বিস্মৃতির ধূসর পাতায় প্রায় আড়াল হয়ে গিয়েছিলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও কূটনীতিক গোলাম ওয়াহেদ চৌধুরী—যিনি জি ডব্লিউ চৌধুরী নামে সমধিক পরিচিত। সম্প্রতি তিনি নতুন করে আবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছেন। তবে কোনো নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের সূত্রে নয়, তার স্ত্রী দিলারা চৌধুরীর বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে তিনিও আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে দাবি করে বসেছেন, স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমান নাকি রেডিও-টেলিভিশনে আজান প্রচার বন্ধ করে দিয়েছিলেন; পরে এক প্রবীণ ব্যক্তির অনুরোধে তা ফের চালু করেন। তথ্যগতভাবে এমন দাবি পুরোপুরি ভিত্তিহীন হলেও, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত জি ডব্লিউ চৌধুরীর পারিবারিক বলয় থেকে বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে এমন বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা খুব একটা বিস্ময়কর কিছু নয়।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এমন কিছু বাঙালি চরিত্র আছে, যাদের অবস্থান বুঝতে হলে শুধু তারা কী করেছিলেন, তা জানলেই চলে না; তারা কীভাবে ঘটনাগুলো ব্যাখ্যা করেছিলেন, সেটিও পড়তে হয়। কারণ ইতিহাসের কোনো ঘটনায় একজন মানুষের ভূমিকা এবং পরবর্তী সময়ে সেই ঘটনাকে ব্যাখ্যা করার মধ্যে কখনো কখনো গভীর পার্থক্য থাকে। গোলাম ওয়াহেদ চৌধুরী ওরফে জি ডব্লিউ চৌধুরী তেমনই একজন।
তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, কূটনীতিক এবং পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের যোগাযোগমন্ত্রী। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন যখন চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগোচ্ছিল, তখন তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে ছিলেন। পাকিস্তানের সামরিক অভিযানের নৃশংসতার সমালোচনা করলেও তিনি পাকিস্তানের ঐক্য রক্ষার পক্ষে নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর, ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত তার লেখা ‘The Last Days of United Pakistan’ বইয়েও সেই অবস্থানের ছাপ স্পষ্ট।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা
জন্ম ১৯২৬ সালে মাদারীপুর জেলায়। ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। গোলাম ওয়াহেদ চৌধুরী ১৯৬৭ সালে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গবেষণা বিভাগের মহাপরিচালক হন। এর আগে ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর তাসখন্দ চুক্তি প্রণয়নের প্রক্রিয়াতেও তার ভূমিকা ছিল। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত তিনি পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের যোগাযোগমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এই পেশাগত যাত্রা তাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রের কাছে নিয়ে গিয়েছিল।doc ইয়াহিয়া খানের শাসনামলে ক্ষমতা হস্তান্তরের সাংবিধানিক পরিকল্পনা নিয়ে তিনি অভ্যন্তরীণ আলোচনা ও নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অংশ নিতেন।
ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা: নিজ বইয়ের সাক্ষ্য
বইয়ের মুখবন্ধে তিনি লিখেছেন, ‘নির্বাচিত বেসামরিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের তিন সদস্যের ‘পরিকল্পনা সেলের’ একজন সদস্য হিসেবে আমি আগেই তার পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম।’
পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ সাংবিধানিক কাঠামো নিয়ে আলোচনার সময় তিনি ইয়াহিয়ার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের সীমা কী হবে, কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে কোন কোন ক্ষমতা থাকবে এবং কীভাবে পাকিস্তানের ঐক্য বজায় রাখা সম্ভব—এসব বিষয়ে তিনি নিজের প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। চতুর্থ অধ্যায়ে তিনি বর্ণনা করেছেন, ১৯৭০ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন নিয়ে ইয়াহিয়ার সঙ্গে তার প্রায় প্রতিদিন আলোচনা হতো।
