যোগেনদার (চৌধুরী) মৃত্যুসংবাদ পেয়ে যে মন খারাপ হয়েছে, সে তো আর আলাদা করে বলার বিষয় নয়। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর সকালটা শুরুই হল বিষাদভরে। কিন্তু সেই সংবাদ পেয়ে নতুন করে মনে পড়ছে আমাদের দু’জনের প্রথম আলাপের কথা।
যোগেনদার প্রয়াণের খবরটা পেয়েই ভাবছিলাম, চল্লিশের বছরের বন্ধুত্ব আমাদের! কত সুখের সময় কাটিয়েছি। শিল্প সংক্রান্ত কত আদানপ্রদান ঘটেছে আমাদের। যোগেন চৌধুরীর মতো শিল্পীকে কাছ থেকে পাওয়া আসলে একটা গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা। আর আমরা তো এত দিন বন্ধু থেকেছি। কত আড্ডা আর নৈশভোজে একসঙ্গে সময় কাটিয়েছি।
আনন্দবাজার ডট কমের ২০২৫ সালের ‘বছরের বেস্ট’ অনুষ্ঠানের মঞ্চে পরেশ মাইতির হাতে পুরষ্কার তুলে দিচ্ছেন যোগেন চৌধুরী। ছবি: আনন্দবাজার ডট কমের আর্কাইভ থেকে।
যোগেনদার সঙ্গে প্রথম আলাপ হয়েছিল ওঁরই একটি প্রদর্শনীতে গিয়ে। তখন তিনি যথেষ্ট নামী শিল্পী। আমি ওঁর গুণমুগ্ধ। গিয়ে আলাপ করলাম। নিজের পরিচয় দিলাম। আমি অনুজ। কিন্তু আচরণে সে দিনও তা বুঝতে দেননি। পরে তো নয়ই। প্রথম দিন থেকেই বন্ধুর মতো মিশলেন। নাম শুনে আমাকে বললেন, ‘‘আপনিই সেই শিল্পী! আপনি তো কত বড় বড় ছবি আঁকেন। আমি তো ছোট ছোট আঁকি!’’ এ রকমই সহজ ভঙ্গিতে সকলের সঙ্গে কথা বলতেন যোগেনদা। কে ছোট, কে বড়— ও সব নিয়ে ভাবনা ছিল না।
আসলে ভাবনা থাকবেই বা কী করে! এত বড় শিল্পী। কত শিল্পীকে পথ দেখিয়েছেন। শিল্পের জন্য কত যে কী করেছেন। শিল্পের বিস্তার ঘটানোর চেষ্টাতেই মশগুল থাকতেন। শান্তিনিকেতন ও কলকাতায় শিল্পচর্চার কেন্দ্র তৈরি করেছেন। তরুণ শিল্পীদের এগিয়ে যাওয়ার জন্য সবসময় উৎসাহ দিয়েছেন।
যোগেনের আঁকা প্রতিকৃতির প্রেক্ষাপটের অন্ধকার ছিল এক লক্ষণীয় বিষয়। ছবি: যোগেন চৌধুরীর অফিসিয়াল পেজ থেকে নেওয়া।
যোগেনদার কাজ ভারতীয় শিল্পের সংস্কৃতিতে অনন্য। শিল্পে ‘ক্রস হ্যাচটড’ ধারা তিনিই দেখিয়েছেন এ দেশকে। আর কেউ করেননি। ওঁর লাইন ড্রয়িংয়েরও খুব ভক্ত আমি। সবার মাঝে আড্ডা দিতে দিতে হঠাৎ কখন ড্রয়িংয়ের পাতায় মন দিতেন। নিজের মতো করে সৃষ্টি করতেন নতুন কিছু। এ রকম গুণ কিন্তু সচরাচর দেখা যায় না।
যোগেনদা গত কিছু দিন ধরেই বেশ অসুস্থ ছিলেন। রবিবার সকালে ওঁর চলে যাওয়ার খবর পেয়ে সব পুরনো কথা মনে পড়ছে। আমাদের দিল্লির বাড়িতে বহু বার এসেছেন। আমার স্ত্রী জয়শ্রীর (বর্মন) সঙ্গেও খুব সুন্দর সম্পর্ক ছিল। একসঙ্গে কত সময় কাটিয়েছি আমরা সকলে। সেই সব আড্ডার কথা মনে করতে করতে দিল্লি থেকে কলকাতা যাওয়ার টিকিট কাটলাম। প্রথম দেখা হয়েছিল যে কলকাতায়, সে শহরে গিয়েই অগ্রজ শিল্পীকে চিরবিদায় জানাব। যোগেনদার চলে যাওয়া শিল্পজগতের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।
(সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখিত)
