গৌতম রায়
শরৎকাল এলেই প্রকৃতির মধ্যে যেমন এক আশ্চর্য পরিবর্তন দেখা যায়, তেমনই বদলে যায় মানুষের খাওয়াদাওয়ার অভ্যাসেও। বর্ষার ভেজা দিন পেরিয়ে আকাশে যখন সাদা মেঘের ভেলা ভেসে বেড়ায়, কাশফুলে ভরে ওঠে নদীর পাড়, শিউলির গন্ধে ভোরের বাতাস মেতে ওঠে, তখন বাঙালির রান্নাঘরেও শুরু হয় অন্যরকম ব্যস্ততা। শরতের খাওয়াদাওয়া তাই শুধু ক্ষুধা মেটানোর বিষয় নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ঋতুর স্বাদ, পারিবারিক স্মৃতি, উৎসবের আনন্দ আর বাঙালির দীর্ঘদিনের খাদ্যসংস্কৃতি।
শরতের নিজস্ব খাওয়াদাওয়ার কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসে ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রসঙ্গ। বর্ষার আর্দ্রতা কমতে শুরু করলেও বাতাসে তখনও কিছুটা ভ্যাপসা ভাব থাকে। তাই এই সময়ে সহজপাচ্য, টাটকা ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়া ভাল। ভাত, ডাল, শাকসবজি, মাছের ঝোল, পাতলা তরকারি এবং টকদই অনেকের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় স্বাভাবিকভাবেই জায়গা করে নেয়। কুমড়ো, পটল, ঝিঙে, লাউ, ঢেঁড়স কিংবা নানা ধরনের শাক দিয়ে তৈরি পদ শরতের দুপুরের খাবারকে করে তোলে সহজ অথচ তৃপ্তিদায়ক। নদী ও পুকুরের মাছ বাঙালির পাতে বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ, আর হালকা ঝোলের সঙ্গে গরম ভাতের জুড়ি শরতের দিনেও অতুলনীয়। তবে শরৎ মানেই যে নির্দিষ্ট কয়েকটি খাবার খেতেই হবে, তা নয়। ব্যক্তির বয়স, শারীরিক অবস্থা, পরিশ্রম এবং রুচি অনুযায়ী খাবারের ধরন বদলাতে পারে।
শরতের ঘুমটির খাওয়াদাওয়া বলতে যদি দুপুরের খাবারের পর কিংবা বিকেলের দিকে একটু বিশ্রাম নেওয়ার আগে-পরে হালকা কিছু খাওয়ার কথা বোঝানো হয়, তবে তার মধ্যেও রয়েছে বাঙালির নিজস্বতা। দুপুরে ভাত, ডাল, মাছ কিংবা সবজি দিয়ে পেট ভরে খাওয়ার পর অনেকেই একটু বিশ্রাম নিতে ভালবাসেন। ঘুম থেকে উঠে এক কাপ চা, সঙ্গে মুড়ি, চিঁড়ে, মুড়কি কিংবা বাড়িতে তৈরি হালকা নোনতা খাবার শরতের বিকেলকে অন্য রকম করে তোলে। কোথাও থাকে নারকেল দিয়ে মুড়ি মাখা, কোথাও ভাজা বাদাম, আবার কোথাও গরম গরম পেঁয়াজি কিংবা বেগুনি। উৎসবের মরশুমে এই বিকেলের খাবারে যুক্ত হয় নানা ধরনের মিষ্টি। তবে বিশ্রামের আগে অতিরিক্ত তেলমশলাযুক্ত খাবার খেলে অস্বস্তি হতে পারে। আবার দুপুরের খাবারের পরপরই দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে পড়লে কারও কারও হজমে সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই পরিমিত খাওয়া, কিছুক্ষণ স্বাভাবিকভাবে বসে থাকা এবং শরীরের প্রয়োজন বুঝে বিশ্রাম নেওয়াই ভাল।
আর বাঙালির শরৎকালীন খাওয়াদাওয়ার কথা উঠলে দুর্গাপুজোর প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। পুজোর আনন্দ বাঙালির কাছে যেমন নতুন পোশাক, মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানো, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা আর পরিবারের মিলন, তেমনই তার একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে খাবার। ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত বাড়িতে বাড়িতে রান্নার আয়োজন বদলে যায়। কোথাও লুচি আর আলুর তরকারি, কোথাও খিচুড়ি ও লাবড়া, কোথাও আবার পোলাও, ছোলার ডাল, ফুলকপির তরকারি কিংবা মাছের নানা পদ। অষ্টমীর অঞ্জলির পরে খিচুড়ি, লাবড়া, বেগুনি, চাটনি আর পায়েসের পাত বাঙালির উৎসবস্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। পুজোর মণ্ডপের সামনে ফুচকা, ঝালমুড়ি, ঘুগনি, চপ, কাটলেট কিংবা রোল খাওয়ার আনন্দও কম নয়। বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে খাওয়া একটি সাধারণ খাবারও তখন উৎসবের স্মৃতি হয়ে ওঠে।