এখানে তার রাজনৈতিক অবস্থানটি স্পষ্ট। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের অর্থনৈতিক বৈষম্য ও স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেননি। বরং তার বইয়ে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বঞ্চনা, রাজস্ব ব্যয়, উন্নয়ন ব্যয় এবং বৈদেশিক সাহায্যের অসম বণ্টনের বিষয়গুলো স্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু তার কাছে এসব সমস্যার সমাধান ছিল পাকিস্তানের কাঠামোর ভেতরে একটি নতুন সাংবিধানিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা—স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টি নয়।
১৯৭১ সালের মার্চ: স্বাধীনতার প্রশ্নে তার অবস্থান
ফেব্রুয়ারিতে সরকারি দায়িত্বের অধ্যায় শেষ হওয়ার পর ১৯৭১ সালের মার্চে ঢাকায় শেখ মুজিবুর রহমান ও ইয়াহিয়া খানের আলোচনা চলাকালে চৌধুরী লন্ডনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন; সেখানে একটি একাডেমিক গবেষণা-নিয়োগ গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু মার্চের রাজনৈতিক সংকট তাকে আলোচনার গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে আগ্রহী করে তোলে। বইয়ে তিনি লিখেছেন, পাকিস্তানের ঐক্য রক্ষার জন্য ইয়াহিয়া যে রাজনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা করছিলেন, তার সম্ভাবনা নিয়ে তিনি তখনও আশাবাদী ছিলেন।
তার ধারণা ছিল শেখ মুজিবের ছয় দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হলে পাকিস্তানের ঐক্য বজায় রাখা সম্ভব হতে পারত। তিনি বিশ্বাস করতেন, নির্বাচনের পর শেখ মুজিব ছয় দফার কিছু বিষয় সংশোধন করে পাকিস্তানের ঐক্য রক্ষার সমঝোতায় আসবেন। তার বইয়ে তিনি দাবি করেছেন, ইয়াহিয়া এই প্রত্যাশার ওপর নির্ভর করেই রাজনৈতিক আলোচনার পথ খোলা রেখেছিলেন।
কিন্তু ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রশ্নটি শুধু ব্যক্তিগত আস্থা বা রাজনৈতিক সন্দেহের বিষয় ছিল না; এটি ছিল নির্বাচনের রায় কার্যকর করার সাংবিধানিক প্রশ্ন। চৌধুরীর বইয়ে এই প্রশ্নটি পাকিস্তানের ঐক্য রক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে; বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে যে গণরাজনৈতিক যুক্তি ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল, তা তার বিশ্লেষণে গুরুত্ব পায়নি।
সামরিক নৃশংসতার সমালোচনা, কিন্তু রাজনৈতিক অবস্থান অপরিবর্তিত
জি ডব্লিউ চৌধুরীর সামরিক অভিযানের সমালোচনাকে এমনভাবে উপস্থাপন করলেও ভুল হবে যে তিনি এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি তো তখন লন্ডনে সংবাদপত্র পড়ছেন এবং রেডিও ও টেলিভিশনের খবর শুনে পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করছেন। তার ভাষায়, বাঙালিদের নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছিল এবং পাকিস্তান ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল—এ ছিল তার জীবনের সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক সময়গুলোর একটি।
১৩ এপ্রিল ১৯৭১ তারিখে লন্ডন থেকে ইয়াহিয়া খানকে লেখা চিঠিতে তিনি সেনাবাহিনীর অভিযানের ফলে সৃষ্ট সন্ত্রাস ও ধ্বংসলীলা বন্ধ করার জন্য আকুল আবেদন জানান। তার বিবরণ অনুযায়ী, ইয়াহিয়ার জবাব হতাশাজনক ছিল।
১৬ মে করাচিতে পৌঁছে পরদিন ইয়াহিয়ার সঙ্গে দেখা করেন। সেখানে তিনি সেনাবাহিনীর নৃশংসতা সম্পর্কে নিজের প্রতিক্রিয়া জানান এবং পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি দেখতে ঢাকায় যাওয়ার কথা বলেন।
ইয়াহিয়া তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন যে ব্রিটিশ ও মার্কিন সংবাদপত্রে প্রকাশিত সব খবর সঠিক নয়। কিন্তু চৌধুরী নিজেই পরিস্থিতি দেখে আসার সিদ্ধান্ত নেন।
ঢাকার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, যেখানেই গেছেন, সেখানেই মানুষের স্বজন হারানোর গল্প শুনেছেন—কেউ ছেলে হারিয়েছেন, কেউ স্বামী; বহু গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি যারা মুজিবের বিচ্ছিন্নতার পরিকল্পনার সঙ্গে একমত নন—এমন মানুষও সেনাবাহিনীর নির্বিচার কর্মকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
এই বিবরণ তার রাজনৈতিক অবস্থান বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখায়, পাকিস্তানের ঐক্যের পক্ষে থাকা একজন বাঙালি মন্ত্রীও সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ডের ভয়াবহতা উপলব্ধি করেছিলেন। কিন্তু সেই উপলব্ধি তাকে পাকিস্তানের ঐক্যের ধারণা থেকে বিচ্ছিন্ন করেনি।
