একসময় টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের পরিচয় ছিল পিছিয়ে থাকা দল হিসেবে। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম দুই চক্রে নয় দলের মধ্যে সবার নিচে ছিল টাইগাররা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলেছে সেই চিত্র। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঐতিহাসিক জয়, পাকিস্তানকে তাদেরই মাঠে ধবলধোলাই এবং পেস-স্পিনের সম্মিলিত শক্তিতে এখন বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট তালিকায় চার নম্বরে বাংলাদেশ। দলের এমন উত্থানে মুগ্ধ পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেটার ও বিশ্লেষক রমিজ রাজা। তার মতে, অস্ট্রেলিয়াকে তাদের ডেরায় হারিয়ে ক্রিকেট বিশ্বকে নিজেদের সামর্থ্যের বার্তা দিয়েছে বাংলাদেশ।
গত আগস্টে ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে ইতিহাস গড়ে বাংলাদেশ। দীর্ঘ ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তাদের মাটিতে টেস্ট খেলার সুযোগ পেয়েছিল দলটি। সেই ম্যাচে প্রথমবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নেমেই নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন নাজমুল হোসেন শান্ত, মুশফিকুর রহিম, লিটন দাস ও হাসান মাহমুদরা। বল হাতে ৯ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা হন হাসান। অস্ট্রেলিয়ার ট্রাভিস হেড ও স্টিভ স্মিথের মতো ব্যাটারদের আটকে রাখার পাশাপাশি ব্যাট হাতে রেকর্ড গড়া সেঞ্চুরি করেন তানজিদ হাসান তামিম।
অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপের বিপক্ষে বাংলাদেশের এমন পারফরম্যান্সকে বিশেষভাবে দেখছেন রমিজ। নিজের অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে পাকিস্তানের সাবেক এই ক্রিকেট বিশ্লেষক বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপ একদমই সহজ ছিল না। বাংলাদেশ অনেক ভালো খেলেছিল। তাদের ভালো পেসার আছে, স্পিনার আছে। সঙ্গে ভালো ব্যাটারও। এসব কারণেই বাংলাদেশ আইসিসির বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে চার নম্বরে রয়েছে।’
বাংলাদেশের পেস আক্রমণের উন্নতিও রমিজের নজর এড়ায়নি। বিশেষ করে হাসান মাহমুদের বোলিংয়ে মুগ্ধ তিনি। ১৭ টেস্টে ৫০ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের পেসারদের মধ্যে দ্রুততম এই মাইলফলক স্পর্শ করেছেন হাসান। আবুধাবিতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে চলমান টেস্টে হ্যাটট্রিক করে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন তিনি। অলক কাপালি ও সোহাগ গাজীর পর তৃতীয় বাংলাদেশি হিসেবে টেস্টে হ্যাটট্রিকের কীর্তি গড়েছেন এই পেসার। একই ইনিংসে পেয়েছেন পাঁচ উইকেট।
হাসানের বোলিংয়ের প্রশংসা করে রমিজ বলেন, ‘হাসান মাহমুদের মুখে হাসি থাকে। নিখুঁত লাইন লেংথে বোলিং করে। আজ সে হ্যাটট্রিক করেছে।’
হাসানের মতো বাংলাদেশের অন্য বোলাররাও সাম্প্রতিক সময়ে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন। গত মে মাসে পাকিস্তানকে তাদের মাঠে টেস্ট সিরিজে ধবলধোলাই করার পথে তাইজুল ইসলাম, নাহিদ রানা ও মেহেদী হাসান মিরাজ ইনিংসে পাঁচ উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব দেখান। ব্যাট হাতে সেঞ্চুরি করেন অধিনায়ক শান্ত ও মুশফিকুর রহিম। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে যে পরিবর্তন এসেছে, তা এখন ফলাফলেই দৃশ্যমান।
এই পরিবর্তনের পেছনে অধিনায়ক শান্তর নেতৃত্বকে বড় করে দেখছেন রমিজ। তার মতে, বাংলাদেশের ক্রিকেটে উন্নতির ধারাটি শুধু একটি সিরিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সামনে আরও ভালো করার সামর্থ্য রয়েছে দলটির। বিশেষ করে ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ভালো ফলের প্রত্যাশা করছেন তিনি। দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতেও বাংলাদেশ কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়তে পারে বলে মনে করেন এই বিশ্লেষক।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে রমিজ বলেন, ‘বাংলাদেশ ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজ আছে। আমার মনে হয় তারা সেখানেও জিতবে। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে গিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকাকেও কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলবে। শান্তর নেতৃত্বে বাংলাদেশের অনেক উন্নতি হয়েছে।’
বর্তমানে ২০২৫-২৭ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে ৫৫.৫৬ শতাংশ সফলতার হার নিয়ে চার নম্বরে রয়েছে বাংলাদেশ। সামনে ঘরের মাঠে ইংল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দুটি করে টেস্ট খেলবে দলটি। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে রয়েছে আরও দুটি টেস্ট। এই ম্যাচগুলোতে ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে প্রথমবারের মতো বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে খেলার স্বপ্ন দেখতে পারে বাংলাদেশ।
আগের দুই চক্রে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল নয় দলের মধ্যে নবম। ২০২৩-২৫ চক্রে কিছুটা উন্নতি করে সপ্তম হয়েছিল দলটি। সেখান থেকে বর্তমান চক্রে চারে উঠে আসা বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের অগ্রগতিরই প্রতিফলন। ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সেও এগিয়ে রয়েছেন ক্রিকেটাররা। ২ হাজার ২১৫ রান নিয়ে এই চক্রে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রানসংগ্রাহক লিটন দাস। বোলিংয়ে ১১৯ উইকেট নিয়ে শীর্ষে তাইজুল ইসলাম। মেহেদী হাসান মিরাজও ১০২ উইকেট নিয়ে পেরিয়েছেন শতকের ঘর।
অবশ্য আবুধাবিতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে চলমান টেস্টটি ২০২৫-২৭ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে এই ম্যাচে হাসান মাহমুদের হ্যাটট্রিকসহ বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স দলের সামগ্রিক উন্নতির চিত্রই তুলে ধরছে। অস্ট্রেলিয়া জয় থেকে শুরু করে পাকিস্তানকে ধবলধোলাই-সব মিলিয়ে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেট এখন নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখছে। আর সেই অগ্রযাত্রায় শান্তর নেতৃত্বকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন রমিজ রাজা!
