সংবাদ · আন্তর্জাতিক
নিজের পা কেটে বাঁচার অবিশ্বাস গল্প এক ইউক্রেনীয় সেনার
২৪/১০/২০২৬

যুদ্ধ কেবল সংখ্যা আর মৃত্যুর হিসাব নয়; এটি মানুষের চরম অসহায়ত্ব, বেদনা আর টিকে থাকার এক নির্মম লড়াই। ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে আটকে পড়া এক সেনার গল্প যেন সেই মর্মান্তিক সত্যেরই প্রতিচ্ছবি। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা সেই সেনার গল্পে উঠে এসেছে প্রাণের অদম্য আকাঙ্ক্ষা, পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির ভয়ংকর ও বিস্ময়কর ব্যবহার।বোমায় বিধ্বস্ত একটি স্কুলের বয়লারের নিচে একটি গর্তে গুটিসুটি মেরে বসে ছিলেন ৪৯ বছর বয়সী ইউক্রেনীয় পদাতিক সেনা কোস্তিয়ান্তিন ভ্লাসেনকো। তখনই তাকে একটি ভয়ংকর সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তিনি বুঝতে পারেন, বেঁচে থাকতে হলে তার অবশিষ্ট পা-টিও কেটে ফেলতে হবে।গত ফেব্রুয়ারিতে রুশ ড্রোন হামলায় তার বাঁ পা হারিয়েছিলেন কোস্তিয়ান্তিন। একই হামলায় তার ডান পা ভেঙে বেঁকে গিয়েছিল। ফলে তিনি হামাগুড়িও দিতে পারছিলেন না। প্রায় তিন মাস পর তিনি নিজের কাছে থাকা একটি ছুরি দিয়ে সেই পা-টি কেটে ফেলতে বাধ্য হন। এরপর রক্তপাত বন্ধ করতে সেখানে একটি ব্যান্ডেজ বেঁধে দেন। শুধু ওই একটি সিদ্ধান্তই তাকে বাঁচিয়ে দেয়।মৃত্যুপুরীতে ৪৯১ দিনযুদ্ধক্ষেত্রের যে এলাকাটিতে তিনি ছিলেন, সেটি ‘মৃত্যুপুরী’ বা কিল জোন নামে পরিচিত। কারণ, সেখানকার আকাশে ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন ঘুরে বেড়ায়। একটু নড়াচড়া করলেই মৃত্যু। ওই ভয়ংকর এলাকায় মাটির অনেক গভীরে গর্ত খুঁড়ে টানা ৪৯১ দিন পার করেছেন কোস্তিয়ান্তিন।তার একমাত্র সহযোদ্ধা ‘বাস্কি’ ওই গর্তেই তার সঙ্গে ছিলেন। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে পানি ঢুকে যাওয়ায় তারা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া একটি স্কুল ভবনে আশ্রয় নেন। কিন্তু সেখানে বাইরে বেরোনোর সময় রুশ নজরদারি ড্রোনের নজরে পড়ে যান। এরপর ঘটে যায় মর্মান্তিক ঘটনা। বোমা হামলায় নিজের ৫০তম জন্মদিনেই প্রাণ হারান বাস্কি। আর কোস্তিয়ান্তিনের বাঁ পা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় এবং ডান পায়েও মারাত্মক আঘাত লাগে।পা দুটোই প্রায় অচল হয়ে যাওয়ার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন কোস্তিয়ান্তিন। বাঁচার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন। ইউক্রেনের খারকিভের একটি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে রয়টার্সকে তিনি বলেন, ‘আমি নিজেকে কবর দিয়েই ফেলেছিলাম। আমি জানতাম, বেঁচে ফেরার আর কোনো আশা নেই।’বাঁচার আশা হারালেও পেছনের সারির কমান্ডাররা তাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ড্রোনের হুমকির কারণে সেখানে পিকআপ বা সাঁজোয়া যান পাঠানো ছিল প্রায় অসম্ভব। দুটি চালকবিহীন যান পাঠানো হলে সেগুলোও রুশ ড্রোনের হামলায় ধ্বংস হয়ে যায়।অবশেষে স্থানীয় একটি কোম্পানির তৈরি ছয় পাখার একটি বিশাল ড্রোন দিয়ে তাকে উদ্ধারের পরিকল্পনা করা হয়। অক্টোবরের শুরুতে কোস্তিয়ান্তিনের কাছে একটি বেল্ট ও নির্দেশনার ভিডিও পাঠানো হয়। নিজের জীবনের ঝুঁকি জেনেও বাঁচার জন্য এটাই ছিল তার একমাত্র ভরসা।গত ৪ অক্টোবর সেই ড্রোনটি ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ড্রোন থেকে ঝুলে থাকা একটি আংটায় নিজেকে বেঁধে নেন কোস্তিয়ান্তিন। এরপর ড্রোনটি তাকে ৭০ মিটার ওপরে শূন্যে তুলে নেয়। রুশ ড্রোনের নজর ঘোরাতে ইউক্রেনের কয়েকটি ছোট ড্রোন ও গোলন্দাজ বাহিনী টানা দুই ঘণ্টা বোমাবর্ষণ করে। চরম উত্তেজনার ১৫ মিনিট পর উদ্ধারকারী ড্রোনটি তাকে ১৫ কিলোমিটার দূরে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দেয়।ইউক্রেনীয় কমান্ডারদের মতে, আকাশপথে ড্রোনের মাধ্যমে কোনো সেনাকে উদ্ধারের এটিই প্রথম জানা ঘটনা।যুদ্ধের এই নির্মম বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত মানুষের প্রাণ বাঁচানোর এক অদম্য আকাঙ্ক্ষারই পরিচয় দেয়। প্রাণের ভয় আর বেঁচে থাকার তীব্র ইচ্ছাই মানুষকে যেকোনো অসম্ভব কাজ করতে বাধ্য করে। আর এই গল্প যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেও শান্তির বার্তাই বহন করে—মানুষ চায় বেঁচে থাকুক, শান্তিতে ফিরে আসুক সবার স্বাভাবিক জীবন। সূত্র: রয়টার্স।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