অবশেষে অফসোর ডাটার (তথ্য) দাম অনেকটা কমিয়ে এনেছে পেট্রোবাংলা। চারটি প্যাকেজ পুরোপুরি ফ্রি করা হয়েছে, আর ৬টি প্যাকেজের দামে বিশাল ছাড় দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
পেট্রোবাংলার ওই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করছেন এতে করে আগ্রহী দরদাতার সংখ্যা কিছুটা হলেও বাড়বে।
অফসোর বিডিং রাউন্ড-২০২৬ এ পেট্রোবাংলা ১০টি ডাটা সেলস প্যাকেজ (ডিএসটি) রয়েছে। সর্বোচ্চ দাম ছিল এসএস-৪ এবং এসএস-৯ এর ২ডি সার্ভের তথ্য ৫ লাখ ৮ হাজার ডলার। সর্বোচ্চ মূল্যের ওই প্যাকেজের দাম এখন ৫ হাজার ডলারের নামিয়ে আনা হয়েছে।
আর সর্বনিম্ন দর ছিল ১৯৭৪ সালের সিসমিক সার্ভের তথ্যে। প্রতি লাইন কিলোমিটারের দাম ছিল ১০ ইউএস ডলার। যা এখন পুরোপুরি ফ্রি করে দেওয়া হয়েছে। ডিএসপি-২ এর আওতায় ১৯৬৯ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত খনন করা ১১টি অনুসন্ধান কূপের তথ্য এবং ওয়েলড্রিল (ইউকে) লিমিটেড হাইড্রোকার্বন হেবিটেড স্ট্যাডি তথ্যের প্যাকেজ দুটির দাম ছিল ৫ হাজার ডলার করে। সংশোধনীতে পুরোপুরি ফ্রি করে দেওয়া হয়েছে এসব ডাটা।
ডিএসপি-৪ এর দাম ৩ লাখ ১৪ হাজার ৬০০ ডলার থেকে কমিয়ে ৫ হাজার ডলার করা হয়েছে। এই প্যাকেজে রয়েছে এসএস-১১ ব্লকের ৩১৫০ লাইন কিলোমিটার (২০১৬-১৭) ২ডি সিসমিক সার্ভের তথ্য। একই ব্লকের ৩০৫ বর্গকিলোমিটার ৩ডি সিসমিক সার্ভের (২০১৮) তথ্য ১ লাখ ৫২ হাজার ৫০০ ডলার থেকে কমিয়ে ৫ হাজার ডলার করা হয়েছে।
ব্লক ডিএস-১০ এবং ডিএস-১১ এর ২০১১-১২ সালে ২ডি সিসমিক সার্ভের ডাটার দাম ২ লাখ ৬৮ হাজার ডলার থেকে কমিয়ে ৫ হাজার ডলার করা হয়েছে।
ডিএস-১১ এবং এসএস-৭ এর ৩০৭৭ লাইন কিলোমিটার ২ডি তথ্য ৩ লাখ ৭ হাজার ৭০০ ডলার থেকে কমিয়ে ৫ হাজার ডলার। ডিএস-১২ ব্লকের ৩৫৮০ লাইন কিলোমিটার ২ডি ডাটা ৩ লাখ ৫৮ হাজার ডলার। এসএস-৪ এবং এসএস-৯ এর ৫০৭৯ (২০১৫-১৭) তথ্যের দাম ৫ লাখ ৮ হাজার ডলার এবং কাঞ্চন-১এক্স কূপের তথ্য ৫ হাজার ডলার। ডাটা প্যাকেজ-৮ ব্লক-১২ এর ২ডি ডাটার দাম ৩ লাখ ৫৮ হাজার ডলার থেকে কমিয়ে ৫ হাজার করা হয়েছে। এ ছাড়া প্যাকেজ ১০ এর অধীনে থাকা কাঞ্চন ১এক্স কূপের ডাটা পুরোপুরি ফ্রি করা হয়েছে।
বাপেক্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমজাদ হোসেন বার্তা২৪.কমকে বলেছেন, আমরা আসলে ডাটার ব্যবসা করবো, নাকি গ্যাস দরকার। সেটা আগে চিহ্নিত করা দরকার ছিল, এতোদিন সেই কাজটি না করার সেভাবে কোম্পানিগুলো আগ্রহ দেখায়নি। ডাটার দাম কমিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এতে করে অফসোরে প্রতিযোগীর সংখ্যা বাড়বে। দীর্ঘদিন ধরে একটি সিন্ডিকেটের কারণে প্যাকেজের মূল্য আকাশচুম্বি করে রাখা হয়। জনশ্রুতি রয়েছে সংশ্লিষ্ট বিভাগের জিএম এর পেছনে কলকাঠি নাড়তেন। দাম বেশি থাকলে অনেকেই গোপন লেনদেনের মাধ্যমে পেয়ে যেতেন। এতে রাষ্ট্রের উপকার না হলেও সংশ্লিষ্ট ওই কর্মকর্তার পকেট ভারি হতো। আওয়ামী লীগ নেতার কন্যা হওয়ায় এতোদিন তাকে কেউ ঘাটাতে সাহস দেখায়নি। যে কারণে বছরের পর বছর ধরে তিনি ডাটা প্যাকেজের কলকাঠি নেড়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান।
দীর্ঘদিন পর বদলী হলেও মাত্র ৩ মাসের মধ্যে স্বপদে ফিরে আসা নিয়ে নানা গুঞ্জন চলছে। এতে করে ডাটা প্যাকেজের কলকাঠির নাড়ার সন্দেহ জোরালো করছে। প্রশ্ন উঠেছে যদি কারণ নাই থাকে তাহলে তদ্বীর করে পূর্বের পদে ফিরলেন কেনো!
