Published on
:
3 min read
এই বাংলায় যে সব পুজোর ইতিহাস অতি প্রাচীন তার মধ্যে একটি লক্ষ্মী পুজোয়। কারণ আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে দুর্গাপুজোর করার ইতিহাস খুব বেশি না থাকলেও, লক্ষ্মী পুজোর কিন্তু আছে। তাও কারও বাড়িতে নয়, একে বারে সর্বজনীন পুজো। যে পুজো দেখতে ভিড় করতো আশপাশের ৫১ গাঁয়ের মানুষ। শুধু তাই নয়, এটাই ছিল সেই ৫০-৫২টি গ্রামের একমাত্র লক্ষ্মীপুজো। যে পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, লোকবিশ্বাস এবং নানা অলৌকিক কাহিনি। এই ব্যতিক্রমী লক্ষ্মীপুজোর সাক্ষী বীরভূমের ময়ূরেশ্বরের ঘোষ গ্রাম।
কথিত, প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে এই গ্রামে হয়ে আসছে দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা। লক্ষ্মী এমনিতে ঘরে ঘরেই বেশি পূজিত হন। তাই তো তিনি গৃহলক্ষ্মী। এই দিনে বেশিরভাগ বাঙালি পরিবারেই দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা করতে হয়। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর দিনে গ্রামের কোনও বাড়িতেই আলাদা করে পুজো করা হয় না। গোটা গ্রামের মানুষ একত্রিত হয়ে গ্রামের মন্দিরেই ধনদেবীর আরাধনা করেন। জনশ্রুতি, রাজা হর্ষবর্ধনের আমল থেকেই এই পুজোর প্রচলন। সাধক কামদেব ব্রহ্মচারীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে এই পুজো শুরু করেছিলেন। সেই ঐতিহ্যই আজও বহন করে চলেছেন ঘোষ গ্রামের বাসিন্দারা।
কী করে হলো পুজোর শুরু?
জনশ্রুতি, প্রায় দেড় হাজার বছর আগে সাধক কামদেব ব্রহ্মচারী দেবীর সাধনার উপযুক্ত স্থান খুঁজতে খুঁজতে বীরভূমের রাঢ় অঞ্চলে এসে পৌঁছন। একচক্রধাম বীরচন্দ্রপুরে কিছুদিন থাকার পর ভরা বর্ষায় নদী পেরিয়ে তিনি ঘোষ গ্রামে আসেন। ক্লান্ত হয়ে এক নিমগাছের তলায় আশ্রয় নেন। কথিত, পরে সেই গাছের তলাতেই তিনি সাধনা শুরু করেন। দীর্ঘদিনের কঠোর সাধনার পর একদিন স্বপ্নে দেবী লক্ষ্মীর দর্শন পান তিনি। দেবী তাঁকে সেই স্থানেই নিজের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে পুজো শুরু করার নির্দেশ দেন।
শ্বেতপদ্ম ও কাঠের মূর্তির কাহিনি
দেবীর আরাধনা শুরু করার জন্য সাধককে সাহায্য করেন গ্রামের এক কৃষক, সজল ঘোষ। কথিত, একদিন পুকুরে ভাসতে থাকা একটি শ্বেতপদ্ম তুলতে গিয়ে কৃষক বার বার ব্যর্থ হন। পরে স্বপ্নাদেশ পেয়ে তিনি সাধক কামদেব ব্রহ্মচারীর কাছে পৌঁছন। কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে দু'জনে মিলে পুকুর থেকে ওই শ্বেতপদ্ম ও একটি ভাসমান কাঠখণ্ড সংগ্রহ করেন। সেই কাঠে গঙ্গামাটি লাগিয়ে দেবী লক্ষ্মীর মূর্তি তৈরি করে পুজো শুরু করেন সাধক।
পরবর্তীকালে এই পুজোর কথা জানতে পেরে মুর্শিদাবাদের কান্দির রাজা গ্রামে মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। সেই থেকেই গ্রামের মানুষের কাছে দেবী লক্ষ্মী হয়ে ওঠেন সর্বজনীন আরাধ্যা। আজও কোজাগরী পূর্ণিমায় মন্দিরে ভক্তদের ভিড় জমে। পুজোর অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ নবঘটের আরাধনা। ন’টি ঘটে জল ভরে পুজো করা হয়। সে দিন সকাল থেকেই বিশেষ পুজো হয়, রাতে হয় মহাযজ্ঞ। ১০৮টি ক্ষীরের নাডু আহুতি দেওয়া হয় যজ্ঞে।
বাংলার এই প্রাচীন পুজো কেবল ধর্মীয় আচার নয়, বরং একটি গ্রামের সম্মিলিত বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের প্রতীক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ঘোষ গ্রামের মানুষ সেই ঐতিহ্য আগলে রেখেছেন। বাড়িতে আলাদা করে লক্ষ্মীপুজো না করে গ্রামের মন্দিরে একসঙ্গে দেবীর আরাধনা করার রীতিই এই পুজোকে বাংলার অন্যান্য লক্ষ্মীপুজোর থেকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে।
বেলপাতা আহুতি দেওয়া হয় না। তবে সারা বছর পুজো হলেও বছরের চার দিন মন্দির বন্ধ থাকে। কারণ আশ্বিনের ২৮ তারিখ থেকে ২ কার্তিক পর্যন্ত মা জগৎ পরিক্রমায় বের হন। কোনও বছর ওই চার দিনের মধ্যে লক্ষ্মীপুজো পড়লে পুজো হয় না। মন্দির বন্ধই থাকে।
কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে এখানে কোনও বাড়িতে শাঁখ বাজে না। কেউ নিজের বাড়িতে লক্ষ্মীর ঝাঁপিও রাখেন না। বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো করা নিষিদ্ধ এই গ্রামে। এখানে মন্দিরেই দেবী ১২ মাস পূজিতা। লোকমুখে শোনা যায়, লক্ষ্মীর বসতভূমি এই গ্রাম। কিংবদন্তী বলে, তাই ঘোষ গ্রামে এক সময় ধান নয়, সরাসরি চাল ফলত। দীর্ঘদিন দেবীর হাতে তাই চালের শিষ শোভা পেত। শুধু ঘোষ গ্রামই নয়, পার্শ্ববর্তী বীরভূম ও মুর্শিদাবাদের ৫০টিরও বেশি গ্রামের আরাধ্য দেবী এই লক্ষ্মী। শতাব্দী প্রাচীন এই পুজো নিয়ে মেতে থাকেন আবালবৃদ্ধবনিতা।
