অজ্ঞান অবস্থায় অস্ত্রোপচারের টেবিলে শুয়ে থাকা রোগীর কানে কেন পরানো হচ্ছে দামি নয়েজ-ক্যান্সেলিং হেডফোন? চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রচলিত ধারণাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মানুষের মস্তিষ্কের এমন কোন গোপন খেলা আবিষ্কার করলেন চীনের বিজ্ঞানীরা, যা বদলে দিতে পারে পুরো অপারেশন থিয়েটারের চিত্র?
জীবনে কখনো অপারেশন থিয়েটারে যাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে আপনার? যদি হয়ে থাকে, তবে নিশ্চয়ই জানেন অস্ত্রোপচারের পর জ্ঞান ফেরার মুহূর্তটা কেমন অদ্ভুত হয়! একদিকে শরীরে কাটাছেঁড়ার ব্যথা, অন্যদিকে তার চেয়েও ভয়ংকর এক অস্বস্তি। প্রচণ্ড বমি বমি ভাব বা আক্ষরিক অর্থেই বমি হওয়া। ডাক্তারদের ভাষায় একে বলে পোস্ট-অপারেটিভ নসিয়া অ্যান্ড ভমিটিং। রোগীরা প্রায়ই বলেন, ‘অপারেশনের ব্যথার চেয়ে এই বমির চোটে প্রাণ যায় যায় অবস্থা!’ চিকিৎসকরা অবশ্য এর জন্য কড়া ডোজের ওষুধ দেন, কিন্তু তাতেও সবসময় পুরোপুরি কাজ হয় না। তবে এবার বিজ্ঞানীরা এমন এক অদ্ভুত ও সহজ সমাধান নিয়ে হাজির হয়েছেন, যা শুনলে আপনি অবাক না হয়ে পারবেন না। কোনো তেতো ওষুধ বা দামি ইনজেকশন নয়; অস্ত্রোপচারের সময় রোগীর কানে শুধু এক জোড়া নয়েজ-ক্যান্সেলিং হেডফোন গুঁজে দিলেই এই বমি ভাব ম্যাজিকের মতো কমে যায়! হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন। গান শোনার সেই পরিচিত হেডফোনই এখন চিকিৎসার নতুন হাতিয়ার।
কিন্তু কেন এমনটা হয়? বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই সাধারণ অথচ অভাবনীয় আবিষ্কারটি আমাদের মানব মস্তিষ্ক সম্পর্কে এক যুগান্তকারী সত্যকে সামনে নিয়ে এসেছে। আমরা এতকাল যা ভেবে এসেছি, ব্যাপারটা আসলে মোটেও তেমন নয়। অজ্ঞান অবস্থায় আমরা হয়তো বাইরের দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন থাকি, কিন্তু আমাদের মস্তিষ্ক ঘাপটি মেরে ঠিকই চারপাশের সব শব্দ স্ক্যান করতে থাকে!
একদিকে শরীরে কাটাছেঁড়ার ব্যথা, অন্যদিকে তার চেয়েও ভয়ংকর এক অস্বস্তি। প্রচণ্ড বমি বমি ভাব বা আক্ষরিক অর্থেই বমি হওয়া। ডাক্তারদের ভাষায় একে বলে পোস্ট-অপারেটিভ নসিয়া অ্যান্ড ভমিটিং।
তবে কি অ্যানেস্থেসিয়া পুরোটাই ধোঁকা
আপনার কি মনে হয়, অ্যানেস্থেসিয়া বা অজ্ঞান করার ওষুধ দেওয়া মানেই মস্তিষ্কের মেইন সুইচ অফ করে দেওয়া? হিউস্টনের বেলর কলেজ অব মেডিসিনের গবেষক ভিগি ক্যাটলোউইটজ কিন্তু একদম অন্য কথা বলছেন। তাঁর মতে, কয়েক দশকের গবেষণা প্রমাণ করেছে, অ্যানেস্থেসিয়া মোটেও ফ্যানের সুইচের মতো ‘অফ বাটন’ নয়। আপনি হয়তো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, আপনার শরীর অবশ, কিন্তু আপনার ব্রেন তখনো চারপাশের আওয়াজ প্রসেস করে চলেছে। ব্যাপারটা অনেকটা চলন্ত বাসে ঘুমানোর মতো। আপনি হয়তো অঘোরে ঘুমাচ্ছেন, কিন্তু কন্ডাক্টর যখন আপনার স্টপেজের নাম ধরে ডাকে, ঠিকই কিন্তু আপনার ঘুম ভেঙে যায়!
