রিফাত দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র। বয়সের হিসেবে নদীর ঠিক সেই মোহনায় দাঁড়িয়ে, যার একদিকে অজানা সমুদ্র, অন্যদিকে পরিচিত তীর। পৃথিবী সম্পর্কে তার জানাশোনা কম নয়; বইয়ের পাতায় মহাকাশের অসংখ্য ছবি দেখেছে, মঙ্গলগ্রহের লালচে মাটি, শনির বলয়, বৃহস্পতির বিশালতা, সবই তাকে মুগ্ধ করে।
রিফাতের বাবা হেমায়েত। লেখাপড়ার দৌড় তাঁর বেশি দূর এগোয়নি। পাড়ার মোড়ে ছোট্ট একটি মুদির দোকান চালান। দোকানটিই তাঁর পৃথিবী। চাল, ডাল, লবণ, তেল, বিস্কুট আর মানুষের নিত্যদিনের ছোটখাটো প্রয়োজনের হিসাব কষতে কষতেই কেটে যায় তাঁর দিন। ছেলের পড়াশোনার খরচ জোগাতে গিয়ে বহুবার নিজের প্রয়োজনকে পেছনে ঠেলে দিয়েছেন। তাঁর স্বপ্ন একটাই, ছেলেটাকে যেন তাঁর মতো হতে না হয়; জীবনের দরজাগুলো যেন তার সামনে একটু বেশি খোলা থাকে।
এক সন্ধ্যায় রিফাতের মোবাইলে একটি ক্ষুদেবার্তা এল। ‘মঙ্গলগ্রহে যাওয়ার জন্য আপনাকে মনোনীত করা হয়েছে। আগ্রহী হলে বুকিং নিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট বিকাশ নম্বরে এক লাখ টাকা পাঠান।’
বার্তাটি পড়ার পর রিফাতের চোখ হঠাৎ নক্ষত্রের আলোয় ভরে উঠল।
মঙ্গলগ্রহ! সত্যিই সে মঙ্গলগ্রহে যাবে?
সে বারবার ক্ষুদেবার্তাটি পড়ল। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক উত্তেজনা। মনে হলো, এতদিন যে মহাকাশকে সে বইয়ের পাতায় দেখেছে, এবার সেই মহাকাশই তাকে ডাকছে।
কিন্তু হেমায়েত একথা শুনে শক্ত হয়ে গেলেন।
‘ভুয়া কথা। মানুষ ঠকানোর নয়া ফন্দি।’
রিফাত প্রতিবাদ করে বলে, ‘তুমি কী জান? এসবের কী বোঝ? ওরা আমাকে মঙ্গলগ্রহে নিয়ে যাবে। সারা দুনিয়ার মিডিয়ায় আমার ছবি প্রকাশিত হবে। আমাকে নিয়ে নিউজ হবে। সবাই আমাকে চিনবে। তোমাকে আর মুদির দোকান করা লাগবে না। অনেক অনেক টাকা হবে আমাদের।’
‘জানি না ঠিক আছে, কিন্তু এটুকু বোঝার বয়স তো হলো, বিনা কারণে কেউ কাউকে মঙ্গলগ্রহে পাঠায়! আর তার আগে এক লাখ টাকা চায়, এটা কেমন কথা?’
‘তুমি কিছুই বোঝ না বাবা। এটা বড় একটা সুযোগ।’
‘সুযোগ হলে তারা তোকে আগে টাকা দিতে বলবে কেন?’
রিফাত চুপ করে গেল। কিন্তু তার চোখে তখন যুক্তির আলো ছিল না, ছিল স্বপ্নের আগুন।
পরদিন থেকে সংসারে শুরু হলো অশান্তি।
রিফাত এক লাখ টাকা জোগাড় করার জন্য অস্থির হয়ে উঠল। বাবাকে বোঝাতে লাগল, আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করতে হবে, দোকান বন্ধক রাখতে হবে, প্রয়োজনে জমি বিক্রি করতে হবে। হেমায়েত যতই বোঝান, ছেলের কাছে তাঁর প্রতিটি কথা যেন অন্ধকারের দেয়ালে ছুড়ে দেওয়া পাথর।
‘তুই বুঝছিস না রে,’ হেমায়েত বলেন, ‘ওরা তোকে ঠকাবে।’
‘ওরা আমার উপকার করতে চাইছে। বরং তুমিই আমাকে ঠেকাচ্ছ!’