চৌধুরীর বইয়ে এই দ্বৈততা বারবার ফিরে আসে। তিনি একদিকে সেনাবাহিনীর নৃশংসতাকে নিন্দা করেছেন, অন্যদিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার রাজনৈতিক পরিণতিকে স্বাগত জানানোর বদলে পাকিস্তানের ভাঙনকে একটি ঐতিহাসিক বিপর্যয় হিসেবে দেখেছেন। তার কাছে পাকিস্তানের ঐক্য ছিল এমন এক রাজনৈতিক আদর্শ, যা রক্ষার সম্ভাবনা তিনি শেষ পর্যন্ত ত্যাগ করতে পারেননি। নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রশ্ন, ২৫ মার্চের সামরিক অভিযান এবং সেই অভিযানের ফলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনসমর্থন আরও দৃঢ় হয়ে ওঠার বিষয়গুলো তার ব্যাখ্যায় যথাযথ গুরুত্ব পায়নি।
বাংলাদেশের বিজয়, নাকি ভারতের বিজয়? মুক্তিযুদ্ধের তাৎপর্য অস্বীকার
বইয়ের ২২১-২২২ পৃষ্ঠায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের সামরিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি ১৯৭১ সালের ঘটনাবলিকে ভারতের বিজয় এবং পাকিস্তানের পরাজয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন। তার বিশ্লেষণে ভারতের সামরিক সাফল্য, পাকিস্তানের ভূখণ্ডগত বিভক্তি, দক্ষিণ এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্য এবং চীন-ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রাধান্য পেয়েছে। কিন্তু এই ব্যাখ্যায় বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন, পাকিস্তানি সামরিক দমননীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, লক্ষ লক্ষ বাঙালির প্রাণবিসর্জন এবং মুক্তিযোদ্ধা তথা গণমানুষের বীরত্বের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নিজস্ব তাৎপর্য আড়ালে পড়ে গেছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে তিনি এমন একটি আঞ্চলিক ক্ষমতার পরিবর্তনের মধ্যে স্থাপন করেছেন, যেখানে ভারতের প্রভাব বিস্তারই মুখ্য বিষয়। বাংলাদেশকে ভুটান বা সিকিমের সঙ্গে তুলনা করার মাধ্যমে স্বাধীন রাষ্ট্রটির নিজস্ব রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার একটি বয়ান তার আলোচনায় স্থান পেয়েছে। অর্থাৎ, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরিণতি হিসেবে একটি নতুন সার্বভৌম রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশের বদলে ভারতীয় প্রভাবাধীন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার সম্ভাবনাকে সামনে আনা হয়েছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রধান ঐতিহাসিক তাৎপর্য—পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামো থেকে বাঙালির রাজনৈতিক মুক্তি—তার আলোচনায় মুখ্য হয়ে ওঠেনি। মুক্তিযুদ্ধের বিজয়কে তিনি বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতা অর্জন হিসেবে দেখার বদলে ভারতীয় সামরিক সাফল্যের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
‘সমস্যার সমাপ্তি নয়, বরং সমস্যার শুরু’: বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ!
২২৩-২২৫ পৃষ্ঠায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে। সেখানে পাকিস্তানের সামরিক পুনরুত্থান, চীনের সঙ্গে তার সামরিক সহযোগিতা, ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক, সোভিয়েত ইউনিয়নের আঞ্চলিক ভূমিকা এবং ভারতের প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনা নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন। তিনি বলছেন, ১৯৭১ সালের পর পাকিস্তান সামরিকভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি; চীনের কাছ থেকে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম পাওয়ার মাধ্যমে দেশটি তার হারানো সক্ষমতার একটি অংশ পুনর্গঠন করেছিল। পাকিস্তানের সামরিক ও কূটনৈতিক পুনরুত্থানের এই আলোচনা তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে তিনি দেখাতে চেয়েছেন যে ১৯৭১ সালের পরাজয় দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের প্রাসঙ্গিকতা শেষ করে দেয়নি।
তিনি জানাচ্ছেন, ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার পতন সম্পর্কে চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন-লাই বলেছিলেন, সেটি ‘সমস্যার সমাপ্তি নয়, বরং সমস্যার শুরু মাত্র’।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর তিনি পাকিস্তানের সামরিক পুনর্গঠন এবং চীনের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ ভূমিকার ওপর জোর দিয়েছেন; পাশাপাশি ভারতের আঞ্চলিক আধিপত্যের আশঙ্কাকে সামনে এনেছেন।
