বিমানে লেজার আলো ফেলে পাইলটের দৃষ্টিতে বিঘ্ন সৃষ্টি করা এবং বিমান চলাচলের নিরাপত্তা ব্যাহত হয়, এমন কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে বিধান রেখে নতুন বিধিমালা করেছে সরকার।
‘বেসামরিক বিমান চলাচল বিধিমালা, ২০২৬’ এ বিমান চলাচল, লাইসেন্স ও অনুমোদন, পাইলটের দায়িত্ব, যাত্রীদের আচরণ, বিপজ্জনক পণ্য পরিবহন এবং বিমানবন্দরের নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত নিয়ম যুক্ত করা হয়েছে।
গত ১৯ অক্টোবর জারি করা নতুন বিধিমালায় বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বিমানবন্দরের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচলের নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিভিন্ন বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে রহিত করা হয়েছে ১৯৮৪ সালের বেসামরিক বিমান চলাচল বিধিমালা।
বিমান চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে পারে, এমন লেজার আলো বা অন্য কোনো আলো ব্যবহারের বিষয়ে বিধিমালায় নিয়ন্ত্রণের বিধান রাখা হয়েছে। এ ধরনের আলো পাইলটের দৃষ্টিতে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে এবং উড্ডয়ন ও অবতরণের সময় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ ছাড়া বিমান চলাচলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, এমন কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে।
লাইসেন্স ও অনুমোদন স্থগিত বা বাতিল
বিমান পরিচালনা, উড্ডয়ন এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় লাইসেন্স, অনুমোদন ও সনদ গ্রহণের বিধান রয়েছে। নিয়ম ভঙ্গ বা নিরাপত্তাসংক্রান্ত শর্ত পূরণ না হলে সংশ্লিষ্ট লাইসেন্স, এয়ার অপারেটর সার্টিফিকেট বা অন্যান্য অনুমোদন স্থগিত কিংবা বাতিল করা যেতে পারে। বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা ও নিয়ম মানার বিষয়টি যাচাই করতে পরিদর্শনও করতে পারবে বলে বিধিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।
নিরাপত্তা বা জনস্বার্থে নির্দিষ্ট এলাকায় বিমান চলাচল সীমিত কিংবা নিষিদ্ধ করার বিধান রয়েছে। এসব এলাকায় বিমান পরিচালনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা ও অনুমোদন মানতে হবে। বিমান চলাচলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবে।
বাণিজ্যিক ফ্লাইটের পাশাপাশি অনির্ধারিত ফ্লাইট, চার্টার ফ্লাইট, ট্রানজিট, সাধারণ বিমান চলাচল এবং বিদেশি রাষ্ট্রীয় বিমানের চলাচলের বিষয়ে বিধান রাখা হয়েছে। এসব ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য অনুমোদন ও শর্ত পূরণ করতে হবে। বিদেশি বিমানের চলাচল এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যাত্রী বা পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বিধিনিষেধ অনুসরণ করতে হবে।
ড্রোন পরিচালনায় অনুমোদন
ড্রোনসহ চালকবিহীন উড়োজাহাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে অনুমোদন ও নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণের বিধান রয়েছে। বিমান চলাচলের নিরাপত্তা, বিমানবন্দরের কার্যক্রম এবং আকাশসীমার সুরক্ষা বিবেচনায় ড্রোন পরিচালনায় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মানতে হবে।
বিমান চালক এবং এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের দায়িত্বে থাকা কর্মীদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বিধিমালা অনুযায়ী, ফ্লাইট ক্রু ও এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের দায়িত্বে থাকা কর্মীরা দায়িত্ব পালনের আগের ১২ ঘণ্টার মধ্যে মদ্যপান করতে পারবেন না। দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা ও বিমান পরিচালনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এ বিধান রাখা হয়েছে।
পরীক্ষামূলক ফ্লাইটে যাত্রী নেওয়া যাবে না
