কথায় আছে ‘যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ’। বাংলাদেশের সড়কে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষের লাশ পড়ছে রাস্তায়। বার বার ক্ষমতার হাত বদল হয়।
কথায় আছে ‘যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ’। বাংলাদেশের সড়কে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষের লাশ পড়ছে রাস্তায়। বার বার ক্ষমতার হাত বদল হয়। নানা প্রতিজ্ঞা অঙ্গীকার শোনে দেশের মানুষ। কিন্তু কিছুতে কিছুই বদলায় না। আগের মতোই বিশৃঙ্খলা নিয়ে চলতে হয় মানুষকে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসেব বলছে, দেশে ১৩ বছরে ৭২ হাজার ৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন নিহত হয়েছেন আর আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন। ২০১৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় এতগুলো মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। সড়কে দুর্ঘটনা বৃদ্ধির জন্য বিগত সরকারের ভুলনীতি, রেল ও নৌপথ সংকুচিত করা এবং সড়কনির্ভর যাতায়াত ব্যবস্থা দায়ী করেছেন বিশ্লেষকরা।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক বলেন, ‘স্বাধীনতার আগে দেশের প্রধান যাতায়াতমাধ্যম ছিল নৌপথ, দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল রেলপথ। নিরাপদ ও সাশ্রয়ী এই দু’মাধ্যমে তখন ৮০ শতাংশ মানুষের যাতায়াত হতো। সড়কপথে যাতায়াত করতেন ২০ শতাংশ মানুষ। কিন্তু স্বাধীনতার পর রেল ও নৌপথ সংকুচিত করে একের পর এক সড়ক নির্মাণ ও সম্প্রসারণের ফলে মানুষের যাতায়াত সড়কনির্ভর হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে সড়ক দুর্ঘটনার ওপরও।’ সড়ক খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল, লাইসেন্সবিহীন ও অদক্ষ চালক, সড়ক নির্মাণে ত্রুটি, বেপরোয়া গতি এবং মাদক সেবন করে যানবাহন চালানোর মতো কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে বলেও মন্তব্য করেন সমিতির মহাসচিব। চালকদের প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতা যাচাইয়ে দুর্বলতা এবং অযোগ্য যানবাহনকে ফিটনেস সনদ দেয়ার বিষয়টিও দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করেন তিনি।
এর সাথে মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার বেপরোয়া বৃদ্ধি ও চলাচল, সড়কে ডিভাইডার না থাকা, গাছপালার কারণে বাঁকে দৃষ্টিসীমা বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং মহাসড়কের নির্মাণত্রুটি দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। ট্রাফিক আইন অমান্য, উল্টোপথে যানবাহন চলাচল, সড়কে চাঁদাবাজি, পণ্যবাহী যানে যাত্রী পরিবহন, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং চালকদের বিরামহীনভাবে গাড়ি চালানোর কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে বলেও উল্লেখ করে যাত্রী কল্যাণ সমিতি।