২০২৬ সালে গভীর সমুদ্রে ১৫টি এবং অগভীর সমুদ্রে ১১টি ব্লকের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। নভেম্বর পর্যন্ত দরপত্র জমা দেওয়ার সময় ছিল। ইতোমধ্যেই ৪ মাস সময় বাড়িয়ে ২০২৭ সালের ৩১ মার্চ করা হয়েছে। এর আগে ২০২৪ এর মার্চে দরপত্র আহ্বান করা হলে ৭টি বহুজাতিক কোম্পানি দরপত্র কিনলেও জমাদান থেকে বিরত থাকে। যে কারণে পরিত্যাক্ত ঘোষণা করা হয় বিডিং রাউন্ড-২০২৪। গ্যাসের দাম বৃদ্ধিসহ অনেক ছাড় দিয়ে মডেল পিএসসি ২০২৬ চূড়ান্ত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে টার্কিশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (টিপিএও), চায়না ন্যাশনাল অফশোর অয়েল করপোরেশনসহ (সিএনওওসি) ৩টি কোম্পানি দরপত্র কিনেছে বলে পেট্রোবাংলা জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক আদালতে ২০১২ সালে মিয়ানমার ও ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সাগর সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তির পর সর্বমোট ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গ কিলোমিটারের বেশি সমুদ্র অঞ্চলের ওপর মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশের। সেই সম্ভাবনাময় সাগরাঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয় বিগত সরকার। একই পথে হেটেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও। যে কারণে অধরাই থেকে গেছে সম্ভাবনাময় জলরাশি। বাংলাদেশের পাশের অংশ থেকে মিয়ানমার দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাস উত্তোলন করছে। যে কারণে বাংলাদেশে গ্যাস প্রাপ্তির সম্ভাবনা খুবই উজ্জ্বল বিবেচনা করা হয়।
বাংলাদেশে ভয়াবহ গ্যাস সংকট চলছে, সহসা এই সংকট দূর হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং দিনদিন বেড়েই চলছে সংকট। বলা যায় সব ধরণের গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এতে করে স্থবিরতা নেমে এসেছে শিল্পায়নে। একদিকে যখন দেশীয় গ্যাস ফিল্ডের উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে গ্যাসের চাহিদা। এক সময় ২৮০০ মিলিয়ন উৎপাদন হলেও এখন ১৬২০ মিলিয়নে নেমে এসেছে। এর অন্যতম কারণ বিবেচনা করা হয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে স্থবিরতাকে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বার্তা২৪.কমকে বলেছেন, আমরা মনে করছি ডাটা প্যাকেজের দাম কামিয়ে দিলে প্রতিযোগিতা বাড়বে। এতে লাভবান হবে বাংলাদেশ। যে কারণে দাম কমিয়ে আনা হয়েছে। কয়েকটি প্যাকেজ পুরোপুরি ফ্রি করে উন্মুক্ত করা হয়েছে।
মডেল পিএসসি ২০০৮ প্রণয়ন কমিটির প্রধান মকবুল ই-এলাহী চৌধুরী বার্তা২৪.কমকে বলেন, কোন কোন প্যাকেজের দাম মিলিয়ন ডলারের মতো ছিল। অন্য দেশে এসব ডাটা ফ্রি দেয়। ১৯৭৪ সালে আমাদের দেশে এসব ডাটা উন্মুক্ত ছিলো, তখন অনেক বেশি কোম্পানি অংশ নিয়েছিলো। কেনো এতো বেশি দাম রাখা হয়েছিল সেটা খুবই আশ্চর্যের।
