নিজের একটি বাড়ি বা ফ্ল্যাট থাকবে—এই এক স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকে অনেকেই। তবে সেই স্বপ্ন পূরণের আগে সামনে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—এখনই কি নিজের স্থায়ী আবাস কেনার সময়, নাকি আরও কিছুদিন ভাড়া বাসায় থাকাই ভালো? এমন সিদ্ধান্তের কোনো একক উত্তর নেই। কারণ, এটি নির্ভর করে একজনের আর্থিক সক্ষমতা, জীবনযাত্রা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, বাজার পরিস্থিতি এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য—সবকিছুর ওপর। সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারলে যেমন আর্থিক চাপ কমানো সম্ভব, তেমনি ভবিষ্যতের জন্য একটি স্থিতিশীল ভিত্তিও তৈরি করা যায়।
কোন পর্যায়ে নিজের বাড়ি কেনার কথা ভাববেন
নিজের বাড়ি বা ফ্ল্যাট মানে শুধু একটি স্থায়ী ঠিকানা নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদি একটি সম্পদও। নিয়মিত কিস্তি পরিশোধের মাধ্যমে ধীরে ধীরে নিজের সম্পদ তৈরি হয়। পাশাপাশি ভবিষ্যতে সম্পত্তির মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। পরিবারের নিরাপত্তা, স্থায়িত্ব এবং মানসিক স্বস্তির দিক থেকেও নিজের বাড়ির আলাদা গুরুত্ব রয়েছে।
তবে বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা জরুরি। যেমন বুঝতে হবে আপনার মাসিক আয় স্থিতিশীল কি না, নিয়মিত সঞ্চয়ের অভ্যাস আছে কি না, ডাউন পেমেন্টের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতে পারবেন কি না; মাসিক কিস্তি পরিশোধ করলেও দৈনন্দিন খরচ ও জরুরি তহবিল বজায় রাখা সম্ভব হবে কি না। যদি এসব প্রশ্নের বেশির ভাগের উত্তর ইতিবাচক হয়, তাহলে নিজের বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনার পরিকল্পনা শুরু করার সময় এসেছে বলে ধরে নেওয়া যায়।
হোম লোন নেওয়ার সঠিক সময় কীভাবে নির্ধারণ করবেন
এককালীন অর্থে বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনা অনেকেরই পক্ষেই সম্ভব হয় নয়। সে ক্ষেত্রে গৃহঋণ বা হোম লোনই ভরসা। কিন্তু লোন নেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু সুদের হার নয়, নিজের আর্থিক সক্ষমতাও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। লোন নেওয়ার আগে নিশ্চিত হতে হবে যে মাসিক কিস্তি আপনার মোট মাসিক আয়ের এমন একটি অংশ, যা পরিশোধ করতে গিয়ে জীবনযাত্রার মান বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় ব্যাহত না হয়। পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতির জন্য কিছু সঞ্চয়ও রাখা উচিত।
এ ছাড়া কয়েকটি বিষয় আগেই যাচাই করে নেওয়া প্রয়োজন। যেমন বিভিন্ন ব্যাংকের সুদের হার ও অন্যান্য চার্জ তুলনা করা, ঋণের মেয়াদ ও কিস্তির পরিমাণ বুঝে নেওয়া, আগাম ঋণ পরিশোধের শর্ত সম্পর্কে জানা এবং নিজের ক্রেডিট ইতিহাস ও আর্থিক সক্ষমতা মূল্যায়ন করা ইত্যাদি।
শুধু কম সুদের হার দেখেই লোন গ্রহণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। ঋণের পুরো কাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি দায় বিবেচনায় রাখাটা জরুরি।
প্রাইম ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম নাজিম এ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিজস্ব বাড়ি কেনা জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সিদ্ধান্ত। তাই এটি কেবল আবেগের ভিত্তিতে নয়, বরং সুপরিকল্পিত আর্থিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে নেওয়া উচিত। স্থিতিশীল আয়, পর্যাপ্ত ডাউন পেমেন্ট এবং মাসিক কিস্তি নির্বিঘ্নে পরিশোধের সক্ষমতা নিশ্চিত হওয়ার পরই হোম লোন নেওয়ার সিদ্ধান্ত সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত।’
এম নাজিম এ চৌধুরী আরও বলেন, ‘বর্তমান বাজারে গ্রাহকদের শুধু ইন্টারেস্ট হার নয়, ঋণের মোট ব্যয়, পরিশোধের শর্ত, সেবার মান এবং ব্যাংকের নির্ভরযোগ্যতাও বিবেচনায় নেওয়া উচিত। সঠিক পরিকল্পনা ও দায়িত্বশীল ঋণ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে হোম লোন দীর্ঘ মেয়াদে একটি মূল্যবান সম্পদ গঠনের কার্যকর মাধ্যম হতে পারে।’
ভাড়ায় থাকা বা নিজের বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনা—দুটিই পরিস্থিতিভেদে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত হতে পারে। তবে যদি আপনার আর্থিক ভিত্তি শক্ত হয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা স্পষ্ট থাকে এবং হোম লোনের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধের সক্ষমতা থাকে, তাহলে নিজের স্থায়ী আবাসের স্বপ্ন পূরণের জন্য এখনই হতে পারে সঠিক সময়।
