প্রযুক্তির ছোঁয়ায় দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে পৃথিবী। প্রযুক্তির কল্যাণে সব ধরনের কাজ, এমনকি ব্যবসাও এখন সহজ হয়ে উঠছে। তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন উদ্যোক্তা। তেমনই একজন উদ্যোক্তা গাইবান্ধার স্বপ্নবাজ তরুণ মিজানুর রহমান মিজান। লেখাপড়ার পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের দুর্গম চরাঞ্চলের প্রান্তিক কৃষকদের উৎপাদিত দেশীয় শস্য ও ঐতিহ্যবাহী কৃষিপণ্য ন্যায্যমূল্যে অনলাইনের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে তিনি গড়ে তুলেছেন ‘তাবিহা’। হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী ছাতুসহ খাঁটি দেশীয় খাদ্যপণ্য মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি প্রান্তিক কৃষকের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। সীমিত পুঁজিতে শুরু করা এই তরুণের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং অনুপ্রেরণাদায়ক পথচলার গল্প শুনেছেন মির্জা হাসান মাহমুদ
কেমন আছেন? শুরুতেই আপনার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ সম্পর্কে পাঠকদের কিছু বলুন।
আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি। আমি একজন শিক্ষার্থী এবং পাশাপাশি একজন তরুণ উদ্যোক্তা। আমার উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো, গাইবান্ধাসহ উত্তরবঙ্গের চরাঞ্চলের মানুষের কাছ থেকে দেশীয় শস্য ও কৃষিপণ্য ন্যায্যমূল্যে সংগ্রহ করে অনলাইনের মাধ্যমে ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
আমি মনে করি, একটি ব্যবসা শুধু মুনাফা অর্জনের মাধ্যম নয়; এর মাধ্যমে কৃষক ও প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং দেশীয় খাদ্য সংস্কৃতিকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগও রয়েছে। এই চিন্তা থেকেই আমার অনলাইন ব্যবসার যাত্রা। আমাদের মাধ্যমে ক্রেতা ও বিক্রেতা লাভবান হচ্ছে।
আপনার অনলাইন পেজে বর্তমানে কী কী পণ্য পাওয়া যাচ্ছে?
আমাদের ফেসবুক পেইজের নাম ‘তাবিহা’। আমার অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বর্তমানে মিক্সড ছাতু, লাল চাল, কাউনের চাল, আখের গুড় এবং কালিজিরার গুঁড়ার মতো দেশীয় খাদ্যপণ্য রয়েছে। আমরা মূলত দেশীয় শস্য ও ঐতিহ্যবাহী খাদ্যপণ্য নিয়ে কাজ করছি। আমার লক্ষ্য হলো, এসব পণ্য মানুষের কাছে সহজলভ্য করা এবং পণ্যগুলোর সঙ্গে যুক্ত কৃষক ও প্রান্তিক উৎপাদকদের পরিশ্রমের যথাযথ মূল্যায়নের চেষ্টা করা।
নানি-দাদির হাতে তৈরি ঐতিহ্যবাহী ছাতুর কথা মাথায় রেখে মিক্সড ছাতু তৈরির চিন্তা কীভাবে এল?
আমাদের ছোটবেলায় নানি-দাদির হাতে তৈরি ছাতু ছিল পরিচিত একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই সেই খাবার থেকে দূরে সরে গেছে। আবার কারো কাছে সাধারণ ছাতুর স্বাদ বা খাওয়ার ধরন খুব একটা আকর্ষণীয় মনে হয় না। এ বিষয়গুলো মাথায় রেখেই আমি মিক্সড ছাতু নিয়ে কাজ করার চিন্তা করি। উদ্দেশ্য হলো, দেশীয় শস্যের সমন্বয়ে এমন একটি পণ্য মানুষের কাছে তুলে ধরা, যা আমাদের ঐতিহ্যবাহী খাবারের কথা মনে করিয়ে দেবে এবং নতুন প্রজন্মকেও দেশীয় খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করবে। আমি চাই, মানুষ এই পণ্যের মাধ্যমে শুধু খাবারের স্বাদই নয়; বরং আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্য ও শেকড়ের সঙ্গেও সংযোগ খুঁজে পান।
আপনার মিক্সড ছাতুতে কী কী উপাদান ব্যবহার করা হয়। এর বিশেষত্ব কী?
