ঈদের ছুটিতে গ্রামে ফিরে স্থানীয় হাটে বিনা মূল্যে রোগী দেখতেন অধ্যাপক ডা. মো. রিদওয়ানউর রহমান। তাঁর সেই মানবিক চিকিৎসাসেবার স্মৃতি ধরে রাখতে তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় আয়োজন করা হয়েছে বিনামূল্যের স্বাস্থ্যসেবা ক্যাম্প।
শুক্রবারের এ আয়োজনে আড়াই হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ পেয়েছেন। চোখের সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের দেওয়া হয়েছে চশমা। ছানি অস্ত্রোপচারের জন্য নিবন্ধন করেছেন প্রায় ৯৭ জন।
প্রয়াত চিকিৎসকের পরিবারের উদ্যোগে শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত উপজেলার কাঞ্চনা গ্রামের আমিলাইষ-কাঞ্চনা বঙ্গ চন্দ্র ঘোষ ইনস্টিটিউট (কাঞ্চনা হাইস্কুল) মাঠে ‘মেমোরিয়াল হেলথ ক্যাম্প, চক্ষু শিবির ও ছানি বাছাই-২০২৬’ শীর্ষক এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
এতে ঢাকা ও চট্টগ্রামের চিকিৎসকেরা রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেন। বিনা মূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ বিতরণের পাশাপাশি রক্তের গ্রুপ নির্ণয় এবং রক্তে শর্করা পরীক্ষার ব্যবস্থাও ছিল।
চক্ষু শিবিরে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ছানি রোগীদের বাছাই করা হচ্ছে। নির্বাচিত রোগীদের চট্টগ্রাম শহরের বিশেষায়িত হাসপাতালে নিয়ে বিনা মূল্যে যাতায়াত, লেন্সসহ অস্ত্রোপচার, ওষুধ ও চশমা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
ক্যাম্পে চিকিৎসা নিতে আসেন মথুরা ডেঙ্গার আহমদুর বর বাড়ির ৮০ বছর বয়সী মরিয়ম খাতুন। চোখে দেখে পবিত্র কোরআন পড়ার আগ্রহ থেকে তিনি চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে এসেছেন।
মনুফকির হাটের মুদিরপাড়ার ৪৩ বছর বয়সী সৈয়দ নূরও চোখের সমস্যা নিয়ে ক্যাম্পে আসেন। চিকিৎসকের পরামর্শে তিনি চশমা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ পান।
চুড়ামণি সিকদার বাড়ির ৫০ বছর বয়সী মো. ইয়াহিয়া দাঁত ও শরীরের ব্যথাজনিত সমস্যা নিয়ে চিকিৎসা নেন। সরকারপাড়ার ১ নম্বর ওয়ার্ডের ৫০ বছর বয়সী গীতা দাশ আসেন মাথাব্যথা ও কোমরব্যথার চিকিৎসা নিতে।
সিকদার বাড়ির ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. ইসমাইল মস্তিষ্কের সমস্যা নিয়ে চিকিৎসা নেন। ৬৫ বছর বয়সী সাধন দাশ ও তাঁর স্ত্রীও ক্যাম্পে চিকিৎসাসেবা নেন।
প্রয়াত চিকিৎসকের স্ত্রী অধ্যাপক ডা. রাশেদা সামাদ বলেন, “ডা. রিদওয়ানউর রহমান ছিলেন একজন চিকিৎসক, গবেষক ও লেখক। সময় পেলেই তিনি গ্রামে ছুটে আসতেন। গ্রামের দুস্থ, অসহায় ও দরিদ্র মানুষের চিকিৎসাসেবায় কাজ করতেন। তিনি দেশ ও মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন।”
“তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনায় আমরা এ চিকিৎসা ক্যাম্পের আয়োজন করছি। সবার সার্বিক সহযোগিতা ও দোয়া পেলে প্রতিবছর এ ক্যাম্প আয়োজনের চেষ্টা করব,” বলেন তিনি।
ক্যাম্পের সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ডা. ইমরান উস শহীদ বলেন, “ইতিমধ্যে আড়াই হাজারের বেশি রোগীকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে এবং ওষুধ বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি চোখের সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের চশমা দেওয়া হয়েছে।”
অধ্যাপক ডা. মো. রিদওয়ানউর রহমান ২০২৩ সালের ২৫ অক্টোবর ৬৫ বছর বয়সে মারা যান। ১৯৫৮ সালের পরবর্তী সময়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এই চিকিৎসক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ হিসেবে দেশে-বিদেশে পরিচিত ছিলেন।
ম্যালেরিয়া, কালাজ্বরসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ নিয়ে গবেষণায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন।
পরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন রিদওয়ানউর রহমান। অবসরের পর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ রিসার্চ সেন্টারের প্রধান গবেষক হিসেবে কাজ করেন।
চিকিৎসা ও গবেষণায় আন্তর্জাতিক পরিচিতি অর্জন করলেও জন্মভূমি কাঞ্চনার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল নিবিড়। ঈদের ছুটিতে গ্রামে ফিরে স্থানীয় হাটে বিনা মূল্যে রোগী দেখতেন তিনি।
তাঁর মানবিক চিকিৎসাসেবার আদর্শ ধরে রাখা এবং গবেষণা ও কর্মজীবনের অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে পরিবারের পক্ষ থেকে প্রতিবছর এ স্মরণমূলক স্বাস্থ্যসেবা ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়।
ক্যাম্পে উপস্থিত ছিলেন প্রয়াত চিকিৎসকের স্ত্রী অধ্যাপক ডা. রাশেদা সামাদ, ভাই ড. মো. রেজাউল করিম, ভাইয়ের স্ত্রী ডা. হালিমা করিম, ছেলে রাইয়িক রিদুয়ান, পুত্রবধূ তাহিরা ইসলাম ও মেয়ে রিদায়াহ রাইয়িন রিদুয়ান।
এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন ডা. আবদুল কাদের, অধ্যাপক শাহিন রেজা, ডা. আফসানা জেরিন, সহযোগী অধ্যাপক আবদুল হামিদ, স্কুলের এডহক কমিটির সভাপতি ও জেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ সদস্য অধ্যাপক শেখ মোহাম্মদ মহিউদ্দিন, ডা. নুরুল হক, মাস্টার আবদুর রহমান এবং কৃষক দল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক জসিম উদ্দিনসহ অন্যরা।
The post অধ্যাপক ডা. রিদওয়ানউর রহমানের স্মরণে স্বাস্থ্যসেবা ক্যাম্প, সেবা পেলেন আড়াই হাজারের বেশি রোগী appeared first on সুপ্রভাত বাংলাদেশ.