রাগের মাথায় রিফাত বলে ফেলল, ‘তুমি আমার ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দিচ্ছ বাবা।’
কথাটি হেমায়েতের বুকের মধ্যে গিয়ে এমনভাবে বিঁধল, যেন কেউ নিঃশব্দে ছুরি চালিয়েছে।
সেদিন রাতে তিনি দোকানের সামনে বসে অনেকক্ষণ অন্ধকার রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তাঁর মনে হচ্ছিল, তিনি ছেলের জন্য সারা জীবন যা করেছেন, সবকিছুই যেন এক মুহূর্তে অর্থহীন হয়ে গেছে।
এদিকে রিফাতের অবস্থাও ক্রমে খারাপ হতে লাগল। সে খাওয়া-দাওয়া কমিয়ে দিল, ঘুম হারাম হয়ে গেল। সারাক্ষণ মোবাইল হাতে বসে থাকে। বারবার সেই ক্ষুদেবার্তাটা পড়ে। কখনো চোখ বন্ধ করে কল্পনা করে, সে মহাকাশযানে বসে আছে, জানালার ওপারে পৃথিবী ছোট্ট নীল গোলকের মতো ভাসছে।
রিফাত আর স্বাভাবিক আচরণ করছে না। এমন তার অবস্থা, যেন বিরাট কিছু হয়ে গেল তার সঙ্গে। একটা ছোট্ট ক্ষুদেবার্তা যে এমন মেসমেরিজমের মতো কাজ করতে পারে, কেউ ভাবতেই পারল না। ছেলের একটা সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য হেমায়েত নিজের কত স্বাদ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়েছেন, তার ইয়ত্তা নেই। আর চোখের সামনেই কিনা ছেলেটার জীবন এভাবে তছনছ হতে বসলো!
কোনো উপায়ান্তর না দেখে হেমায়েত ছেলেকে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে গেলেন। ডাক্তার সাহেব রিফাতের কথা মন দিয়ে শুনলেন। কোনো তর্ক করলেন না, কোনো উপহাসও করলেন না। বরং মৃদু হেসে বললেন, ‘তুমি মঙ্গলগ্রহে যেতে চাও?’
‘হ্যাঁ।’
‘কেন?’
রিফাত বলল, ‘কারণ ওখানে যাওয়া জীবনের সবচেয়ে বড় ঘটনা হবে।’
মনোচিকিৎসক কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন, ‘তুমি কি জানো, পৃথিবীও একটি গ্রহ?’
‘অবশ্যই জানি।’
‘কিন্তু তুমি কি কখনো ভেবে দেখেছ, আমরা যে গ্রহটিতে বাস করছি, সেটি মহাবিশ্বের অসংখ্য গ্রহের মধ্যে অন্যতম একটি। তাও অন্য গ্রহগুলোর মতো জীবনধারণের পক্ষে অনুপযোগী নয়। তবে হ্যাঁ, মঙ্গলগ্রহের প্রতি আমাদের আকর্ষণ আর কৌতূহল তৈরি হওয়ার পেছনে যথেষ্ট যৌক্তিক কারণ আছে। বিজ্ঞানীদের গবেষণার মাধ্যমে প্রকাশিত নানা উদ্দীপনামূলক তথ্য আমাদের আরও বেশি আগ্রহী করে তুলতে ভূমিকা রাখছে। আর উল্টোদিকে পৃথিবীকে আমরা এত কাছে পেয়েছি যে তার বিস্ময়গুলোকে স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়েছি।’
রিফাত চুপ করে রইল।
‘তুমি মঙ্গলগ্রহে যেতে এক লাখ টাকা দিতে রাজি। অথচ এই পৃথিবীতে আসার জন্য তোমাকে কোনো টাকা দিতে হয়নি।’
রিফাতের ভ্রু কুঁচকে গেল।
‘আমরা সবাই একটি বিস্ময়কর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে এসেছি। কেউ আমাদের কাছ থেকে প্রবেশমূল্য নেয়নি। কোনো বুকিং ফি লাগেনি। কোনো বিকাশ নম্বরে টাকা পাঠাতে হয়নি। তবু আমরা পেয়েছি আকাশ, বাতাস, নদী, পাহাড়, বৃষ্টি, ফুল, পাখি, ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, মায়ের মুখ, বাবার হাত, কত কী!’
কথাগুলো রিফাতের ভেতরে ধীরে ধীরে আলোড়ন তুলতে আরম্ভ করল।
চিকিৎসক টেবিল থেকে কয়েকটি বই রিফাতের হাতে তুলে দিলেন।
‘এগুলো পড়ো। পৃথিবীকে নতুন করে চিনতে চেষ্টা করো। নিজেকে একটু সময় দাও। বই পড়া শেষ হলে একবার এসো। একসঙ্গে চা খাব।’
সেদিন থেকে রিফাতের জীবনে ভিন্নধরনের একটি ভ্রমণ শুরু হলো। সে ভ্রমণ কোনো মহাকাশযানে নয়, বইয়ের পাতায়।
সে পড়ল পৃথিবীর জন্মের ইতিহাস। পড়ল সমুদ্রের কথা, অরণ্যের কথা, পাখির পরিযান, প্রজাপতির ডানার নকশা, মানুষের সভ্যতার উত্থান, প্রেমের কবিতা, নদীর স্রোত, শিশুর হাসি, মায়ের মমতা। পড়তে পড়তে তার মনে হলো, পৃথিবীকে সে এতদিন দেখেছে, কিন্তু চিনতে পারেনি।
একদিন ভোরে ছাদে দাঁড়িয়ে সে সূর্যোদয় দেখছিল।
আকাশের পূর্বদিগন্তে সূর্যের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছিল। মনে হলো, কেউ যেন নীল ক্যানভাসে সোনালি রঙের তুলির প্রথম আঁচড়টি টেনে দিয়েছে।
রিফাত হঠাৎ ভাবল, এই দৃশ্য দেখার জন্য কি কোনো বুকিং লাগে?