মিক্সড ছাতু তৈরিতে যব, গম, ভুট্টা, লাল চাল, ছোলা, বাদাম, তিল, তিসি, কুমড়ার বীজ, কালিজিরা, দারুচিনি ইত্যাদি বিভিন্ন দেশীয় শস্য ব্যবহার করা হয়। চেষ্টা করছি দেশীয় উপাদানের সমন্বয়ে একটি স্বতন্ত্র খাদ্যপণ্য তৈরি করতে। আমার কাছে এর বিশেষত্ব শুধু উপাদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এসব দেশীয় শস্য সংগ্রহের মাধ্যমে স্থানীয় কৃষক ও উৎপাদকদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ তৈরি করাও আমাদের উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মিক্সড ছাতুর পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্যগত উপকারিতা সম্পর্কে কী বলবেন? যারা নিয়মিত ওষুধ সেবন করেন, তারা কি এটি খেতে পারবেন?
মিক্সড ছাতুতে ব্যবহৃত শস্যের ধরন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতির ওপর এর পুষ্টিমান নির্ভর করে। যেমন ধরেন শরীরে শক্তি জোগাবে, শস্যের কার্বোহাইড্রেট শরীরে প্রোটিনের চাহিদা পূরণে সহায়তা করবে, হজম ও পেট ভরা রাখতে সাহায্য করবে। শস্য, ছোলা, হৃদ্?স্বাস্থ্যে সহায়ক হতে পারে, ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে, বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ সরবরাহ করবে; তবে সঠিক পুষ্টিমান জানতে পণ্যটির উপাদান ও পুষ্টি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। আমরা চাই, মানুষ এটিকে একটি ঐতিহ্যবাহী খাদ্যবিকল্প হিসেবে বিবেচনা করুন। তবে এটি কোনো ওষুধ নয় এবং সব ধরনের রোগের চিকিৎসা বা প্রতিরোধে কার্যকর এমন দাবি আমরা করি না। যারা নিয়মিত ওষুধ সেবন করেন বা বিশেষ কোনো রোগে আক্রান্ত, তারা নিজেদের খাদ্যতালিকায় পরিবর্তন আনার আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিতে পারেন। আমার কাছে পণ্যের গুণগত মান, সঠিক তথ্য এবং ক্রেতার আস্থা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
উত্তরবঙ্গের দুর্গম চরাঞ্চল থেকে সরাসরি শস্য বা কাঁচামাল সংগ্রহের পরিকল্পনা কীভাবে মাথায় এল?
এই চিন্তার পেছনে মূলত চরাঞ্চলের মানুষের বাস্তবতা আমাকে ভাবিয়েছে। অনেক কৃষক ও প্রান্তিক মানুষ কঠোর পরিশ্রম করে শস্য উৎপাদন করেন। কিন্তু যোগাযোগব্যবস্থা, বাজারে প্রবেশের সীমাবদ্ধতা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে অনেক সময় তারা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। আমি চিন্তা করেছি, তাদের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য সংগ্রহ করে অনলাইনের মাধ্যমে ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে কৃষকদের জন্য বিক্রির আরেকটি সুযোগ তৈরি হতে পারে। সেই সঙ্গে ক্রেতারাও দেশীয় পণ্য সংগ্রহ করতে পারবেন। এই ভাবনা থেকেই আমার উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তৈরি হয়েছে।
চরাঞ্চল থেকে পণ্য সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে কী কী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়?