প্রতিদিনের সড়কের বিশৃঙ্খলা নিয়ে একজন ব্লগার লিখেছেন, প্রতিদিন সকালে অফিসগামী মানুষের একটাই প্রার্থনা, 'আজ যেন কোনোভাবে সময়মতো পৌঁছাতে পারি।' ঢাকার রাস্তায় বের হলে মনে হয়, প্রতিটি মানুষ একেকজন যোদ্ধাÑ যাকে যুদ্ধ করতে হচ্ছে যানজট, ধোঁয়া, হর্ন, আর বেপরোয়া চালকদের প্রতিযোগিতার মধ্যে। বাস থামবে কি না, থামলেও উঠতে পারব কি না, উঠতে পারলেও সিট পাব কি নাÑ সবই নির্ভর করে ভাগ্যের ওপর। আর ভাগ্যের নিয়ন্ত্রণটা পুরোপুরি এমন এক সিস্টেমের হাতে, যার নাম 'বাংলাদেশের পরিবহন খাত'।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, দেশের পরিবহন খাতের স্টিয়ারিং আসলে কার হাতে ? দেখতে মনে হয় সরকারের হাতে, কিন্তু বাস্তবে সেটা নীতিহীন ক্ষমতার জোটের হাতে। মালিক-শ্রমিক সমিতি, রাজনৈতিক প্রভাবশালী গোষ্ঠী, আর চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট মিলে তৈরি করেছে এক অদৃশ্য রাজত্ব। সেখানে নিয়ম মানে ক্ষতি, বিশৃঙ্খলা মানে লাভ। আর এই রাজত্বের ভার বহন করে চলেছে প্রতিদিনের যাত্রীরা।
বলা হয় প্রতিটি গাড়িরই নাকি ফিটনেস সার্টিফিকেট আছে। কিন্তু রাস্তায় নামলেই বোঝা যায়-কাগজের সার্টিফিকেট আর বাস্তবের গাড়ি দুই জগতের জিনিস। অধিকাংশ বাস দেখতেই ভয় লাগে-সেগুলো এত ভাঙাচোরা। আবার দেখতে ঝকঝকে রঙ করা বাসের ভেতরে সিট ভাঙা, ব্রেক দুর্বল, আর ইঞ্জিন ক্লান্ত। কখনও ধোঁয়া ছুটে চোখে পানি আনে, কখনও ব্রেক ফেল হয়, কিংবা অন্য কোনো যান্ত্রিক গোলোযোগে রাস্তায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। প্রশাসনের চোখের সামনে প্রতিদিন এসব অনিয়ম চললেও দায় নিতে কেউ রাজি নয়।
বাংলাদেশের পরিবহন খাত কেবল অবকাঠামো নয়, এটি রাজনীতিরও অংশ। কোন মালিক কাকে সমর্থন করে, কোন রুট কার দখলেÑ এই হিসাবেই চলে সিদ্ধান্ত। একটি নতুন নীতি বা প্রকল্প মানে একদল ক্ষুব্ধ গোষ্ঠী, যারা ভেতরে ভেতরে প্রতিরোধ শুরু করে দেয়। ফলে পরিকল্পনা হারিয়ে যায় মাঠের রাজনীতিতে, শৃঙ্খলা হারে স্বার্থের কাছে।
গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষ ভেবেছিল, এবার পরিবর্তন আসবে। কিন্তু সড়কে তাকালে বোঝা যায়, শুধু শাসক বদলেছে, সিস্টেম নয়। একই বিশৃঙ্খলা, সিন্ডিকেট আর কণ্ঠস্বরÑশুধু স্লোগান পাল্টেছে। আমরা যে 'দ্বিতীয় স্বাধীনতা'র কথা বলছি, সেই স্বাধীনতা এখনো পৌঁছায় নি রাস্তায়, চালকের সিটে বা যাত্রীর হাতে। ঢাকার রাস্তায় আজ প্রতিটি বাস একেকটি গল্পÑক্লান্ত চালক, রুষ্ট যাত্রী, অচল সিগন্যাল, নিস্তেজ সিস্টেম। এই গল্প বদলাতে হলে শুধু বাহন বা রং নয়, মানসিকতাও বদলাতে হবে।
এদিকে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে এক বছরের পূর্ণাঙ্গ, সময়বদ্ধ ও পরিমাপযোগ্য কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন। তিনি বলেছেন, শুধু দিবস পালন নয়, সড়ক নিরাপত্তায় নেওয়া পদক্ষেপের বাস্তবায়ন ও অগ্রগতি নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। গতকাল বুধবার লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দেওয়া এক বার্তায় দেশবাসী, নিসচার নেতাকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও সড়ক ব্যবহারকারীদের জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস পালনের আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘সড়কে প্রতিটি জীবন মূল্যবান। নিরাপদ সড়ক গড়তে আসুন, আমরা সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করি’-এ আহ্বান জানিয়ে দেশবাসীকে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের শুভেচ্ছা জানান ইলিয়াস কাঞ্চন।
