চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়া থানাধীন নতুনব্রিজ চেকপোস্টে প্রায় এক লাখ ইয়াবা গায়েবের ঘটনাটি নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা ও পুলিশের বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পরও পাবলিক চেকার ইমন ও হারুন নামে দুই পাবলিক চেকারের ভূমিকা নিয়ে আবারও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ওই ঘটনার পর তাঁরা এলাকা ছেড়ে বহুদিন পালিয়ে লুকিয়ে ছিলেন। যেহেতু সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী তাদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই অনুযায়ী বাকলিয়া থানা পুলিশ ওসি আফতাবকে প্রত্যাহার করার পরপরই বরিশাল ও ভোলায় টানা ৪৮ ঘন্টা অভিযান চালিয়েও তাদের গ্রেপ্তার করতে পারেননি। কিন্তু বর্তমানে আবারও তারা চট্টগ্রামে ফিরে এসে পুলিশের সঙ্গে বিভিন্ন চেকপোস্টে মাদক চেক করার দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, তথ্যমতে গত কয়েক মাস ধরে কর্ণফুলী থানা পুলিশের সঙ্গে মইজ্জ্যারটেক চেকপোস্ট এবং চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) বন্দর বিভাগের কয়েকটি দলের সঙ্গে কর্ণফুলীর শিকলবাহা ক্রসিং এলাকায় চেকপোস্টে দায়িত্ব পালন করছেন ইমন ও হারুন।
সরেজমিনে ঘটনাস্থলে গত এক সপ্তাহের অনুসন্ধানে দেখা মিলে রাত ১২টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত তাদের সেখানে দেখা যায়। অভিযোগ রয়েছে, সপ্তাহে পাঁচ দিন ডিবি বন্দর বিভাগের দলের সঙ্গে এবং দুই দিন কর্ণফুলী থানা পুলিশের সঙ্গে তারা দায়িত্ব পালন করেন। তাদের মুঠোফোনের কললিস্ট চেক করলেও তা সত্যতা মিলবে। বন্দর জোনের ডিবি ডিসি কাজী মো. আবদুর রহিমকে এ বিষয়ে কয়েকবার সতর্ক করেছেন সিএমপি’র অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ক্রাইম। কিন্তু তারপরেও ডিবি পুলিশের ঘুরছে দুই অতর্কিত চেকার।
তবে তাঁদের বর্তমান দায়িত্ব পালনের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট পুলিশ ইউনিটের প্রধান ও ও ডিবির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্য নিয়েও নানা ধোঁয়াশা রয়েছে। এ বিষয়ে সিএমপি কমিশনার ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ পুলিশ ইন্টেলিজেন্সির নজর প্রত্যাশা করেছেন স্থানীয় জনগণ।
বাকলিয়ার এক লাখ ইয়াবা গায়েবের ঘটনা
২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর রাতে চট্টগ্রাম নগরের নতুনব্রিজ এলাকায় একটি বাসে তল্লাশির সময় কক্সবাজার জেলা পুলিশের কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেনের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধারের অভিযোগ ওঠে। পরে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া এবং উদ্ধার করা ১ লাখ ইয়াবা গায়েব হয়ে যাওয়ার অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে। যে ঘটনায় জড়িত এই দুই চেকার ইমন ও হারুন।
এ ঘটনায় ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি বাকলিয়া থানার আট পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ঘটনাটি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও খবর প্রকাশিত হয়। পুলিশের ভাবমূর্তি নিমজ্জিত হয়।
দেশের শীর্ষ স্থানীয় গণমাধ্যম ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলোতে মূলত পুলিশ সদস্যদের দায়িত্বে অবহেলা, উদ্ধার করা মাদকের হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। তবে ঘটনার অভ্যন্তরে যে পাবলিক চেকার ইমন ও হারুনের নাম উঠে এসেছিলো। সেটা কেবল সিএমপি’র উধ্বর্তন কর্মকর্তারা জানতেন। তাদের ভূমিকা জানার পরেই পাবলিক চেকারদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিলে তখন গাঁ ডাকা দেন দুই চেকার। কিছুদিনের জন্য চট্টগ্রাম ছেড়ে যান।
সোর্স পাবলিক কীভাবে চেকপোস্টে দায়িত্ব পালন করছেন?
