বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে কালি দিয়ে মোছার চেষ্টার মামলায় তিন দিনের রিমান্ড শেষে আদালতে হাজির করা হয় ‘রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম’র সভাপতি আল নূর মোহাম্মদ আয়াসকে। এসময় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে দুই হাত জোড় করে ৪ বার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর (পিপি) কাছে ক্ষমা চাইতে দেখা যায়।
আজ বুধবার (১৪ অক্টোবর) বিকেলে ঢাকার মেট্রোপলিটন মাজিস্ট্রেট মো. রিয়াদ হাসানের আদালতে রিমান্ড শেষে আয়াস ও সহযোগী মারজিয়া খন্দকার রিমিকে হাজির করা হয়। এরপর শাহবাহ থানায় অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, বিদ্বেষ ছড়ানো ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে করা মামলায় কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক আব্দুল গাফফার হিমেল।
প্রথমে আসামিদের পক্ষে জামিন শুনানি করেন কয়েকজন আইনজীবী। তাদের মধ্যে মনির হোসাইন সুমন বলেন, ‘তারা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলেন নাই। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অনেকে ভালোবাসেন। অনেকে সমালোচনা করেন। কোনো কবি বিতর্কের ঊর্ধ্বে না। রবীন্দ্রনাথ কোনো ধর্মাবতার না। যে তাকে নিয়ে কিছু করলে ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ছেলেটা অসুস্থ। বহুবছর পর আমরা গণতান্ত্রিক সরকার পেয়েছি। আয়াসের মতো জুলাই যোদ্ধাদের প্রত্যাশা অনেক। ভুল ত্রুটি করলে শাসাতে পারেন। মুচলেকা নিতে পারেন। এতবড় শাস্তি দেওয়া ঠিক নয়।’
এদিকে শুনানির সময় খালি পায়ে ও এক হাতে ক্যানেলা পরা অবস্থায় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় আয়াসকে। রিমিও তার পাশে মুখে মাস্ক পরে দাঁড়িয়ে শুনানি শুনছিলেন। শুনানি চলাকালে বিকেল ৪টা ২৭ মিনিটে সময় পিপি ওমর ফারুক ফারুকীর দিকে তাকিয়ে আয়াস দুই হাত জোড় করে মাফ চাইতে থাকেন।
এর এক মিনিট পরে ফের দুই হাত জোড় করে আয়াস বলেন, ‘স্যার, প্লিজ।’ এসময় তার চোখ ছলছল করতে দেখা যায়।
আসামিপক্ষে আরেক আইনজীবী আয়াসের জামিন চেয়ে বলেন, ‘তাকে (আয়াস) রিমান্ডে নিয়ে মারধর করা হয়েছে৷ কোনো প্রতিবেদন না দিয়েই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিনি অসুস্থ্য।’ এরপর আয়াসের থেকে জানতে আইনজীবী জানতে চান তার কি সমস্যা। উত্তরে আয়াস বলেন, ‘গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা।’ এছাড়া রিমিকে নারী ও একটা ছোট্ট সন্তান আছে বিবেচনা করে জামিন চান তার আইনজীবী।
এরপর রাষ্ট্রপক্ষে পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী জামিনের বিরোধিতা করে শুনানি শুরু করেন। পিপির শুনানিকালে ৪ টা ৩০ মিনিটে ফের দুই হাত জোড় করে মাফ চান আয়াস।
এদিকে পিপি বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ। এখানে পাকিস্তান নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার কিছু ছিলনা। কেনো আপনি এখানে পাকিস্তানকে টানতে গেলেন। জীবনে দাদা-দাদীর কবর জেয়ারত করেন না। মিলাদ পড়ান না। পাকিস্তানে আরেক নেতার কবর জিয়ারত নিয়ে কেনো এত মাতামাতি। স্বাধীন দেশে পাকিস্তান-জিন্নাহকে টানা মানে এক ধরনের ষড়যন্ত্র।
পিপি বলেন, মাত্র দুইটা ওয়ালে গ্রাফিতি করা হয়েছে। তারা বিভিন্ন ওলামা, গোলাম আজম, নিমাজীর ছবি দেয়ার দাবি করতে পারে। কিন্তু আরেকজনের ছবির মুখে কালি লাগাতে পারেন না। তিনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে বলেছেন, আমি যা ইচ্ছা তাই করবো। এতে সরকারের কি, পুলিশের কি।'
পিপি ফারকী আরও বলেন, ‘আয়াস রবীন্দ্রনাথ ছাড়া কারো মুখে কালি দেয় নাই। রবীন্দ্রনাথের মুখে কালি দিয়ে মূলত হিন্দু সম্প্রদায়কে উসকে দিতে চায়। কারণ সামনে দুর্গা পূজা। ফ্রান্সের সেফুদার থেকে এরা গালি শিখেছে । সবসময় গালাগালি করে এরা। এরা নতুন প্রজন্মকে এসব শেখাচ্ছে। গালাগাল করলে মনে করে ভাইরাল হতে পারবো। খারাপ কথা বলে ভাইরাল হওয়ার সুযোগ আছে’।
বিকেল ৪ টা ৩৫ মিনিটে রিমি কাঠগড়ায় পাশে দাঁড়ানো আয়াসকে বলেন, ‘আমরা গালাগাল কখন দিলাম।’ তখন আয়াস তাকে বলেন, ‘চুপ করো। চুপ করে শোনো শুধু।’ এরপর আয়াস ছলছল চোখে পিপির দিকে তাকিয়ে থাকেন। এরপর দুই হাত জোড় করে ফের ক্ষমা চান।
এদিকে শুনানি চলাকালে রাষ্ট্র পক্ষের আইনজীবীরা আয়াশের আইনজীবীদের কয়েকজনকে জামাতের সমর্থক বলেন। এসময় আসামিপক্ষে থাকা আল মোহসিন তৌহিদ নামে একজন আইনজীবী হুঙ্কার দিয়ে উঠলে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও বাকবিতন্ডার এক পর্যায়ে হাতাহাতি শুরু হয়।
