোর ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব তুলে ধরে। তবে খাতটিতে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়লেও এর মাধ্যমে তৈরি হওয়া সম্পদের বড় অংশ কারা পাচ্ছে, সে প্রশ্নও সামনে আসছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এআই পরিচালনার উপযোগী উন্নত সার্ভার তৈরিতে দীর্ঘ ও জটিল সরবরাহ শৃঙ্খল কাজ করে। এর শুরু খনি থেকে উত্তোলিত বিভিন্ন খনিজ দিয়ে। এরপর এসব কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাত করা হয়। সেগুলো ব্যবহার করে তৈরি হয় সেমিকন্ডাক্টর চিপ ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ। সার্ভার পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরঞ্জাম ও শীতলীকরণ ব্যবস্থাও এ উৎপাদন প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সবশেষে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ একত্র করে তৈরি করা হয় পূর্ণাঙ্গ সার্ভার ব্যবস্থা।
দেশভেদে এ প্রক্রিয়ায় কাজের ধরন আলাদা। চিলি ও পেরুর মতো দেশ এআই হার্ডওয়্যার তৈরিতে প্রয়োজনীয় খনিজ সরবরাহ করে। সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান। অন্যদিকে মালয়েশিয়া ও মেক্সিকোর মতো দেশ সার্ভারসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্যের চূড়ান্ত সংযোজনের কাজে যুক্ত।
সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপের অর্থনৈতিক মূল্য এক নয়। কোনো দেশ কাঁচামাল সরবরাহ করলেই চূড়ান্ত পণ্য বিক্রির বড় অংশ সেখানে যায় না। একইভাবে উৎপাদন ও সংযোজনের কাজে বিপুলসংখ্যক কর্মী যুক্ত থাকলেও তাদের শ্রমের বিপরীতে পাওয়া অর্থ চূড়ান্ত পণ্যের মোট মূল্যের তুলনায় হতে পারে কম। এর বিপরীতে প্রযুক্তির নকশা, উন্নত চিপের নকশা তৈরি ও মেধাস্বত্বের মালিকানা থেকে আয় হয় বেশি।
ইউএনসিটিএডির প্রতিবেদনে এ বৈষম্যের একটি উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। উন্নত এআই সার্ভার তৈরিতে ব্যবহৃত সিলিকন, তামা ও টিনের মোট মূল্য চূড়ান্ত পণ্য বিক্রির দামের মাত্র দশমিক ২ শতাংশ।
এআই সরবরাহ শৃঙ্খলে মুনাফা বণ্টনের পার্থক্য বোঝাতে সংস্থাটি এনভিডিয়ার তৈরি জিবি২০০ এনভিএল৭২ সার্ভার ব্যবস্থা বিশ্লেষণ করেছে। উন্নত এআই মডেলের জন্য ব্যবহৃত এ অবকাঠামোর মূল্য প্রায় ৩৩ লাখ ডলার। সার্ভারটির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও উৎপাদন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান ও গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে কীভাবে অর্থ বণ্টন হয়, তা অনুসন্ধান করেছে সংস্থাটি। সেখানে দেখা গেছে, মুনাফার বড় অংশ পায় এনভিডিয়া। প্রতিষ্ঠানটি উন্নত এআই চিপের নকশা তৈরি করে এবং উৎপাদনের জন্য অন্য প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে। অর্থাৎ চিপের নকশা ও প্রযুক্তির মালিকানা ধরে রেখেই এনভিডিয়া এ ব্যবসার বড় আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে। অন্যদিকে সরাসরি পণ্য তৈরির কাজে যুক্ত প্রতিষ্ঠানের আয় ও মুনাফার অংশ তুলনামূলক কম।
এআই প্রযুক্তির বাজার সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর খনিজ রফতানি এবং উৎপাদন ও সংযোজনের কাজের সুযোগও বাড়ছে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশগুলো বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারে। তৈরি হতে পারে নতুন কর্মসংস্থান। তবে এ সুবিধা পেলেই এআই শিল্প থেকে সৃষ্ট সম্পদের বড় অংশ তাদের হাতে যাচ্ছে না।
প্রতিবেদন বলছে, এআই সরবরাহ শৃঙ্খলে যুক্ত হয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলো কর্মসংস্থান ও রফতানি বাড়ানোর সুযোগ পেলেও এসব কাজ থেকে অর্জিত অর্থনৈতিক সুবিধা প্রযুক্তির নকশা ও উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত কার্যক্রমের তুলনায় কম।
বিশ্লেষকদের মতে, এআই প্রযুক্তি তৈরির উচ্চ মূল্যের ধাপগুলোয় প্রবেশ করা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সহজ নয়। এ খাতে বিপুল পরিমাণ মূলধন প্রয়োজন। উন্নত প্রযুক্তি, গবেষণা ও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ব্যয়ও অনেক বেশি। পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক বাধা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রবেশের পথ কঠিন করে তুলতে পারে। আনাদোলু অবলম্বনে
