স্ট্রোকের পর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা: রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা ও পুনরুদ্ধারের পথ
ডাঃ মোহাম্মদ আনোয়ারুল আজিম চৌধুরী:
স্ট্রোকের পর রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় এবং পরে পরিবারের মনে অসংখ্য প্রশ্ন তৈরি হয়- রোগী কি আগের মতো কথা বলতে পারবেন? হাঁটতে পারবেন? স্মৃতিশক্তি কি ফিরে আসবে? স্বাভাবিক জীবনে ফেরা কি সম্ভব? এসব প্রশ্নের উত্তর স্ট্রোকের কারণ ও ধরণভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। স্ট্রোকের পর পূর্ণ সুস্থতায় ফেরা নির্ভর করে মস্তিষ্কের কোন অংশে এবং কী মাত্রায় তা অাঘাত করেছে, কতো দ্রুত চিকিৎসা শুরু হয়েছে এবং স্ট্রোক পরবর্তী পুনর্বাসন কতটা দক্ষতার সাথে করা হয়েছে -এসব বিষয়ের ওপর।
স্ট্রোক পরবর্তী চিকিৎসা ও সুস্থতার সম্ভাবনা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্ট্রোকের প্রকৃতি বা ধরণ এবং মস্তিষ্কের ক্ষতির মাত্রা সঠিকভাবে নির্ণয় করা জরুরি।
স্ট্রোকের ধরণ জানা কেন জরুরি?
রোগের কারণ এবং আক্রান্ত রক্তনালীর ধরণভেদে স্ট্রোক কয়েক ধরণের হয়ে থাকে। এদের মধ্যে সবচেয়ে কমন ইস্কিমিক স্ট্রোকে মস্তিষ্কের কোনো রক্তনালি বন্ধ হয়ে রক্তপ্রবাহ ব্যাহত হয়। অন্যদিকে, হেমোরেজিক স্ট্রোকে মস্তিষ্কের ভেতরে বা সন্নিহিত স্থানে রক্তক্ষরণ ঘটে। ধরণভেদে এই স্ট্রোকগুলোর চিকিৎসাপদ্ধতি একেবারে ভিন্ন। তাই শুধু লক্ষণ বা উপসর্গ দেখে চিকিৎসা শুরু না করে দ্রুত চিকিৎসকের মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হাসপাতালে পৌঁছানোর পর চিকিৎসক উপসর্গ, শুরুর সময়, রোগির সার্বিক শারীরিক অবস্থাএবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক স্বাস্থ্যসমস্যা মূল্যায়ন করেন। মস্তিষ্কের সিটি স্ক্যান অথবা ক্ষেত্রবিশেষে এমআরআই স্ক্যানের মাধ্যমে স্ট্রোকের ধরণ ও বিস্তৃতি সম্পর্কে জানা যায়। কিছু ক্ষেত্রে রক্তনালির ইমেজিং, প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষা, হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্রম মূল্যায়নসহ অতিরিক্ত পরীক্ষার প্রয়োজন হয়ে থাকে।
এই পরীক্ষাগুলো রোগ শনাক্ত করার পাশাপাশি উপযুক্ত চিকিৎসাপদ্ধতি নির্ধারণ, জটিলতার ঝুঁকি যাচাই এবং পরবর্তী পরিচর্যার পরিকল্পনায় সহায়তা করে।
দ্রুত চিকিৎসা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ইস্কিমিক স্ট্রোকের কিছু রোগীর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট, সংক্ষিপ্ত সময়সীমার মধ্যে ধমনীর জমাট রক্তপিন্ড ভেঙ্গে দেয়ার ঔষধ দেওয়া সম্ভব। বিশেষায়িত স্ট্রোক ইউনিটে উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে বিশেষ পদ্ধতিতে মস্তিষ্কের রক্তনালি থেকে জমাট রক্তপিন্ড অপসারণের চিকিৎসা করারও সুযোগ থাকে । কোন রোগী খুবই বিশেষ এধরণের চিকিৎসার উপযুক্ত, তা নির্ধারণের জন্য নির্দিষ্ট 'স্ট্রোক পাথওয়ে' বা 'প্রটোকল' অনুসরণ করা হয়।
অন্যদিকে, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হলে তাংক্ষণিক রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারসহ ভিন্ন ধরনের চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
অতএব, স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে বাসায় থেকে ভালো হয়ে যাওয়ার অপেক্ষা করা কিংবা নিজে নিজে ঔষধ নেয়ার মধ্য দিয়ে সময় নষ্ট করা উচিত নয়।
স্ট্রোকের লক্ষণ বুঝতে উন্নত দেশগুলোতে সাধারণ মানুষের জন্য 'FAST' অথবা 'BE FAST' pnemonic টি কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হয়। হঠাৎ মুখের এক পাশ বাঁকা হয়ে যাওয়া বা ঝুলে পড়া, হঠাৎ এক পাশের হাত বা পা অথবা উভয়ই দুর্বল হয়ে পড়া, অকস্মাৎ কথা জড়িয়ে যাওয়া কিংবা দৃষ্টিশক্তি অথবা ভারসাম্যহীনতার ভাব দেখা দেয়া - এগুলোর যে কোনটি ঘটলে কালক্ষেপণ না করে জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নিতে হবে।
সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কেমন?