চরাঞ্চল থেকে পণ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে যোগাযোগ ও পরিবহন একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া পণ্যের মান যাচাই, সঠিকভাবে সংরক্ষণ, প্যাকেজিং, পরিবহন খরচ এবং ক্রেতার কাছে সময়মতো পণ্য পৌঁছে দেওয়ার বিষয়গুলোও সামলাতে হয়। অনলাইন ব্যবসায় ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই পণ্যের সঠিক তথ্য দেওয়া, দাম ও ওজনে স্বচ্ছ থাকা এবং ভালো গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা করি।
পণ্যের গুণগত মান ও বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেন?
খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে গুণগত মান ও পরিচ্ছন্নতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাঁচামাল সংগ্রহের সময় পণ্যের অবস্থা ও মানের দিকে গুরুত্ব দেওয়া, উপযুক্তভাবে সংরক্ষণ করা এবং স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেজিং করার বিষয়গুলো বিবেচনা করি। বিশেষ করে ছাতুর মতো খাদ্যপণ্যে আর্দ্রতা থেকে সুরক্ষা এবং সঠিক সংরক্ষণব্যবস্থা জরুরি। আমি চাই, ক্রেতারা আমাদের পণ্য সম্পর্কে সঠিক তথ্য পান এবং তাদের আস্থা বজায় থাক।
আপনার উদ্যোগটি স্থানীয় কৃষক ও চরাঞ্চলের মানুষের জীবনে কীভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে?
আমার উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো, স্থানীয় কৃষক ও চরাঞ্চলের মানুষের কাছ থেকে তাদের উৎপাদিত পণ্য ন্যায্য দামে সংগ্রহ করা। আমি চেষ্টা করি, তাদের পরিশ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন করতে এবং সম্ভব হলে প্রচলিত বাজারদরের তুলনায় ভালো দাম দিতে। আমার ব্যবসার পরিসর এখন যতটুকুই হোক, আমি চাই এটি কৃষকদের জন্য বিক্রির একটি বিকল্প মাধ্যম হয়ে উঠুক। ভবিষ্যতে উদ্যোগটি বড় হলে আরও বেশি কৃষক ও প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করি।
একজন শিক্ষার্থী হিসেবে পড়াশোনার পাশাপাশি সমাজসেবামূলক কাজে যুক্ত থাকার অনুপ্রেরণা কোথা থেকে পান?
মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা থেকেই আমি সামাজিক কাজের প্রতি আগ্রহী হয়েছি। আমার বাবা এবং আমার এক আঙ্কেল মো. হাসান, যিনি যমুনা সমাজ উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক; ওনাদের সঙ্গে কাজ করার তাগিদেই আমার সামাজিক কাজের প্রতি আগ্রহ আরও বাড়ে। আমার কাছে সমাজসেবা মানে শুধু আর্থিক সহায়তা নয়; মানুষের সমস্যা বোঝা, তাদের প্রয়োজনের সময় পাশে থাকা এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ইতিবাচক ভূমিকা রাখা। আমি মনে করি, একজন শিক্ষার্থী শুধু নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য পড়াশোনা করবে না, সমাজের প্রতিও তার কিছু দায়িত্ব রয়েছে। পড়াশোনা, ব্যবসা ও সামাজিক কাজ একসঙ্গে সামলানো সহজ নয়। তবে সময়ের সঠিক ব্যবহার ও পরিকল্পনার মাধ্যমে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি।
আপনার সমাজসেবামূলক মানসিকতা কি ব্যবসার নীতি গঠনে ভূমিকা রাখছে?
