যশোরে মাঠে কৃষকের মৃত্যু হচ্ছে, বিলে প্রাণ যাচ্ছে জেলের, স্বজন হারিয়ে অসহায় হচ্ছে পরিবার। এদিকে বজ্রপাত থেকে মানুষের প্রাণ বাঁচাতে নেওয়া সরকারি প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। ২২ লাখ টাকার বেশি ব্যয়ে স্থাপন করা তিনটি বজ্রনিরোধক দ-ের মধ্যে দুটির অবস্থান নিয়েই রয়েছে অনিশ্চয়তা। স্থাপনার নিচের বিভিন্ন ঢাকনা চুরি হয়ে গেছে। সেটির রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে পাঁচ হাজার তালগাছ রোপণের প্রকল্পের সুফলও দৃশ্যমান নয়। রোপণের পর পরিচর্যার অভাবে বিভিন্ন স্থানে চারাগুলো টেকেনি বলে জানান স্থানীয়রা। বজ্রপাতে নিহতদের পরিবারের জন্য সরকারি অনুদান থাকলেও অনেকে তা জানেন না। ফলে একের পর এক প্রাণহানির মধ্যেও প্রকল্পের তদারকি, সরকারি অর্থের ব্যবহার ও ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা পৌঁছানো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে যশোরে বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন ৫১ জন। তাদের মধ্যে ২৮ জনই কৃষক। চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল কালবৈশাখী ঝড় ও বৃষ্টির মধ্যে চৌগাছার আন্দুলিয়া মাঠে কাজ করছিলেন কৃষক আবু তাহের (৪৫)। বজ্রপাতে সেখানেই তার মৃত্যু হয়। একই সময়ে মনিরামপুরে শাহাপুর গ্রামে মাঠে যাওয়ার পথে বজ্রপাতে মারা যান কৃষক লুৎফর রহমান সরদার। গত ২২ সেপ্টেম্বর কেশবপুরে নতুন মূলগ্রামের বিলে মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে মারা যান জনাব আলী (৬৫)। এ তিনটি ঘটনা যশোরে বজ্রপাতের প্রাণঘাতী ঝুঁকিরই চিত্র তুলে ধরে। বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে ২০২২ সালে কেশবপুর ও ঝিকরগাছায় তিনটি বজ্রনিরোধক দ- বা লাইটনিং অ্যারেস্টার স্থাপন করা হয়। এতে সরকারের ব্যয় হয় ২২ লাখ টাকার বেশি। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের কয়েক বছর পরও দ-গুলোর বর্তমান অবস্থা ও কার্যকারিতা নিয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। কেশবপুরের মজিদপুর ইউনিয়নের দেউলি গ্রামের বালিয়ার বিলে দ- স্থাপন করা হয়। অন্য দুটি ঝিকরগাছার মাগুরা ও গদখালি এলাকায় স্থাপনের কথা রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, দ- বসানোর দুই বছর এলাকায় বজ্রপাত কম দেখা দিত। এখন আবার আগের মতো বজ্রপাত হয়।
দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নিয়মিত খোঁজ নেন না। মাগুরা ইউপির সচিব সাকিবুল ইসলাম চাকলাদার বলেন, এ ইউনিয়নে কোনো দ- স্থাপন করা হয়নি। গদখালির ফুল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আব্দুর রহিম জানান, বর্ষা মৌসুমে ঝুঁকি নিয়ে মাঠে কাজ করেন প্রায় পাঁচ হাজার ফুলচাষি। বিভিন্ন সময়ে দাবি জানালেও সেখানে বজ্রনিরোধক দ- স্থাপন করা হয়নি। সরকারি নথিতে তিনটি দ- স্থাপনের তথ্য থাকলেও মাঠপর্যায়ে সেগুলোর অবস্থান ও কার্যকারিতা নিয়ে এমন অনিশ্চয়তা প্রকল্পের তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ২২ লাখ টাকার বেশি ব্যয়ে এ প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কীভাবে পালন করা হচ্ছে, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। এদিকে বজ্রপাতের ক্ষতি কমাতে ২০১৮ ও ২০২২ সালে সরকারি উদ্যোগে পাঁচ হাজার তালগাছ রোপণের প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, রোপণের পর পরিচর্যা ও সুরক্ষার অভাবে বিভিন্ন স্থানের চারা টেকেনি।
সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তথ্যমতে, ২০২২ সালে কেশবপুরে ৫০টির বেশি তালগাছের চারা রোপণ করা হয়েছিল। ইউপি সদস্য মোহাম্মদ আলী জানান, সেগুলোর একটিও বেঁচে নেই। এ ছাড়া কপোতাক্ষ নদের পাড়ে চারা রোপণের তথ্য থাকলেও তার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অপরদিকে, বজ্রপাতে নিহত ও আহতদের জন্য সরকারি আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে। নিহত ব্যক্তির পরিবার সর্বোচ্চ ২৫ হাজার ও আহত ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা অনুদান পেতে পারেন। কিন্তু এ সহায়তার বিষয়ে না জানায় অনেক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার আবেদনই করছে না। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা শেখ আবদুল কাদের বলেন, জেলায় অনেক আগে তিনটি বজ্রনিরোধক দ- বসানো হলেও সেগুলো কেমন, কীভাবে আছে জানা নেই। আর তালগাছের চারা রোপণ করা হলেও সেগুলোর অস্তিত্ব নেই। এখন বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা কমাতে মূলত প্রচার ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে জোর দিচ্ছি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাইমেট অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মিলিয়ে বজ্রপাত দেশের অন্যতম দুর্যোগে পরিণত হয়েছে।
