ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মালিক ও নীতিনির্ধারকদের বিরুদ্ধে সরাসরি মুখ খোলার মধ্য দিয়ে লিসান্দ্রো মার্তিনেজ তুলে ধরেছেন দলটির ভেতরের অস্থিরতার চিত্রও। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দিবাগত রাতে আতলেতিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে ২-০ গোলে হারের পর তাঁর বক্তব্যে নতুন করে সামনে এসেছে ইউনাইটেডের বিনিয়োগ, দল গঠন ও পরিচালনা নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ।
২০২২ সালে ব্রিটিশ সাংবাদিক পিয়ার্স মরগানের কাছে মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোও একই ধরনের অভিযোগ করেছিলেন। সেই সময় সিআর৭ ছিলেন ইউনাইটেডের ফুটবলার। এবার একই অভিযোগ করলেন দলটির আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার মার্তিনেজ।
‘অ্যাতলেতিকোর অসাধারণ একটি দল আছে। আজ তারা জয়ের যোগ্য ছিল। তবে আমি আরও বিনিয়োগ আশা করি; ১০০ শতাংশ। আমি আমাদের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর (উইলকক্সের) কাছ থেকেও আরও কিছু আশা করি।’
সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে শেষ পাঁচ ম্যাচে এটি তাদের তৃতীয় হার। মাঠের পারফরম্যান্সে হতাশার ছাপ ছিল মার্তিনেজের খেলাতেও। কিন্তু ম্যাচ শেষে সম্প্রচারমাধ্যম অ্যামাজন প্রাইমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্লাবের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন আর্জেন্টাইন এই ডিফেন্ডার।
মার্তিনেজের অভিযোগ, প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করেনি ইউনাইটেডের কর্তাব্যক্তিরা। দীর্ঘদিন ধরে সমর্থকেরা যে অভিযোগ করে আসছেন, এবার দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ের মুখেও তা শোনা গেল। ফলে ক্লাবটির মালিকানা ও পরিচালনা নিয়ে চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
২০০৫ সাল থেকে গ্লেজার পরিবার ইউনাইটেডের সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিক। অন্যদিকে সংখ্যালঘু মালিক স্যার জিম র্যাটক্লিফও সমর্থকদের সমালোচনার মুখে রয়েছেন। আতলেতিকোর বিপক্ষে ম্যাচটি গ্যালারিতে বসে দেখেছেন র্যাটক্লিফ। ক্লাবের প্রধান নির্বাহী ওমর বেরাদা এবং ফুটবল পরিচালক জেসন উইলকক্সের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে মার্তিনেজের বক্তব্যে।
ম্যানইউকে রীতিমতো ধুয়ে দিয়েছেন মার্তিনেজ।
‘আমি আরও বিনিয়োগ আশা করি’
দলকে শক্তিশালী করতে আরও খেলোয়াড় আনার প্রয়োজন ছিল বলে মনে করেন মার্তিনেজ, ‘গত মৌসুমে আমরা দারুণ খেলেছি। এখন আমরা ওপরের মহল থেকে আরও কিছু আশা করি, আরও খেলোয়াড় চাই, যাতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারি। কারণ, অনেক দলই অনেক খেলোয়াড় দলে আনছে।’
আতলেতিকোর দলকে প্রশংসা করে মার্তিনেজ বলেন, ‘অ্যাতলেতিকোর অসাধারণ একটি দল আছে। আজ তারা জয়ের যোগ্য ছিল। তবে আমি আরও বিনিয়োগ আশা করি; ১০০ শতাংশ। আমি আমাদের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর (উইলকক্সের) কাছ থেকেও আরও কিছু আশা করি।’
এরপরই কোচ ও খেলোয়াড়দের বাইরে ক্লাবের অন্য বিভাগগুলোর দিকেও নজর দেওয়ার আহ্বান জানান মার্তিনেজ, ‘আজ কোচকে দোষ দেওয়া সহজ, খেলোয়াড়দের দোষ দেওয়াও সহজ। কিন্তু আমাদের অন্য বিভাগগুলোর দিকেও তাকাতে হবে। বারবার কোচ পরিবর্তন করে যেতে পারেন না। অন্য বিভাগগুলোর কী হবে? এর বেশি কিছু বলতে পারব না।’