অবশ্যই, আমার কাছে ব্যবসা শুধু পণ্য কেনাবেচা বা মুনাফা অর্জনের বিষয় নয়। ব্যবসার মাধ্যমেও মানুষের উপকার করার সুযোগ রয়েছে। সেই চিন্তা থেকেই চেষ্টা করি, আমার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত কৃষক ও প্রান্তিক মানুষেরা তাদের পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ পান এবং ক্রেতারাও তাদের কেনা পণ্য সম্পর্কে সঠিক তথ্য পান। আমি বিশ্বাস করি, সততা, দায়িত্বশীলতা ও মানুষের প্রতি সম্মান একটি দীর্ঘস্থায়ী ব্যবসা গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
ব্যবসা শুরু করার সময় কী ধরনের আর্থিক সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছেন?
একজন নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে ব্যবসা শুরু করা এবং সেটিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে নেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। অনেক দিন থেকেই আমি পরিকল্পনা করছিলাম এ রকম কিছু করার। তবে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে ব্যবসা শুরু করতে দেরি হচ্ছিল। আমার কাছ থেকে অর্গানিক খাবার বিক্রির পরিকল্পনা শুনে আমার একজন শুভাকাক্সক্ষী ডক্টর লুৎফর রহমান আমাকে ৫ হাজার টাকা ধার দেন ব্যবসা শুরু করার জন্য। সেটা দিয়েই আমার ব্যবসার পথচলা শুরু হয়। পণ্য সংগ্রহ, পরিবহন, প্যাকেজিং ও অনলাইন প্রচারের জন্য অর্থের সঠিক ব্যবহার করতে হয়। আমি চাই, অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে এবং ব্যবসার আয়-ব্যয়ের হিসাব ঠিক রেখে উদ্যোগটিকে এগিয়ে নিতে। আমার কাছে শুরুতেই বড় হওয়ার চেয়ে টেকসইভাবে এগিয়ে যাওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
অনলাইন ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আপনাকে কতটা সহযোগিতা করছে?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের মতো ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম। এর সাহায্যে পণ্যের পরিচিতি তুলে ধরা, নতুন ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানো এবং ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা যায়; বিশেষ করে পণ্যের ছবি, ভিডিও, পণ্যের উৎস ও সংগ্রহের গল্প তুলে ধরলে মানুষ পণ্য সম্পর্কে জানতে পারেন। তবে শুধু প্রচার করলেই হয় না; ক্রেতাদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, অর্ডার ঠিকভাবে পরিচালনা করা এবং বিক্রির পরেও যোগাযোগ বজায় রাখা জরুরি।
আপনার পণ্যগুলো সাধারণ বাজারের পণ্যের তুলনায় কীভাবে আলাদা?
আমাদের উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দেশীয় খাদ্যপণ্যের উৎস ও সংগ্রহের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া; বিশেষ করে চরাঞ্চলের কৃষক ও প্রান্তিক উৎপাদকদের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহের মাধ্যমে তাদের জন্য বাজারের সুযোগ তৈরির চেষ্টা করছি। আমি চাই, ক্রেতারা পণ্যের ধরন, উৎস, দাম এবং গুণগত মান সম্পর্কে সঠিক তথ্য পান। শুধু প্রচার নয়, পণ্যের মান ও ভালো গ্রাহকসেবার মাধ্যমেই ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করতে চাই।
আপনার ব্যবসার সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী?
আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, ব্যবসায় মানুষের আস্থা অর্জন করা সহজ নয়, কিন্তু সেই আস্থা ধরে রাখা আরও গুরুত্বপূর্ণ। পণ্যের মান, সঠিক তথ্য, ন্যায্যমূল্য এবং ক্রেতার সঙ্গে ভালো আচরণÑ সবকিছুই একটি ব্যবসার সুনাম তৈরিতে ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি ব্যবসায় সব সময় শেখার মানসিকতা থাকতে হয়। বাজারের চাহিদা বুঝতে হয়, খরচের হিসাব রাখতে হয় এবং সমস্যা দেখা দিলে তার সমাধান খুঁজতে হয়।
ব্যবসার আয়ের একটি অংশ সামাজিক কাজে ব্যয় করার চিন্তা কীভাবে এসেছে?