তার আলোচনায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা তাই একটি জাতির রাজনৈতিক মুক্তির চূড়ান্ত অর্জন হিসেবে স্থির হয়ে থাকে না; বরং নতুন আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও নিরাপত্তা-সংকটের সূচনা হিসেবে প্রতিভাত হয়। এই বিন্যাসে বাংলাদেশের জনগণের বিজয় এবং স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে তাদের ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রশ্নটি প্রধান আলোচ্য হয়ে ওঠেনি।
নির্বাসন এবং প্রত্যাবর্তন
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর জি ডব্লিউ চৌধুরী নির্বাসিত জীবন কাটান। তিনি প্রথমে ইংল্যান্ডে এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। তিনি ১৯৮৫ সালে ঢাকায় ফিরে আসেন।
১৯৭১-এর ঘটনাকে তিনি বারবার ‘পাকিস্তানের অঙ্গচ্ছেদ’ (dismemberment) বলেছেন। নবম অধ্যায়ের শিরোনামই তা (Dismemberment of Pakistan)। ১৬ ডিসেম্বরকে তিনি লিখেছেন ভারতীয় সেনার ঢাকায় ‘বিজয়ী প্রবেশ’ (পৃ. ২০২)। আর ‘মুক্ত করা’ (‘liberate’) শব্দটি উদ্ধৃতি-চিহ্নে রেখে কটাক্ষ করেছেন (পৃ. ১৯৮)। ঢাকায় সবুজ-সাদা পতাকা নামানোর কথা তিনি ক্ষোভের সঙ্গে লিখেছেন (পৃ. ২৩১)। বইয়ের শেষ অংশে পাকিস্তানকে ‘ভারতীয় মুসলমানদের প্রিয় স্বদেশ’ বলেছেন (পৃ. ২৩২)।
জি ডব্লিউ চৌধুরীর ঐতিহাসিক গুরুত্ব তাই শুধু এই নয় যে তিনি ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। তার গুরুত্ব এই যে তিনি সামরিক অভিযানের নৃশংসতা উপলব্ধি করার পরও পাকিস্তানের ঐক্যের রাজনৈতিক ধারণা থেকে সরে আসেননি। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে একটি নতুন জাতির ন্যায্য রাজনৈতিক পরিণতি হিসেবে গ্রহণ করার পরিবর্তে পাকিস্তানের ভাঙন হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
স্ত্রী দিলারা চৌধুরী: সাম্প্রতিককালের বিতর্ক
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কয়েক মাসের মধ্যেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক জি ডব্লিউ চৌধুরীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
২০২৪-এর ৫ অগাস্টের পর তিনি নানা সেমিনার ও সমাবেশে বেশ সক্রিয়। কিছুদিন আগে এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন যে, শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষমতায় আসার পর রেডিও এবং টেলিভিশনে প্রচারিত আজান বন্ধ করে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ঢাকার বাইরের একটি জনসভায় এক বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তির অনুরোধে তিনি নাকি তা পুনরায় চালু করার নির্দেশ দেন। গণমাধ্যম গবেষক ও আর্কাইভের তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পূর্বে পাকিস্তান আমলেও তৎকালীন ঢাকা টেলিভিশন (বর্তমানে বিটিভি) কিংবা রেডিওতে নিয়মিত ৫ ওয়াক্ত আজান প্রচারের কোনো নিয়ম ছিল না। ফলে স্বাধীনতার পর ‘আজান বন্ধ করে দেওয়ার’ দাবিটি যৌক্তিক নয়; কারণ আগে থেকে এটি নিয়মিত সম্প্রচার হতো না। ১৯৭২-৭৫ সময়ের সংবাদপত্র (যেমন: দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা) এবং তৎকালীন টেলিভিশন ও রেডিওর অনুষ্ঠানসূচি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, শেখ মুজিবের আমলে রাষ্ট্রীয় বেতার বা টেলিভিশনে আজান বন্ধ করার কোনো সরকারি নির্দেশ জারি করা হয়নি।
২০১৮ সালের মে মাসে ইসলামাবাদের হাইকোর্ট এবং পাকিস্তান ইলেকট্রনিক মিডিয়া রেগুলেটরি অথরিটি সব চ্যানেলে বাধ্যতামূলক ৫ ওয়াক্ত আজান প্রচারের নির্দেশ জারি করে এবং তা কার্যকর করে।
একাত্তরের ফলাফল মেনে না নেওয়া
জি ডব্লিউ চৌধুরীর জীবন ও লেখা দেখায়, একাত্তরের ফলাফল মেনে না নেওয়া সব সময় প্রকাশ্য পুনরুদ্ধার কর্মসূচি বা রাজনৈতিক সংগঠনের মাধ্যমে প্রকাশ পায় না। কখনো তা প্রকাশ পায় একজন প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবীর ইতিহাস-ব্যাখ্যার মধ্যে—যেখানে পরাজিত রাষ্ট্রের ঐক্যই থেকে যায় রাজনৈতিক বৈধতার প্রধান মাপকাঠি, আর স্বাধীনতার পক্ষে বাঙালির সংগ্রাম সেই ব্যাখ্যায় স্থান পায় বিচ্ছিন্নতা ও রাষ্ট্রভাঙনের আখ্যান হিসেবে।
বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ: মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। ইমেইল: baizid.romana@gmail.com
