জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার ঝুঁকিতে নতুন করে চাপে পড়তে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতি। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের দামও বাড়তে পারে। এতে আমদানি ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক লেনদেনের ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে অর্থনৈতিক কর্মকা-ও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অক্টোবরের বিশ্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাস প্রতিবেদনে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য জ্বালানি ও খাদ্যের বাড়তি দামকে অন্যতম ঝুঁকি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে। ২০২৫ সালে এ হার ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যদিকে, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ২০২৫ সালের ৪ দশমিক ১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ৪ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বৃদ্ধিই এর অন্যতম কারণ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম আগের বছরের তুলনায় গড়ে ৪১ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়তে পারে। একই সময়ে জ্বালানি ছাড়া অন্যান্য পণ্যের দামও বাড়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। গম, শস্য ও কিছু কৃষিপণ্যের দাম বৃদ্ধির বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এবং আবহাওয়াজনিত কারণে খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হলে এ পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়ার বড় একটি ক্ষেত্র জ্বালানি আমদানি। দেশের শিল্পকারখানা, পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও কৃষি খাতের সঙ্গে জ্বালানির ব্যয় সরাসরি যুক্ত। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়লে আমদানি বাবদ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়তে পারে। জ্বালানির বাড়তি ব্যয় উৎপাদন ও পরিবহন খরচেও প্রভাব ফেলতে পারে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্য ও সেবার দামে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। খাদ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও দেশের বাজারে তার প্রভাব পড়তে পারে। আমদানিনির্ভর খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মূল্য, পরিবহন ব্যয় ও ডলারের বিনিময় হার গুরুত্বপূর্ণ। এসব উপাদানের ব্যয় বাড়লে আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের খরচ বেড়ে যায়। এর প্রভাব ভোক্তা পর্যায়ের দামে পড়লে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের পরিবারগুলো এ ধরনের পরিস্থিতিতে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। কারণ, তাদের আয়ের বড় অংশই খাবার, বাসস্থান ও যাতায়াতের মতো মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে ব্যয় হয়। এসব খাতে দাম বাড়লে অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে দিতে হয়। এতে পরিবারের সঞ্চয় কমার পাশাপাশি পুষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় করার সামর্থ্যও সীমিত হয়ে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। আইএমএফের অক্টোবরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে। এপ্রিলে সংস্থাটি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। একই অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমে যাওয়া এবং মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কার মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম আরও বেড়ে গেলে অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত প্রভাবিত হতে পারে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা এবং নি¤œ আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সুরক্ষার কাজ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
আইএমএফের প্রতিবেদনে বৈশ্বিক অর্থনীতির ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারের আর্থিক সক্ষমতা ধরে রাখা এবং সহায়তা কার্যক্রম লক্ষ্যভিত্তিক করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির মতে, জীবনযাত্রার ব্যয়সংকট মোকাবিলায় সবার জন্য ব্যাপক ভর্তুকি বা মূল্যনিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে সাময়িক ও নির্দিষ্ট সহায়তা দেওয়া কার্যকর হতে পারে।