শরতের বাঙালি রান্নাঘরে মিষ্টিরও বিশেষ স্থান রয়েছে। নারকেলের নাড়ু, মোয়া, পায়েস, সন্দেশ, রসগোল্লা কিংবা বাড়িতে তৈরি ক্ষীরের মিষ্টি উৎসবের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দেয়। অনেক পরিবারে লক্ষ্মীপুজোর সময় নাড়ু, মুড়কি, খই ও নানা ধরনের মিষ্টি নিবেদনের রীতি রয়েছে। গ্রামবাংলায় নতুন ধানের গন্ধ, পুকুরপাড়ের বাতাস এবং উঠোনে বসে পরিবারের সকলের একসঙ্গে খাওয়ার স্মৃতি শরতের খাবারকে আরও আপন করে তোলে। শহরেও সেই আবেগ অন্য রূপে বেঁচে থাকে—বন্ধুদের সঙ্গে রেস্তোরাঁয় খাওয়া, পাড়ার পুজোর ভোগ খাওয়া কিংবা বহুদিন পরে আত্মীয়দের সঙ্গে এক টেবিলে বসা।
আসলে শরতের খাওয়াদাওয়া তিনটি আলাদা অনুভূতির সমাহার—ঋতুর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া প্রতিদিনের আহার, বিশ্রামের ফাঁকে হালকা খাবারের আনন্দ এবং উৎসবমুখর বাঙালির মিলেমিশে খাওয়ার ঐতিহ্য। এখানে যেমন আছে শরীরের প্রয়োজন, তেমনই আছে রুচি ও আবেগ। শরৎ তাই কেবল কাশফুল, নীল আকাশ আর শিউলির ঋতু নয়; শরৎ হল ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ির গন্ধ, গরম লুচির পাশে আলুর তরকারি, বিকেলের মুড়িমাখা আর আপনজনের সঙ্গে ভাগ করে খাওয়া মিষ্টির ঋতু। বাঙালির কাছে এই স্বাদগুলোই শরৎকে বারবার নতুন করে আপন করে তোলে।
শরতের খাওয়াদাওয়ার সঙ্গে বাংলার গ্রামাঞ্চলের প্রকৃতি, হাটবাজার এবং ঋতুভিত্তিক খাদ্যসংগ্রহেরও একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। বর্ষার জল নামতে শুরু করলে অনেক অঞ্চলে পুকুর, খালবিল ও জলাভূমিতে ছোট মাছ ধরার চল দেখা যায়। মৌরলা, পুঁটি, কাচকি কিংবা ট্যাংরা দিয়ে তৈরি সর্ষে-ঝাল, পাতলা ঝোল অথবা শাকের সঙ্গে মাছের মিশ্র রান্না গ্রামীণ খাদ্যসংস্কৃতির পরিচিত অংশ। কোথাও আবার কচুশাক, কলমিশাক কিংবা পুঁইশাকের সঙ্গে মাছের মাথা দিয়ে রান্না হয় বিশেষ পদ। এই রান্নাগুলির স্বাদ কেবল উপকরণের গুণে তৈরি হয় না, তার সঙ্গে মিশে থাকে স্থানীয় অভিজ্ঞতা, পারিবারিক রন্ধনপদ্ধতি এবং বহু প্রজন্ম ধরে চলে আসা অভ্যাস।
শরতের বাজারেও ধীরে ধীরে বদল আসে। নতুন সবজির সমারোহ, তাজা ফলের উপস্থিতি এবং উৎসব উপলক্ষে কেনাকাটার ব্যস্ততা বাজারকে প্রাণবন্ত করে তোলে। পেয়ারা, কলা, ডালিম কিংবা মৌসুমি ফল অনেক বাড়িতেই জলখাবারের অংশ হয়। শিশুদের জন্য বাড়িতে তৈরি সুজি, চিঁড়ের পোলাও কিংবা দুধ দিয়ে রান্না করা খাবারও রাখা হয়। আবার কর্মব্যস্ত মানুষের কাছে আগের দিনের রান্না সঠিকভাবে সংরক্ষণ করে পরদিন ব্যবহার করা সময় বাঁচানোর একটি উপায়। তবে খাবার দীর্ঘক্ষণ গরমে ফেলে রাখা উচিত নয়; বিশেষত রান্না করা মাছ, মাংস ও দুধজাত খাবার নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করা জরুরি।
শরতের খাদ্যসংস্কৃতির আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ভাগ করে খাওয়ার সামাজিক আনন্দ। পাড়ার অনুষ্ঠান, পারিবারিক নিমন্ত্রণ কিংবা বাড়ির উঠোনে আত্মীয়স্বজনের সমাগমে রান্নার দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া হয়। কেউ মশলা বাটেন, কেউ সবজি কাটেন, কেউ আবার পরিবেশনের ব্যবস্থা করেন। রান্নাঘর তখন শুধু খাবার তৈরির জায়গা থাকে না, হয়ে ওঠে সম্পর্কের বন্ধন দৃঢ় করার ক্ষেত্র। এই সম্মিলিত শ্রম ও আনন্দের মধ্যেই শরতের খাওয়াদাওয়া ব্যক্তিগত রুচির গণ্ডি ছাড়িয়ে বাঙালির সামাজিক জীবনের একটি মূল্যবান ঐতিহ্যে পরিণত হয়।