নতুন বিমান পরীক্ষামূলকভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে বিশেষ নিয়ম রাখা হয়েছে। পরীক্ষামূলক ফ্লাইটে সাধারণভাবে যাত্রী বহন করা যাবে না। তবে বিধিমালায় অনুমোদিত ক্ষেত্রে কার্গো বা ডাক পরিবহনের সুযোগ রয়েছে। এ ধরনের ফ্লাইট পরিচালনায় নির্ধারিত শর্ত ও নিরাপত্তাবিধি অনুসরণ করতে হবে।
বিমানে অস্ত্র বহনে বিধিনিষেধ
বিমান ও বিমানবন্দরের নিরাপত্তার স্বার্থে অস্ত্র বহনের বিষয়ে বিধিনিষেধ রাখা হয়েছে। নির্ধারিত অনুমোদন ও নিয়ম ছাড়া বিমানে অস্ত্র বহন করা যাবে না। অস্ত্র বহন বা এ-সংক্রান্ত কার্যক্রমের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিরাপত্তাবিধি অনুসরণ করতে হবে।
বিমানবন্দরের অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতি ছয় মাসে পরিদর্শনের বিধান রাখা হয়েছে। এ ছাড়া অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় সনদসংক্রান্ত নিয়ম রয়েছে। দাহ্য তরল সংরক্ষণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে। বিধিমালায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ১৫ লিটারের বেশি দাহ্য তরল রাখার বিষয়ে নিয়ন্ত্রণের বিধান রয়েছে। বিমানবন্দরে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পাখি ও বন্যপ্রাণীর ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ
বিমানবন্দরের আশপাশে পাখি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর উপস্থিতি বিমান চলাচলের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ ধরনের ঝুঁকি কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে বিমানের দিকে লেজার বা অন্য কোনো আলো নিক্ষেপ কিংবা এমন কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা যাবে না, যা নিরাপদ উড্ডয়ন ও অবতরণে বিঘ্ন ঘটাতে পারে।
বিশৃঙ্খল যাত্রীকে বিমান থেকে নামানোর সুযোগ
বিমানে বিশৃঙ্খল আচরণ, নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা কিংবা ক্রুদের নির্দেশ অমান্য করার মতো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিধান রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট যাত্রীকে বিমান থেকে নামিয়ে দেওয়া বা তার যাত্রা বন্ধ করার ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
বিমানবন্দর ও বিমান চলাচলের নিরাপত্তাসংক্রান্ত কর্মসূচি, পরিকল্পনা এবং সংবেদনশীল তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার বিধান রয়েছে। অনুমোদন ছাড়া এসব তথ্য প্রকাশ বা ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হবে।
বিমানে বিপজ্জনক পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত অনুমোদন ও নিরাপত্তাবিধি মানতে হবে। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইসিএও) নিয়ম অনুযায়ী নিষিদ্ধ পণ্য পরিবহনের ওপরও বিধিনিষেধ রয়েছে। যেসব পণ্য বিমান, যাত্রী বা ক্রুর জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, সেগুলো পরিবহনে নির্ধারিত শর্ত অনুসরণ করতে হবে।
বকেয়া চার্জ থাকলে আটকে যেতে পারে অনুমোদন
বিমানবন্দরের সেবা ও বিমান চলাচলসংক্রান্ত চার্জ পরিশোধ না করলে সংশ্লিষ্ট অনুমোদন বা সেবা আটকে দেওয়ার বিধান রয়েছে। দীর্ঘদিন বকেয়া থাকলে নোটিশ দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বিমানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। বিধিমালায় ১২০ দিনের বকেয়া এবং ৩০ দিনের নোটিশের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। এরপর পরিস্থিতি অনুযায়ী বিমান জব্দ, নিলাম বা সরিয়ে নেওয়ার মতো ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রী ও পণ্য চলাচল, শুল্কসংক্রান্ত কার্যক্রম এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয়ে বিধান রয়েছে নতুন নীতিমালায়। বিমান পরিবহনসংক্রান্ত ভাড়া বা ট্যারিফ নির্ধারণের ক্ষেত্রেও নিয়ম রাখা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের অন্তত ৩০ দিন আগে ট্যারিফসংক্রান্ত তথ্য দেওয়ার বিধান রয়েছে।