একদিন বৃষ্টিতে জানালার পাশে বসে সে দেখল, টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ হচ্ছে। তার মনে হলো, মহাকাশের কোটি কোটি রহস্যের মধ্যে এই শব্দটিও কি কম আশ্চর্যের?
আরেকদিন মায়ের হাতে ভাত খেতে খেতে সে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। এতদিন যে মুখটিকে সে প্রতিদিন দেখেছে, সেই মুখটিই হঠাৎ তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান দৃশ্য বলে মনে হলো।
এভাবে একটা মাস কীভাবে অতিক্রান্ত হয়ে গেল, রিফাত বুঝতেই পারে না।
এখন সে মনোচিকিৎসক কামরুল হুদার সামনে বসা। তিনি মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মঙ্গলগ্রহে যেতে চাও?’
রিফাতের মুখে হাসির চিহ্ন প্রস্ফুটিত হলো।
‘এখন মনে হয়, স্যার, আমি যে গ্রহে আছি, সেটাকেই তো এখনো ভালো করে দেখা হয়নি।’
‘তাহলে?’
‘মঙ্গলগ্রহে যাওয়ার স্বপ্নটা হয়তো খারাপ ছিল না। কিন্তু পৃথিবীকে না জেনে অন্য গ্রহে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাটা ছিল আমার অজ্ঞতা।’
কামরুল হুদা কিছু বললেন না। চুপ করে রিফাতের নতুন উপলব্ধির কথা শুনতে থাকলেন।
রিফাত জানালার বাইরে তাকাল। পৃথিবী তখন তার চোখের সামনে অন্য এক অর্থে উন্মোচিত হয়েছে।
সে বুঝেছে, মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় বিস্ময় সবসময় দূরে থাকে না। কখনো কখনো সবচেয়ে বড় বিস্ময়টি থাকে হাতের মুঠোয়, অথচ আমরা দূরের নক্ষত্রের আলো খুঁজতে গিয়ে তাকে দেখতে ভুলে যাই।
সেদিন রিফাত মনোচিকিৎসক কামরুল হুদার কাছে কোনো সমস্যা নিয়ে যায়নি। গিয়েছিল ধন্যবাদ জানাতে।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সে বলল, ‘স্যার, আপনি আমাকে মঙ্গলগ্রহে পাঠাননি। তার চেয়েও বড় একটা কাজ করেছেন, আমাকে আমার নিজের গ্রহটাকে চিনতে শিখিয়েছেন। আর শিখিয়েছেন নিজেকে চিনতে।’
কামরুল হুদা মৃদু হাসলেন।
বাইরে তখন বিকেলের আলো। রাস্তার পাশে একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ ফুলে ফুলে লাল হয়ে আছে। দূরে কোনো এক বাড়ির ছাদে শিশুরা খেলছে। আকাশে কয়েকটি পাখি উড়ে যাচ্ছে।
রিফাত থেমে দাঁড়াল।
তার মনে হলো, জীবন হয়তো খুবই ছোট। কিন্তু এই ছোট জীবনের ভেতরেই একটি অসীম মহাবিশ্ব লুকিয়ে আছে। মঙ্গলগ্রহে যাওয়ার স্বপ্ন সে ভুলে যায়নি। তবে এখন তার কাছে পৃথিবীই সবচেয়ে বড় অভিযান।
কারণ এই গ্রহে তার জন্য এখনো কত নদী দেখা বাকি, কত বই পড়া বাকি, কত মানুষকে ভালোবাসা বাকি, কত ভোরের সূর্যোদয় দেখা বাকি, কত বৃষ্টিতে ভেজা বাকি, কত অচেনা রহস্যের দরজা খোলা বাকি।
আর সে জানে, পৃথিবীতে আসার জন্য কোনো টাকা লাগেনি। কিন্তু পৃথিবীকে সত্যিকার অর্থে অনুভব করতে হলে একটি জীবনও হয়তো যথেষ্ট নয়।
The post অন্য পৃথিবী appeared first on সুপ্রভাত বাংলাদেশ.
