কক্সবাজারের উখিয়ার পাটুয়ারটেক সৈকতে আগুনে পুড়ে ১০ পর্যটক নিহতের ঘটনায় আলোচনায় এসেছে টুপটুপ রেস্টুরেন্ট ও রিসোর্টের অনুমোদনহীন কার্যক্রম। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই রিসোর্টটি পরিচালনা করা হচ্ছিল। কার্যক্রম বন্ধের নোটিশ অমান্য করায় গত মে মাসে প্রতিষ্ঠানটিকে এক লাখ টাকা জরিমানাও করা হয়েছিল।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে কাঠের অবকাঠামোয় তৈরি রিসোর্টটিতে ভয়াবহ আগুন লাগে। এতে ১০ পর্যটক নিহত হয়। আগুনে রিসোর্টটির বড় অংশ পুড়ে যায়।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানান, মেরিন ড্রাইভ-সংলগ্ন এলাকায় ছাড়পত্র ছাড়া রিসোর্ট ও রেস্টুরেন্ট পরিচালনার অভিযোগে চলতি বছরের এপ্রিল থেকে বিভিন্ন সময়ে আরও ২৬টি রিসোর্ট ও ১০টি রেস্টুরেন্টকে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে নির্দেশনা অমান্য করায় ১৪টি রিসোর্টকে জরিমানা করা হয় এবং দুটি রিসোর্টের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। বাকি ১০টি প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দেওয়া হলেও তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
কর্মকর্তারা জানান, ১৯৯৯ সালে মেরিন ড্রাইভ-সংলগ্ন সৈকত এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে সরকার। ওই এলাকায় টুপটুপসহ একাধিক রিসোর্ট নির্মাণ করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধের উদ্যোগ নিতে গিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হয় বলেও তাঁদের দাবি।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার অঞ্চলের পরিচালক জমির উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ছাড়পত্র ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনা করায় গত এপ্রিলে টুপটুপ রেস্টুরেন্টকে বন্ধের নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। নির্দেশনা না মানায় পরের মাসের ১৩ তারিখ প্রতিষ্ঠানটিকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
তিনি জানান, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট ও হোটেল-মোটেলের পরিবেশগত ছাড়পত্র পেতে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত ভবন নকশা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট থাকা প্রয়োজন। টুপটুপ রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের এসবের কোনোটিই ছিল না।
মেরিন ড্রাইভে ১৫০ অবৈধ হোটেল-রিসোর্ট
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, কলাতলী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত প্রায় ৮০ কিলোমিটার মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে বিপুলসংখ্যক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. জসিম উদ্দিন জানান, তাঁদের তালিকায় দোকানপাটসহ প্রায় ১৫০টি অবৈধ হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে।
তিনি বলেন, টুপটুপ রেস্টুরেন্টকে এর আগে দুই দফায় স্থাপনা ভেঙে ফেলার নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির কোনো অনুমোদন ছিল না। আগামী সপ্তাহ থেকে অবৈধ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
জরিমানা দিয়েও বন্ধ হয়নি কার্যক্রম
পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, মেরিন ড্রাইভ-সংলগ্ন প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা বিভিন্ন রিসোর্ট ও রেস্টুরেন্টকে নোটিশ দেওয়া এবং জরিমানা করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। তাঁদের ভাষ্য, পরিবেশ আইনে জরিমানা ও নোটিশ দেওয়ার সুযোগ থাকলেও এসব প্রতিষ্ঠান উচ্ছেদ বা বন্ধ করার এখতিয়ার পরিবেশ অধিদপ্তরের নেই। এ ক্ষেত্রে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আইনি ক্ষমতা রয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের জরিমানার তালিকায় রয়েছে রামুর সাম্পান বিচ রিসোর্ট, নিসর্গ হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, উখিয়ার সি পার্লস বীচ রিসোর্ট, সি পার্ল বীচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা এবং টেকনাফের জাহাজপুরা ক্যাসলসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান।
এ ছাড়া কলাতলীর জিডি সমুদ্র বিলাস, মায়াবী বীচ রিসোর্ট, টাইটান হোটেল, হোটেল জানা ডাডা ও হোটেল স্যুট সাদাফকেও বিভিন্ন অঙ্কের জরিমানা করা হয়েছে। অন্যদিকে হিমছড়ি ও ইনানী এলাকার কয়েকটি রিসোর্ট এবং নির্মাণাধীন হোটেলকেও নোটিশ দেওয়া হয়েছিল।
টুপটুপ রিসোর্টে প্রাণঘাতী অগ্নিকাণ্ডের পর মেরিন ড্রাইভ এলাকায় অনুমোদনহীন স্থাপনা, পরিবেশগত ছাড়পত্রের প্রয়োগ এবং অবৈধ প্রতিষ্ঠান বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
এমএ