অস্ত্রোপচারের সময় রোগীকে অজ্ঞান করা হলেও, এই বমির সমস্যা কমানোর জন্য নতুন কোনো উপায় বের করা যায় কি না, তা নিয়েই কাজ করছিলেন চীনের সুচৌ ইউনিভার্সিটির ফার্স্ট অ্যাফিলিয়েটেড হাসপাতালের গবেষক হুয়াইউ লিউ এবং তাঁর দল। তাঁরা সম্প্রতি সান দিয়েগোতে অনুষ্ঠিত অ্যানেসথেসিওলজি কনফারেন্সে তাদের এই চাঞ্চল্যকর গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেন। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল ওষুধের বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে এই সমস্যার সমাধান করা।
হিউস্টনের বেলর কলেজ অব মেডিসিনের গবেষক ভিগি ক্যাটলোউইটজেরর মতে, কয়েক দশকের গবেষণা প্রমাণ করেছে, অ্যানেস্থেসিয়া মোটেও ফ্যানের সুইচের মতো অফ বাটন নয়।
তাঁরা একটি দারুণ পরীক্ষা চালান। ১৯২ জন নারী রোগীর ওপর এই পরীক্ষাটি করা হয়। রোগীদের সবাইকে সম্পূর্ণ অজ্ঞান করে নারীদের বিশেষ অস্ত্রোপচার (কিহোল সার্জারি) হওয়ার কথা ছিল। গবেষকেরা এই রোগীদের দুটি দলে ভাগ করে ফেলেন। এক দলকে অস্ত্রোপচার শুরু হওয়ার আগে থেকে শেষ পর্যন্ত কানে নয়েজ-ব্লকিং ইয়ার ডিফেন্ডার পরিয়ে রাখা হয়। অন্য দলকে তা দেওয়া হয়নি। তবে দুই দলের সবাইকেই নিয়ম অনুযায়ী অজ্ঞান করার সাধারণ ওষুধ এবং বমি রোধ করার স্ট্যান্ডার্ড ওষুধ দেওয়া হয়েছিল।
অস্ত্রোপচারের পর ৪৮ ঘণ্টা পার হতেই দেখা গেল সেই জাদুকরী ফলাফল। যেসব রোগীকে হেডফোন বা ইয়ার ডিফেন্ডার পরানো হয়েছিল, তাদের মধ্যে মাত্র ৩৫ শতাংশ রোগীর বমি বা বমি বমি ভাব দেখা গেছে। অন্যদিকে, যাদের কানে এই হেডফোন ছিল না, তাদের মধ্যে ৫২ শতাংশই বমির যন্ত্রণায় ভুগেছেন। শুধু তাই নয়, হেডফোন পরা রোগীদের মধ্যে যাদের সামান্য বমি ভাব হয়েছিল, সেটার মাত্রাও ছিল একদমই নগণ্য, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনে খুব একটা প্রভাব ফেলেনি।
শব্দ থেকে তৈরি হওয়া এই মানসিক চাপ যখন মস্তিষ্কের ব্রেনস্টেমের সেই নির্দিষ্ট অংশগুলোতে গিয়ে ধাক্কা মারে, যা বমি নিয়ন্ত্রণ করে, ঠিক তখনই অপারেশন শেষে রোগীর ভয়ংকর বমি শুরু হয়!
এখন আপনার মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, অপারেশন থিয়েটার তো একদম নীরব, পিনপতন নিস্তব্ধ একটা জায়গা। সেখানে আবার কিসের শব্দ? এখানেই আসল চমক! গবেষক লিউ মেপে দেখেছেন, একটি সাধারণ অপারেশন থিয়েটারে শব্দের গড় মাত্রা থাকে প্রায় ৬৬ ডেসিবল। এটি কিন্তু আপনার ড্রয়িংরুমে বসে দুজন মানুষের স্বাভাবিক স্বরে আড্ডা দেওয়ার শব্দের সমান! ভাবুন তো, সার্জনদের কথাবার্তা, ধাতব যন্ত্রপাতির ঠকঠক আওয়াজ, আর লাইফ-সাপোর্ট মনিটরের একটানা বিপ-বিপ শব্দ—সব মিলিয়ে সেখানে রীতিমতো একটা হট্টগোল চলতে থাকে।
কিন্তু শব্দের সঙ্গে বমির ঠিক কী সম্পর্ক? বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই বিকট শব্দগুলো আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। আপনি যখন রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় হঠাৎ গাড়ির তীব্র হর্ন শোনেন, তখন বুকের ভেতরটা যেমন ধক করে ওঠে, ঠিক তেমনি অজ্ঞান অবস্থায় এই যান্ত্রিক শব্দগুলো ব্রেনের ভেতর এক ধরনের মানসিক চাপের সৃষ্টি করে। এই চাপ সরাসরি আমাদের স্বয়ংক্রিয় নার্ভাস সিস্টেমকে জাগিয়ে তোলে। এই সিস্টেমটি আমাদের হৃৎস্পন্দন নিয়ন্ত্রণের মতো কাজগুলো করে। আর শব্দ থেকে তৈরি হওয়া এই মানসিক চাপ যখন মস্তিষ্কের ব্রেনস্টেমের সেই নির্দিষ্ট অংশগুলোতে গিয়ে ধাক্কা মারে, যা বমি নিয়ন্ত্রণ করে, ঠিক তখনই অপারেশন শেষে রোগীর ভয়ংকর বমি শুরু হয়!
গবেষক লিউ মেপে দেখেছেন, একটি সাধারণ অপারেশন থিয়েটারে শব্দের গড় মাত্রা থাকে প্রায় ৬৬ ডেসিবল। এটি আপনার ড্রয়িংরুমে বসে দুজন মানুষের স্বাভাবিক স্বরে আড্ডা দেওয়ার শব্দের সমান!
যদিও গবেষক লিউ পরিষ্কার করেই বলেছেন, হেডফোন পরলে ঠিক কীভাবে এই বমির প্রতিক্রিয়া পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, তার একেবারে ভেতরের বৈজ্ঞানিক কৌশলটি নিয়ে তারা এখনো কাজ করছেন এবং এটি আপাতত একটি শক্তিশালী অনুমান হিসেবেই রয়েছে। তবে এই গবেষণাটি অজ্ঞান অবস্থায় আমাদের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ সম্পর্কে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। লিউ আশা করছেন, ভবিষ্যতে বিভিন্ন হাসপাতালে আরও বড় পরিসরে এই নিয়ে কাজ করবেন। কে জানে, হয়তো অদূর ভবিষ্যতে অপারেশন থিয়েটারে ঢোকার আগে আপনাকে হাসপাতালের গাউনের পাশাপাশি এক জোড়া সুন্দর নয়েজ-ক্যান্সেলিং হেডফোনও ধরিয়ে দেওয়া হবে!
