দেশে পর্যটন শিল্পের বিকাশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কক্সবাজারে গত দুই দশকে এক হাজারেরও বেশি আবাসিক হোটেল গড়ে উঠেছে। তবে এসব হোটেলের সঠিক তালিকা সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে নেই। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) নানা শর্ত ও অজুহাত দেখিয়ে হোটেল ও রিসোর্টের অনুমোদন দেয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ নানা অজুহাতে জরিমানা করেই তাদের দায়িত্ব সারে। দেশে সবচেয়ে পছন্দের জায়গা কক্সবাজারে এভাবে কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে পর্যটকরা হয়ে পড়ছেন নিরাপত্তাহীন। অথচ বছরে গড়ে ৯০ লাখ দেশি বিদেশি পর্যটক বেড়াতে আসেন কক্সবাজারে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পরিবেশ অধিদপ্তর গত এক বছরে প্রায় ৬০টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মোট ১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করেছে। এ ছাড়া কক্সবাজারের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় স্থাপনা তৈরির অভিযোগে ৩০টি নিয়মিত
মামলা করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা এ তথ্য জানান।
নতুন করে বড় বড় স্থাপনা গড়ে উঠছে কীভাবে? এমন প্রশ্নের জবাবে পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাহমুদ পাশা বলেন, প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় বড় স্থাপনা গড়ে উঠলেও এগুলোর কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। ছাড়পত্র না থাকলে এসব প্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও পরিচালনার সুযোগ পেল কীভাবে? জবাবে খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, দেখভাল করার জন্য জনবল নেই।
তিনি বলেন, কক্সবাজারের ১০টি উপজেলার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন মাত্র আটজন, যাদের মধ্যে সহকারী পরিচালক মাত্র দুজন। তাদেরই পরিবেশগত আইন প্রয়োগ, মামলা পরিচালনা এবং অন্যান্য দায়িত্ব সামলাতে হয়। সীমিত সংখ্যক লোকবল নিয়েই কক্সবাজারে পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যক্রম চলছে।
অন্যদিকে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) আবাসিক হোটেল ও রিসোর্টের অনুমোদনের আবেদন বছরের পর বছর আটকে রাখছে বলেও অভিযোগ। কক্সবাজার হোটেল-রিসোর্ট অফিসার সমিতির সভাপতি আওলাদ হোসেন কেনেডি আমাদের সময়কে বলেন, আমরা হোটেলের অনুমোদনের আবেদন করার পর তা দেখভাল করার জন্য একজন ব্যবস্থাপককে দায়িত্ব দেই। তাকে কউক কার্যালয়ে আসা-যাওয়া করার জন্য দুই জোড়া জুতা কিনে দিই। বছর শেষ হয়, জুতাও ক্ষয় হয়। কিন্তু অনুমোদন আর আসে না। কেনেডি অভিযোগ করেন, কউক যদি হোটেলের অনুমোদন দেয়, তাহলে সেগুলো জবাবদিহির আওতায় আনার অন্তত একটা সুযোগ থাকে। কিন্তু কক্সবাজারে বর্তমানে সেই সুযোগ নেই।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কক্সবাজার শহরেরর ডলফিন মোড় থেকে কলাতলি পর্যন্ত মোট হোটেলের সংখ্যা কম বেশি ৪০০। এর বাইরে ডলফিন থেকে পাটোয়ার টেক, ইনানি হয়ে সাবরাং পর্যন্ত আরও তিন শতাধিক হোটেল মোটেল ও রিসোর্ট আছে। কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ১৭টির অনুমোদন আছে। এসব নিয়ে কাজ করেন এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকারি কর্মকর্তাদের অবৈধ আয়ের একটা বড় উৎস হলো হোটেল ব্যবসায়ের খাত। কিন্তু পর্যটকদের জন্য ন্যূনতম সুযোগ সুবিধা, পরিচ্ছন্ন রাস্তাঘাট ও পরিবেশের কথা কর্তৃপক্ষ ভাবেই না।
প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় হোটেল মোটেল : গত শনিবার কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার সৈকত এলাকার টুপটুপ নামের একটি রিসোর্টে আগুনে ১০ জন মারা যান। এ ঘটনার পর এতগুলো সরকারি দপ্তরের নজরদারি, নোটিশ ও আইন প্রয়োগের উদ্যোগের বিষয়গুলো সামনে এসেছে।
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের ডলফিন মোড়ের দক্ষিণে ৮০ কিলোমিটার সৈকত প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। এখানে কোনো হোটেল মোটেল বা রিসোর্ট করার অনুমোদন নেই। এমনকি কোনো অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণের অনুমোদনও দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ কিছু বিরল প্রজাতির কচ্ছপ এ এলাকার বালিয়াড়িতে ডিম পাড়ার জন্য প্রতিবছর দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসে। এখানে আছে কিছু কাকড়াসহ সামুদ্রিক নানা প্রাণীর বিচরণও। ফলে এখানে স্থাপনা নির্মাণ না করার নির্দেশ দীর্ঘদিনের। কিন্তু এসব নিয়ম ও নির্দেশের প্রতি কোনো ধরনের সম্মান না দেখিয়ে প্রতিদিনই কাঁচা পাকা স্থাপনা গড়ে উঠছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল এমএ আজাদ আনোয়ার জানান, পুরো কক্সবাজার জেলায় ফায়ার সার্ভিসের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের দায়িত্বে রয়েছেন মাত্র একজন অনুমোদিত ইন্সপেক্টর। তার কাছে বিভিন্ন শ্রেণির প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১০০টি প্রতিষ্ঠান ই-ফায়ার লাইসেন্স নিয়েছে এবং আরও প্রায় ৫২টি প্রতিষ্ঠান এই ব্যবস্থায় আবেদন করেছে। অর্থাৎ, তার দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৪০০টি প্রতিষ্ঠানের ফায়ার লাইসেন্স নেই।
মেরিন ড্রাইভের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স আছে কিনা এবং লাইসেন্স না থাকলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে আজাদ আনোয়ার বলেন, এই প্রতিষ্ঠানটি একটি অবৈধ প্রতিষ্ঠান। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি জেলা প্রশাসক, ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা, কোনো কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই ব্যবসা পরিচালনা করছিল।
কউকের অথরাইজড অফিসার ফজলে রাব্বি জানান, টুপটুপ রিসোর্টকে ২০২৩ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে নোটিশ দেওয়া হচ্ছিল। কাজ বন্ধ করা এবং স্থাপনাটি অপসারণের নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি।
জানা যায়, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে টুপটুপ নামের গাছের তৈরি স্থাপনাটি অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু সরেনি। ফলে তদন্তে এখন শুধু স্থাপনাটি অনুমোদনহীন ছিল কিনা, তা নয়; বরং নির্দেশ দেওয়ার পরও কেন তা কার্যকর হয়নি, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা।