স্ট্রোকের পর কোন কোন রোগির শারীরিক দুর্বলতা দ্রুত কমতে পারে, আবার কারো কারো ক্ষেত্রে দীর্ঘসময় চিকিৎসা ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয়। রোগিভেদে প্রয়োজন অনুযায়ী ফিজিক্যাল থেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি এবং পুষ্টিবিষয়ক সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে।
পুনর্বাসন শুরু করার সময় ও পদ্ধতি রোগীর শারীরিক স্থিতিশীলতা এবং চিকিৎসকের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। দ্রুততার সাথে উপযুক্ত পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শুরু করা গেলে তা অধিকাংশ রোগীর দৈনন্দিন কাজের সক্ষমতা ফিরে পাওয়ায় সহায়ক হয়। তবে সুস্থতার গতি ও মাত্রা সবার ক্ষেত্রে এক নয়। তাই অন্য কারো সঙ্গে তুলনা না করে প্রতিজন রোগিকে তাঁর রোগের প্রকৃতি, গতি বিবেচনায় সুস্থতার সম্ভাবনা অনুযায়ী চিকিৎসা পরিকল্পনা প্রণীত হয়ে থাকে।
দ্বিতীয় বা পরবর্তী স্ট্রোক প্রতিরোধও চিকিৎসার অংশ:
প্রথম স্ট্রোকের পর ভবিষ্যতে আবার স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি কমাতে কারণ শনাক্ত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তে অস্বাভাবিক মাত্রার কোলেস্টেরল এবং হৃদ্যন্ত্রের কিছু সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন। ধূমপান সর্বোতভাবে বর্জন করতেই হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঔষধ গ্রহণ, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং জীবনযাপনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সুস্থতা অর্জনে দীর্ঘমেয়াদী ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রামে নিউরোলজি বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে স্ট্রোকের ধরণ, চিকিৎসা পরিকল্পনা ও পরবর্তী পরিচর্যা-পুনর্বাসন সম্পর্কে রোগী ও পরিবারের সদস্যরা প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা নিতে পারেন। আগে বর্ণিত স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে অবশ্যই নিয়মিত চেম্বার/অফিস অ্যাপয়েন্টমেন্টের অপেক্ষায় না থেকে দ্রুত হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চলে আসতে হবে।
স্ট্রোক একটি গুরুতর পর্যায়ের রোগ। এই রোগের উপসর্গ ও চিকিৎসার পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা রাখা রোগি ও রোগির পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত রোগ নির্ণয়, উপযুক্ত চিকিৎসালাভ, সময়োচিত পুনর্বাসন এবং দ্বিতীয় বা পরবর্তী স্ট্রোক প্রতিরোধ -এই প্রক্রিয়াগুলোর পরিকল্পিত ও সমন্বিত প্রয়োগ রোগীর সুস্থজীবনে ফেরার সম্ভাবনার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক:
অ্যাটেন্ডিং কনসালট্যান্ট, নিউরোলজি
এভারকেয়ার হসপিটাল, চট্টগ্রাম।
