ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপ নির্বাচন ঘিরে উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে জেলার রাজনৈতিক অঙ্গন। প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামের চায়ের দোকানগুলোতে চলছে নানা সমীকরণ। স্থানীয়দের মতে, এই উপ নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের মূল চাবিকাঠি বা 'ট্রাম্পকার্ড' লুকিয়ে আছে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার হিন্দু ভোটারের হাতে।
ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগের 'ভোটব্যাংক' হিসেবে পরিচিত এই বিশাল ভোটার গোষ্ঠীকে নিজেদের ঝুলিতে টানতে এখন কৌশলগত প্রচার-প্রচারণা ও গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর প্রার্থীরা। বিগত জাতীয় নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মূলত এই বিশাল হিন্দু ভোটব্যাংকের ওপর ভর করেই বিশাল ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করেছিলেন। সেসময় হিন্দুদের প্রায় শতভাগ ভোট ধানের শীষে পড়েছিল। এবারও সেই ঐতিহ্য ধরে রাখতে এবং ১ লাখ ৪০ হাজার ভোটব্যাংক নিজেদের ঝুলিতে ফেরাতে মাঠে নেমেছে বিএনপি, অন্যদিকে কড়া নজর রেখে কৌশলগত প্রচার চালাচ্ছে ১১ দলীয় জোটের মনোনীত জামায়াতে ইসলামী।
ভোটের সমীকরণে কেন 'কিংমেকার' হিন্দু ভোটাররা?
ঠাকুরগাঁও-১ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ১৬ হাজার ১৩৮ জন। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজারই হিন্দু ধর্মাবলম্বী ভোটার, যা মোট ভোটের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি।
অতীতের নির্বাচনি হিসাব বলছে, এই এলাকার হিন্দুরা একক কোনো দল বা প্রার্থীর পক্ষে শতভাগ জোটবদ্ধ হয়ে ভোট দেন। এই আসনে যিনিই জয়ী হন না কেন, হিন্দু ভোটারদের সমর্থন ছাড়া বিজয়ের মুখ দেখা অসম্ভব। সাবেক সংসদ সদস্য ও বর্তমার রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রতি স্থানীয় হিন্দুদের আস্থা ও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছিল, যা গত নির্বাচনে প্রায় শতভাগ ভোটে রূপ নিয়েছিল। এবার মির্জা ফখরুলের ছোট ভাই ও বিএনপি প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীনের জন্য সেই রাজনৈতিক উত্তরাধিকার রক্ষা করাই প্রধান চ্যালেঞ্জ।
অতীত ঐতিহ্য ফেরাতে বিএনপির সম্প্রীতি বার্তা
বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীনের পক্ষে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা হিন্দু অধ্যুষিত গ্রাম ও পাড়া-মহল্লায় দিনরাত গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন। বিএনপি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, ঠাকুরগাঁওয়ে সব সময়ই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় তারা হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশে থেকেছে।
হিন্দু ভোটব্যাংক নিয়ে আত্মবিশ্বাসী বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ফয়সল আমিন বলেন, হিন্দু ভোটাররা এখন আর আ.লীগের ভোট ব্যাংকে নেই। ঠাকুরগাঁওয়ের হিন্দু সম্প্রদায় ইতিমধ্যে বিএনপির উপর আস্থা রেখে তার ভালো প্রতিফলন পেয়েছে। যে কোনো পরিস্থিতিতে তারা বিএনপির পাশেই থাকবে।
পথসভা ও মতবিনিময় সভাগুলোতে বিএনপির নেতারা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, এলাকার প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে তাদের মূল অগ্রাধিকার। গত জাতীয় নির্বাচনের মতো এবারো হিন্দু ভোটাররা ধানের শীষেই আস্থা রাখবেন এমনটাই প্রত্যাশা বিএনপির।
হিন্দু ভোটব্যাংক নিয়ে আত্মবিশ্বাসী বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ফয়সল আমিন বলেন, হিন্দু ভোটাররা এখন আর আ.লীগের ভোট ব্যাংকে নেই। ঠাকুরগাঁওয়ের হিন্দু সম্প্রদায় ইতিমধ্যে বিএনপির উপর আস্থা রেখে তার ভালো প্রতিফলন পেয়েছে। যে কোনো পরিস্থিতিতে তারা বিএনপির পাশেই থাকবে।
জামায়াতের নিবিড় নজর ও কৌশলগত বার্তা
অন্যদিকে, উপ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. দেলাওয়ার হোসেনও প্রচার-প্রচারণায় পিছিয়ে নেই। অতীত সমীকরণ বদলে দিয়ে হিন্দু ভোটারদের নিজেদের দিকে টানতে তারা নিয়েছেন ভিন্ন কৌশল।
জামায়াতের পক্ষ থেকে হিন্দুদের ঘরে ঘরে গিয়ে সরাসরি বলা হচ্ছে বিজয়ী হলে এলাকায় কোনো ধরনের চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব বা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হতে দেওয়া হবে না। সব সম্প্রদায়ের জানমালের শতভাগ নিরাপত্তার বার্তা নিয়ে তারাও হিন্দু ভোটব্যাংকে ফাটল ধরানোর জোর চেষ্টা চালাচ্ছে।
১১ দলের মনোনীত জামায়াত প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন মনে করেন, এবার হিন্দু ভোটাররা তাকেই পছন্দের তালিকায় রাখছে। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় আমি হিন্দু সমাজের সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করেছি। তাদের বোঝার চেষ্টা করেছি। তাদের জীবনমান উন্নয়নে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। তারা আমাকেই ভোট দেবেন এমনটি বিশ্বাস করি।
কী ভাবছেন সাধারণ হিন্দু ভোটাররা?
ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক তাপস দেবনাথ জানান, বিগত নির্বাচনে ঠাকুরগাঁওয়ের হিন্দুরা একতাবদ্ধ হয়ে একজন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছে। তবে এবারও সেই ধারা অব্যাহত রেখে নির্দিষ্ট দলের দিকেই ঝুঁকবে এমনটা ভাবা ভুল হবে। হিন্দু সমাজ এখন অনেক বেশি সচেতন। নির্দিষ্ট দলের দিকে না গিয়ে এখন তারা প্রার্থীর যোগ্যতা বিবেচনায় নিচ্ছেন।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আকচা এলাকার বাসিন্দা বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী বলেন, আমরা অবশ্যই ভেবেচিন্তে একটি নির্দিষ্ট দিকে এগবো। আগে যেমন আমাদের কিছু চাওয়া ছিলো, এবারো আছে। আমাদের মূল চাওয়া শান্তিতে বসবাস, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং জানমালের নিরাপত্তা। যে দল ও প্রার্থী আমাদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের আস্থা দিতে পারবে, আমরা তাকেই বেছে নেব।
ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক তাপস দেবনাথ জানান, বিগত নির্বাচনে ঠাকুরগাঁওয়ের হিন্দুরা একতাবদ্ধ হয়ে একজন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছে। তবে এবারও সেই ধারা অব্যাহত রেখে নির্দিষ্ট দলের দিকেই ঝুঁকবে এমনটা ভাবা ভুল হবে। হিন্দু সমাজ এখন অনেক বেশি সচেতন। নির্দিষ্ট দলের দিকে না গিয়ে এখন তারা প্রার্থীর যোগ্যতা বিবেচনায় নিচ্ছেন।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, সদর, রুহিয়া ও ভূল্লী এলাকা নিয়ে গঠিত ঠাকুরগাঁও-১ আসন। এই সংসদীয় আসনটিতে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ১৬ হাজার ১৩৮ জন। মোট ১৮৫টি ভোটকেন্দ্রের ৯৮৯টি বুথে ইভিএম অথবা ব্যালটের মাধ্যমে এ ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা চলবে আগামী ২৭ অক্টোবর সকাল ৮টা পর্যন্ত।
এই উপ নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মাঠে রয়েছেন ৫ জন প্রার্থী। ধানের শীষ প্রতীক পেয়েছেন বিএনপির মির্জা ফয়সল আমিন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী মো. দেলাওয়ার হোসেন পেয়েছেন দাঁড়িপাল্লা প্রতীক, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাফেজ ডা. মো. খাদেমুল ইসলাম পেয়েছেন হাতপাখা প্রতীক, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মো. আবদুল আলীম নিজামী পেয়েছেন বটগাছ এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক পেয়েছেন ডাব প্রতীক।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপ নির্বাচনে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে ভাটারদের আহ্বান জানিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও নির্বাচন অফিসার মো. কামরুল ইসলাম বলেন, আমরা উৎসব মুখর পরিবেশে নির্বাচন আয়োজন কারার ব্যাপারী আশাবাদী। প্রার্থীরা প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছেন। কারো পক্ষ থেকে বড় কোনো অভিযোগ পাইনি। উপনির্বাচনে এবার সেনাবাহিনী, পুলিশ ও আনসার সদস্যদের সাথে ১২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগামী ২৯ অক্টোবর এই আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
