এবার মণ্ডপ ফাঁকা হয়ে যাওয়ার পালা। বিজয়া দশমীর বিষাদ আস্তে আস্তে বাতাসে ঘন হয়ে লেপটে যাওয়ার পালা। কাতর প্রার্থনায় আরও একটি বছর অপেক্ষার পালা। ফের আসবেন উমা, ধরিত্রীতে, সেই স্বপ্নে দিন কাটানোর পালা। ভিড় এবার থিতু হবে, যেমন করে ঘোলা জলের পলি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে থিতিয়ে পড়তে থাকে তলদেশে। ভিড়ের মুখরা আস্তে আস্তে ফিরে যাবে প্রাত্যহিকের ব্যস্ততায়। অফিসে, কাছারিতে, ছুটোছুটিতে। প্যান্ডেলের বাঁশ খুলে নেওয়া হবে। ডেকরেটর গুণে-গেঁথে গুছিয়ে নেবে অন্যান্য সরঞ্জাম। শূন্য মণ্ডপে পড়ে থাকবে হাহাকার। প্রতিমা বিসর্জনের পরের দলা-দলা মনখারাপ। কয়েক দিনের মধ্যে প্যান্ডেলের আর কোনও অস্তিত্বই থাকবে না। প্রশাসনের তরফে রাস্তাঘাট বুজিয়ে দিয়ে স্বাভাবিকের ছন্দকে প্রতিষ্ঠা করে দেওয়া হবে।
স্মৃতির মৌচাক ঢুকে যাবে এ বছরের দুর্গাপুজো। অন্যবারের মতো। ঠাকুর দেখা, আনন্দ করা, চোরবাগানের অভিশপ্ত রাত; পুজোর প্রেম, পুজোর খাওয়া; পূজাবার্ষিকীর রংটান- সবই স্মৃতি হয়ে কম্পাঙ্ক তুলতে থাকবে আগামীতে। এমনকী, এই শূন্য মণ্ডপও। উপস্থিতির চারপাশে অনুপস্থিতি সবসময় ছায়ার মতো জুড়ে থাকে। ‘শূন্য’ মণ্ডপের পাশেও থাকবে ভিড়জর্জর মণ্ডপের উন্মাদনার কথা। লোকসমাগমের কথা। অপ্রাপ্তিকে থোড়াই কেয়ার করে অপ্রাপণীয়র দিকে ধেয়ে যাওয়ার কথা। অপার আনন্দময় অনুভূতির কথা।
প্রতিমাহীন ‘শূন্য’ মণ্ডপ কিন্তু একটি বিষয়ে আমাদের প্রতি মুহূর্তে ওয়াকিবহাল করতে থাকে। উৎসব মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ ঘটায়।
বৌদ্ধ থেরবাদী দর্শনে ‘শূন্যতা’-র ধারণা আবার ‘অনাত্তা’-র সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ‘অনাত্তা’ অর্থে আত্মাহীনতা। কিন্তু ‘শূন্যতা’-র প্রতিশব্দ রূপে আমরা যখন ‘ফাঁপা’ বা ‘অসারতা’ বর্ণনা করি, তখন তার প্রয়োগ অন্যভাবে প্রতিপন্ন হয়। মণ্ডপের শূন্যতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কোলাহলহীন শ্রান্তি, উৎসব-উত্তীর্ণ নিস্তেজ মুহূর্ত, আর আনন্দের ফেনা কাটিয়ে ওঠা বিষণ্ণ ভিড়। বা, এসবের মিলিত নির্যাস। ‘ফাঁপা’ বললে কিন্তু অন্তঃসারহীনতা বেশি করে ফুটে ওঠে। ‘হলো মেন’। টি. এস. এলিয়ট লিখেছিলেন শহুরে নাগরিক মনের মানচিত্র আঁকতে গিয়ে। দেখনদারি অনেক। চিত্তের প্রদর্শনীও অনেক। বড় বুলি ও হাতে মাথা কাটার যথেচ্ছাচারও কম নয়। অথচ, মানুষগুলির চেতনাপ্রদেশ ফাঁপা। জ্ঞানহীন, আলোহীন, বেকার। অনুভূতিলোকে কোনও বুড়বুড়ি ওঠে না। ‘অসার’ বলতেও এহেন অন্তঃসারহীনতা বোঝায়।
প্রতিমাহীন ‘শূন্য’ মণ্ডপ কিন্তু একটি বিষয়ে আমাদের প্রতি মুহূর্তে ওয়াকিবহাল করতে থাকে। উৎসব মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ ঘটায়। ভাবনার মিলন, চিন্তার মিলন, আবেগের মিলনের কথা বলতে চায় উৎসব। দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য, দুর্গাপুজোর পৌরাণিক মহিমা, দুর্গাপুজোর আর্থনীতিক শ্রীবৃদ্ধি যেমন জরুরি অলোচনার বিষয়; তেমনই জরুরি হল- উৎসবকে ঘিরে সমাজের নানা শ্রেণির একপঙ্ক্তিতে জড়ো হওয়ার আকাঙ্ক্ষার। ‘শূন্য’ মণ্ডপের দিকে তাকিয়ে আমরা যেন সংবৎসর উৎসবের এই প্রধান থিমটিকে জিইয়ে রাখতে পারি।