ইমন ও হারুন যদি সত্যিই বেসামরিক পাবলিক চেকার হিসেবে পুলিশের সঙ্গে তল্লাশিচৌকিতে দায়িত্ব পালন করে থাকেন, তাহলে তাঁদের নিয়োগ, দায়িত্ব অর্পণ, পরিচয় এবং আইনগত ক্ষমতার বিষয়গুলো স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন সিএমপি পুলিশের।
তারা কি কোনো আনুষ্ঠানিক নিয়োগ বা অনুমোদনের ভিত্তিতে দায়িত্ব পালন করছেন? তাঁদের কাজের পরিধি কী? তাঁরা কি কেবল পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেন, নাকি যানবাহন ও যাত্রী তল্লাশিতেও অংশ নেন? তাঁদের দায়িত্ব পালনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ইউনিটের কোনো লিখিত আদেশ, পরিচয়পত্র, ডিউটি রোস্টার কিংবা তদারকির ব্যবস্থা রয়েছে কি না— এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে একাধিক কর্মকর্তাদের মুঠোফোনে কল করে মন্তব্য জানতে চাইলেও কোন সদুত্তর আসেনি।
বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও পুলিশের বিধিবিধান অনুযায়ী, পুলিশের ক্ষমতা প্রয়োগ এবং বেসামরিক ব্যক্তির সহায়তাকারী হিসেবে কাজ করার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কোনো বেসামরিক ব্যক্তিকে পুলিশের সঙ্গে দেখা গেলেই তিনি আইনগতভাবে পুলিশ সদস্য হয়ে যান না। একইভাবে, পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করার অনুমতি থাকলেও তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তল্লাশি, আটক বা পুলিশের পরিচয় ব্যবহারের ক্ষমতা দেয় না।
অতএব, ইমন ও হারুনের বর্তমান ভূমিকার বৈধতা নির্ধারণে তাদের প্রকৃত দায়িত্ব, অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা জানাও প্রয়োজন। অভিযোগ রয়েছে এসব পাবলিক চেকার মাদক বিক্রি করেই কোটিপতি। এদের বিরুদ্ধে হারুন পটিয়া শান্তিরহাটে জমি কিনে বাড়ি গড়ার অভিযোগ রয়েছে। যা শুধুমাত্র মাদকের টাকায় বলে জনশ্রুতিও বেড়েছে। যা দুদকের তদন্তে বেরিয়ে আসবে বলে স্থানীয়দের অভিমত।
ইয়াবা ভাগাভাগির অভিযোগ, তদন্তের দাবি
এই পাবলিক চেকার ইমন ও হারুনের বিরুদ্ধে চেকপোস্টে উদ্ধার করা ইয়াবা ভাগাভাগি করার অভিযোগ উঠেছে বলে দাবি করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো নথি, মামলা বা তদন্তের ফলাফল না পাওয়া গেলেও উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। দুই চেকার নিজেদের নামে নিবন্ধিত কোনো সিম ব্যবহার করেন না। তাঁদের প্রকৃত নাম-পরিচয় নিয়েও রয়েছে নানা রহস্য।
অনুসন্ধানে হারুনের অস্থায়ী ঠিকানা হিসেবে পাওয়া গেছে বাকলিয়ার চর চাক্তাইয়ের তুলাতলী বাই লেনের ছগির সওদাগরের কলোনি। অন্যদিকে, ইমনের বাড়ি ভোলা জেলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার টবগী ইউনিয়নের মুলাই পত্তন এলাকায়। ধারণা করা হচ্ছে, এই দুজনকে গ্রেপ্তার করা হলে এক লাখ পিস ইয়াবা গায়েব হওয়ার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন হতে পারে।
যদি তাঁদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা পূর্ববর্তী কোনো তদন্তের তথ্য থাকে, তাহলে তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। একই সঙ্গে বর্তমান চেকপোস্টগুলোতে উদ্ধার করা মাদক কীভাবে জব্দ, গণনা, নথিভুক্ত ও হেফাজতে নেওয়া হয়, তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বাকলিয়ার ঘটনায় পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্তে ব্যবস্থা নেওয়ার পরও যদি একই ব্যক্তিরা আবার পুলিশের সঙ্গে চেকপোস্টে দায়িত্ব পালন করে থাকেন, তাহলে তাঁদের ভূমিকা এবং নিয়োগের ভিত্তি সম্পর্কে জনসমক্ষে স্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, ‘এ ধরনের অভিযোগ শোনার সঙ্গে সঙ্গেই মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) বন্দর জোনের ডিসি ও কর্ণফুলী থানার ওসিকে নির্দেশনা দিয়েছি। কোনো পাবলিক চেকার যেন কোনো চেকপোস্টে মাদক পরীক্ষা না করে, সে বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ইমন ও হারুনের বিষয়েও ব্যবস্থা নিতে বলেছি।’
ডিবির বন্দর বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) কাজী মো. আবদুর রহিমকে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
একই বিষয়ে কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নূর আহমেদ বলেন, ‘দুই পাবলিক চেকার ইমন ও হারুনের বিষয়ে সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম) ফোন করার পর থেকে তাঁদের মইজ্জ্যারটেক চেকপোস্টে আসতে নিষেধ করা হয়েছে। বর্তমানে মইজ্জ্যারটেকে কোনো পাবলিক চেকারকে দিয়ে চেকপোস্টে তল্লাশি করানো হয় না।’
পাশাপাশি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা বজায় রাখতে শুধু সদস্যদের জবাবদিহি নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; পুলিশের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা বেসামরিক ব্যক্তিদের পরিচয়, ভূমিকা ও ক্ষমতার সীমাও স্বচ্ছ হওয়া জরুরি। বিশেষ করে মাদক উদ্ধারের মতো সংবেদনশীল কাজে দায়িত্ব বণ্টন, তল্লাশি, জব্দতালিকা এবং মাদক হেফাজতের প্রতিটি ধাপে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
The post ইয়াবা গায়েবের রহস্য অমীমাংসিত, ফের চেকপোস্টে সেই ইমন-হারুন appeared first on বাংলাধারা.