‘আজ কোচকে দোষ দেওয়া সহজ, খেলোয়াড়দের দোষ দেওয়াও সহজ। কিন্তু আমাদের অন্য বিভাগগুলোর দিকেও তাকাতে হবে। বারবার কোচ পরিবর্তন করে যেতে পারেন না। অন্য বিভাগগুলোর কী হবে? এর বেশি কিছু বলতে পারব না।’
ইউনাইটেডের কোচ মাইকেল ক্যারিক অবশ্য শিষ্যের বক্তব্যের উত্তাপ কমানোর চেষ্টা করেছেন। তাঁর মতে, হারের পর আবেগ থেকেই এমন মন্তব্য করে থাকতে পারেন মার্তিনেজ। তবে বক্তব্যটি আবেগের বশে দেওয়া হোক কিংবা আগে থেকে ভেবে রাখা, তাতে ওল্ড ট্রাফোর্ডের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
গ্রীষ্মের দলবদলে পিছিয়ে ইউনাইটেড
গ্রীষ্মকালীন দলবদলে নতুন খেলোয়াড় আনতে প্রায় ১৫ কোটি পাউন্ড খরচ করেছে ইউনাইটেড। দলে এসেছেন মিডফিল্ডার কার্লোস বালেবা, ইউরি টিলেমানস ও আন্দ্রে সান্তোস। কিন্তু ক্যারিকের দলকে শক্তিশালী করতে প্রয়োজনীয় আরও কয়েকটি জায়গায় খেলোয়াড় আনা হয়নি।
নতুন কোনো বাঁ পায়ের ফুলব্যাক দলে যোগ হয়নি। আবার মূল স্ট্রাইকার বেনিয়ামিন সেস্কোর বিকল্প হিসেবেও কাউকে আনা হয়নি। প্রিমিয়ার লিগের মানের একজন নির্ভরযোগ্য ডান পায়ের ফুলব্যাকের অভাবও রয়েছে দলটিতে। পাশাপাশি প্রায় সব বিভাগেই পর্যাপ্ত বিকল্প খেলোয়াড়ের ঘাটতি আছে।
অ্যাতলেতিকোর বিপক্ষে ম্যাচে চোটের কারণে লুক শ ও সেস্কোকে পায়নি ইউনাইটেড। ছোট স্কোয়াডের এই সীমাবদ্ধতা দল গঠনে বিনিয়োগের ঘাটতিকে আরও স্পষ্ট করেছে।
এবারের গ্রীষ্মে ইউনাইটেডের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ খরচ করেছে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী। ম্যানচেস্টার সিটি নতুন খেলোয়াড় আনতে ব্যয় করেছে প্রায় ৪৫ কোটি পাউন্ড। চেলসি ও টটেনহ্যাম, দুই ক্লাবের খরচই ৩০ কোটি পাউন্ডের বেশি। লিভারপুল খরচ করেছে প্রায় ২২ কোটি ৭০ লাখ পাউন্ড। প্রিমিয়ার লিগে উন্নীত ইপসউইচের খরচও প্রায় ১৯ কোটি পাউন্ড, আর হাল সিটির খরচ প্রায় ১৫ কোটি ১০ লাখ পাউন্ড।
চ্যাম্পিয়নস লিগে ফেরার পর ইউনাইটেডের স্কোয়াডে বাড়তি শক্তি যোগ করার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু দলবদলের বাজারে অন্যদের তুলনায় পিছিয়ে থাকায় সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ম্যানেজমেন্টের উপর ক্ষেপে আছেন মার্তিনেজ।
মার্তিনেজ বলেন, ‘গত মৌসুমে যা করেছেন, তা নিয়েই পড়ে থাকতে পারবেন না। দলগুলো জানে আপনি কীভাবে খেলেন, আপনার খেলার প্রতিটি খুঁটিনাটি তারা জানে। পরের মৌসুমে যদি পরিবর্তন না আনেন, তাহলে বড় সমস্যা হবে।’
দোষ কার, প্রশ্ন সেখানেই
মাঠের পারফরম্যান্সও মার্তিনেজের উদ্বেগকে সমর্থন করছে। ক্যারিকের অধীনে সাত ম্যাচে মাত্র এক জয় পেয়েছে ইউনাইটেড। তাঁর আগের দুই কোচ এরিক টেন হাগ ও রুবেন আমোরিমের বিদায়ের আগের সাত ম্যাচের তুলনায়ও এই সময়টা খারাপ। দুজনই শেষ সাত ম্যাচে দুটি করে জয়ের পর চাকরি হারিয়েছিলেন।
জানুয়ারিতে লিডস ইউনাইটেডের বিপক্ষে ড্রয়ের পর বরখাস্ত হয়েছিলেন আমোরিম। রোববার সেই লিডসের বিপক্ষেই খেলতে নামবে ইউনাইটেড। এমন পরিস্থিতিতে মার্তিনেজের বক্তব্য খেলোয়াড় ও সমর্থকদের মধ্যে মালিকপক্ষ এবং পরিচালকদের বিরুদ্ধে অসন্তোষ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
মার্তিনেজ সরাসরি ফুটবল পরিচালক উইলকক্সের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে দলবদলে কত অর্থ খরচ করা যাবে, সেই সিদ্ধান্ত একা উইলকক্স নেন না। ক্লাবের প্রধান নির্বাহী বেরাদা আর্থিক সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে র্যাটক্লিফ ও গ্লেজার পরিবারের কাছ থেকে নির্দেশনা পান।
