কালবেলা · সাধারণ
সন্তানের স্বীকৃতি পেতে আইনি লড়াইয়ে যুবক
১৫/১০/২০২৬

যে বয়সে বাবার স্নেহ-ছায়ায় বেড়ে ওঠার কথা, সেই বয়সে নিজের পিতৃপরিচয়ের স্বীকৃতি পেতে আদালতের বারান্দায় ঘুরছেন কলেজছাত্র কামরুল ইসলাম অনিক। মাকে সঙ্গে নিয়ে বছরের পর বছর ধরে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন নিজের জন্মদাতা বাবার বিরুদ্ধে। ২২ বছর বয়সী অনিকের অভিযোগ, জন্মের পর থেকে কখনো বাবার স্নেহ পাননি তিনি। এমনকি বাবার পরিচয়টুকু পেতেও এখন আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়েছে তাকে।
অনিকের বাড়ি সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার তেলকুপি গ্রামে। অনিকের দাবি, তার বাবার নাম খুরশিদ জিন্নাহ ওরফে কার্বন। তিনি গুপিরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার রহমতগঞ্জ মহল্লার আব্দুর রউফ মনির ছেলে।
অনিকের মা হাফিজা খাতুনের দাবি, অনিকের জন্মের আগেই তাদের দাম্পত্য জীবনে ভাঙন ধরে। গর্ভে সন্তান আট মাসের থাকতেই স্থানীয় মাতব্বরদের নিয়ে ঘরোয়া সালিশের মাধ্যমে তাকে তালাক দেন খুরশিদ জিন্নাহ। এরপর মা-ছেলের আর কোনো খোঁজ নেননি তিনি।
হাফিজা খাতুন জানান, খুরশিদ জিন্নাহর সঙ্গে বিয়ের পর তারা তার বাবার বাড়িতে সংসার শুরু করেন। খুরশিদ তখন পঞ্চগড়ে গ্লোব এগ্রো কোম্পানিতে চাকরি করতেন। সেখান থেকে তার কাছে আসতেন এবং দু-এক দিন থেকে নিজের বাড়িতে ফিরে যেতেন। এভাবে প্রায় ছয় বছর তাদের সংসার চলে। এর মধ্যে খুরশিদ পঞ্চগড়ে আরেকটি বিয়ে করেন। বিষয়টি জানতে পেরে হাফিজা তার কর্মস্থলে গিয়ে অভিযোগ জানান। পরে ওই বিয়ের সঙ্গে জড়িত খুরশিদসহ কয়েকজন চাকরি হারান বলে দাবি করেন তিনি।
হাফিজার ভাষ্য, দ্বিতীয় বিয়ের পরও তাদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক বজায় ছিল এবং তিনি খুরশিদের দ্বিতীয় বিয়ে মেনেও নিয়েছিলেন। এরইমধ্যে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হন। বিষয়টি জানানোর পর খুরশিদ বারবার গর্ভের সন্তান নষ্ট করার জন্য চাপ দেন। তবে তিনি রাজি হননি। পরে আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় অসুস্থ হয়ে পড়লে স্থানীয় মাতব্বরদের নিয়ে সালিশের মাধ্যমে তাকে তালাক দেওয়া হয়।
২০০৪ সালের জানুয়ারিতে জন্ম হয় কামরুল ইসলাম অনিকের। হাফিজার অভিযোগ, জন্মের পর থেকে ২২ বছর পেরিয়ে গেলেও একবারের জন্যও ছেলেকে দেখতে আসেননি খুরশিদ, নেননি কোনো খোঁজখবরও।
ছেলেকে বড় করতে কখনো পোশাক কারখানায়, কখনো হাসপাতালে নার্সের কাজ করেছেন হাফিজা। কিন্তু বাবার অভাব অনিকের শৈশব থেকেই সঙ্গী। নিজের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
অনিক বলেন, ‘যখন আমি বুঝতে শিখেছি, সবার বাবা স্কুলে এসে সন্তানদের টাকা দিচ্ছে, কিন্তু আমার বাবা’-এ কথা বলেই কেঁদে ওঠেন তিনি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে অনিক বলেন, ‘পরে মায়ের কাছে জেনেছি, তাদের মধ্যে সম্পর্ক নেই। ছোটবেলা থেকে মামার বাড়িতে মানুষ হয়েছি, মামাকেই বাবা ডেকেছি। এখন আমি বড় হয়েছি, বাবার পরিচয়টা লাগে। কোথাও গিয়ে পরিচয় দিতে পারি না।’
অনিকের অভিযোগ, তার দাদা-দাদিও কখনো খোঁজ নেননি। তবে বড় চাচা ছোটবেলা থেকেই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এবং তাকে স্নেহ করেন।
হাফিজা খাতুন বলেন, ‘এত দিন নিজের পরিচয়ে ছেলেকে বড় করেছি। এখন ছেলের পিতৃপরিচয় দরকার। এ জন্য ২০২২ সালে সিরাজগঞ্জ আদালতে কামরুল ইসলাম অনিককে বাদী করে মামলা করেছি।’
মামলাটি তিন বছর ধরে চললেও তারা এখনো ন্যায়বিচার পাননি বলে অভিযোগ করেন হাফিজা। তার ভাষ্য, মামলায় ডিএনএ পরীক্ষার আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু বারবার তারিখ পড়লেও পরীক্ষা হচ্ছে না।
অনিক ও তার মায়ের বিষয়ে তেলকুপি গ্রামের জিয়াউর রহমান, মনিজা খাতুনসহ স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়। তারা জানান, খুরশিদ জিন্নাহ কার্বনের সঙ্গে হাফিজার বিয়ে হয়েছিল। হাফিজা আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা থাকতেই তাকে তালাক দেওয়া হয়। অনিকের জন্মের পরও খুরশিদ তার কোনো খোঁজ নেননি বলে তাদের দাবি।
অনিকের মামা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমি নিজে কাজি ডেকে এনে কার্বনের সঙ্গে হাফিজার বিয়ে দিয়েছিলাম। বিয়ের দিন তার পরিবারকে ডেকে এনেছিলাম। তারা কৌশলে তাকে নিয়ে যায়। তার পরিবার বিয়ে মেনে নেয়নি।’
ভাগনের শৈশবের কথা তুলে ধরে আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমার ভাগনের জন্য কষ্ট হয়। শিশু অবস্থায় সবাই যখন বাবা ডাকে, অনিক তখন তার বাবাকে পায়নি। আমার মেয়েরা আমাকে ডাকে, সেটা দেখে অনিকও আমাকে বাবা ডাকে। অনেকবার ধমক দিয়ে বলেছি, আমি তোমার মামা। কিন্তু সে এখনো আমাকে বাবা বলেই ডাকে।’
এ বিষয়ে খুরশিদ জিন্নাহ কার্বনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘যেটা আদালতে গড়িয়েছে, সেই সিদ্ধান্ত আদালতই দেবে। আমার সঙ্গে কথা বলে লাভ নেই।’
মূল প্রতিবেদনে যান ↗