আমার কাছে সামাজিক দায়বদ্ধতা গুরুত্বপূর্ণ। আমি বিশ্বাস করি, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের পাশে দাঁড়ানো প্রত্যেকের জন্যই একটি ইতিবাচক কাজ হতে পারে। ব্যবসা থেকে আয় হলে এর একটি অংশ সামাজিক কাজে ব্যয় করার চেষ্টা করি। আমার কাছে এটি শুধু আর্থিক সহায়তা নয়; বরং সমাজের প্রতি নিজের দায়িত্ব পালনের একটি উপায়। ভবিষ্যতে সামর্থ্য বাড়লে আরও পরিকল্পিতভাবে মানুষের জন্য কাজ করতে চাই।
গাইবান্ধার চরাঞ্চলের পণ্যকে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পরিচিত করতে কী পরিকল্পনা রয়েছে?
আমি চাই, চরাঞ্চলের দেশীয় শস্য ও কৃষিপণ্য শুধু স্থানীয় বাজারেই সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের কাছে পৌঁছে যাক। এর জন্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে আরও উন্নত করা, পণ্যের পরিচিতি বাড়ানো এবং ক্রেতাদের কাছে নির্ভরযোগ্যভাবে পণ্য পৌঁছে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
পাশাপাশি পণ্যের উৎস ও উৎপাদকদের গল্প তুলে ধরতে চাই, যাতে ক্রেতারা বুঝতে পারেন তারা কী কিনছেন এবং সেই পণ্য সংগ্রহের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের কী ধরনের পরিশ্রম জড়িত।
সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে কী ধরনের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন?
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বেশ কিছু প্রশিক্ষণ, উন্নত সংরক্ষণব্যবস্থা, প্যাকেজিং, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের সুযোগ। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাবসায়িক প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও উপযুক্ত অর্থায়নের সুযোগ থাকলে তারা নিজেদের উদ্যোগ আরও সুসংগঠিতভাবে এগিয়ে নিতে পারবেন। আমি চাই, ভবিষ্যতে এমন সুযোগ পেলে আমার উদ্যোগের পরিসর বাড়াতে এবং আরও বেশি কৃষক ও প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে কাজ করতে।
আগামী পাঁচ বছরে নিজেকে এবং নিজের উদ্যোগকে কোন অবস্থানে দেখতে চান?
আগামী পাঁচ বছরে আমি আমার উদ্যোগকে একটি পরিচিত ও বিশ্বাসযোগ্য দেশীয় খাদ্যপণ্যের ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। পণ্যের গুণগত মান বজায় রেখে আরও বেশি ক্রেতার কাছে পৌঁছানো এবং গাইবান্ধাসহ উত্তরবঙ্গের আরও বেশি কৃষকের সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা রয়েছে। আমি চাই, ব্যবসাটি এমনভাবে এগিয়ে যাক, যাতে এটি আমার নিজের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অন্য মানুষের জন্যও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করে।
দেশের ক্রেতা ও তরুণ প্রজন্মের প্রতি আপনার বিশেষ কোনো বার্তা আছে কি?
ক্রেতাদের প্রতি আমার অনুরোধ, দেশীয় পণ্য কেনার সময় পণ্যের মান, উৎস ও নির্ভরযোগ্যতার দিকে গুরুত্ব দিন। আমাদের দেশের কৃষক ও প্রান্তিক উৎপাদকদের পরিশ্রমকে মূল্য দেওয়ার সুযোগ আমাদের সবারই রয়েছে। আর তরুণদের বলতে চাই, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী, ছোট পরিসরে হলেও নতুন কিছু শুরু করার চেষ্টা করুন। শুধু নিজের সাফল্যের কথা না ভেবে এমন কিছু করার লক্ষ্য রাখুন, যার মাধ্যমে অন্য মানুষেরও উপকার হয়। আমি বিশ্বাস করি, সততা, পরিশ্রম ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে এগিয়ে গেলে একটি ছোট উদ্যোগও একদিন বড় সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
