বৈশ্বিক ব্যাংকিং খাতে মোট সম্পদের বিচারে বিশ্বের শীর্ষ ১০ ব্যাংকের তালিকায় আধিপত্য ধরে রেখেছে চীন। তালিকার প্রথম চারটি স্থানই দেশটির ব্যাংকগুলোর দখলে। শীর্ষ ১০-এর মধ্যে চীনের ব্যাংক রয়েছে পাঁচটি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ব্যাংকগুলোও তালিকায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে। ইউরোপের ব্যাংকগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যের এইচএসবিসিকে পেছনে ফেলে শীর্ষে উঠে এসেছে ফ্রান্সের বিএনপি পরিবা।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল মার্কেট ইন্টেলিজেন্সের সর্বশেষ তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি তালিকায় বিশ্বের বৃহত্তম ব্যাংক হিসেবে টানা ১৩তম বছরের মতো প্রথম অবস্থান ধরে রেখেছে চীনের ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক অব চায়না (আইসিবিসি)। ব্যাংকটির মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৭ লাখ ৬৫ হাজার কোটি মার্কিন ডলার বা ৭.৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার। বিপুল সম্পদ, বিস্তৃত কার্যক্রম ও চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে শক্তিশালী অবস্থানের কারণে ব্যাংকটি বৈশ্বিক ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে।
তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চীনের অ্যাগ্রিকালচারাল ব্যাংক অব চায়না। ব্যাংকটির মোট সম্পদ ৬.৯৭ ট্রিলিয়ন ডলার। তৃতীয় স্থানে থাকা চায়না কনস্ট্রাকশন ব্যাংক করপোরেশনের সম্পদ ৬.৫২ ট্রিলিয়ন ডলার। আর ৫.৪৮ ট্রিলিয়ন ডলার সম্পদ নিয়ে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে ব্যাংক অব চায়না। অর্থাৎ, সম্পদের বিচারে বিশ্বের শীর্ষ চারটি ব্যাংকই চীনের।
শীর্ষ ১০-এর দশম অবস্থানেও রয়েছে দেশটির আরেক ব্যাংক পোস্টাল সেভিংস ব্যাংক অব চায়না। ব্যাংকটির মোট সম্পদ ২.৬৭ ট্রিলিয়ন ডলার। ফলে তালিকায় চীনের পাঁচটি ব্যাংকের সম্মিলিত উপস্থিতি দেশটির ব্যাংকিং ব্যবস্থার ব্যাপক আকার ও বৈশ্বিক গুরুত্ব তুলে ধরছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকগুলোর অবস্থান
চীনের বাইরে বিশ্বের বৃহত্তম ব্যাংক হিসেবে তালিকায় পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের জেপি মরগান চেজ অ্যান্ড কোম্পানি। ব্যাংকটির মোট সম্পদ ৪.৪৩ ট্রিলিয়ন ডলার। চীনের শীর্ষ চার ব্যাংকের তুলনায় সম্পদের পরিমাণ কম হলেও বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে ব্যাংকটির প্রভাব উল্লেখযোগ্য। শেয়ারবাজারের মূলধন বা মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশনের বিচারে জেপি মরগান বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান ব্যাংক হিসেবেও নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আরেক বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্যাংক অব আমেরিকা রয়েছে তালিকার ষষ্ঠ স্থানে। ব্যাংকটির মোট সম্পদ ৩.৪১ ট্রিলিয়ন ডলার। দেশটির বৃহৎ ভোক্তা ব্যাংকিং কার্যক্রম, করপোরেট আর্থিক সেবা এবং বিনিয়োগ ব্যাংকিং খাতের উপস্থিতি প্রতিষ্ঠানটিকে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ করে তুলেছে।
ইউরোপের ব্যাংকিং খাতে পরিবর্তন
তালিকায় ইউরোপের ব্যাংকগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ফ্রান্সের বিএনপি পরিবা। ৩.২৮ ট্রিলিয়ন ডলার সম্পদ নিয়ে ব্যাংকটি বিশ্বে সপ্তম অবস্থানে রয়েছে। যুক্তরাজ্যের এইচএসবিসি হোল্ডিংস ৩.২১ ট্রিলিয়ন ডলার সম্পদ নিয়ে রয়েছে অষ্টম স্থানে। অন্যদিকে ফ্রান্সের আরেক ব্যাংক ক্রেডিট অ্যাগ্রিকোল ৩.১৪ ট্রিলিয়ন ডলার সম্পদ নিয়ে নবম অবস্থানে রয়েছে।
এ হিসাবে ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে ফরাসি প্রতিষ্ঠানগুলোর উপস্থিতি লক্ষণীয়। বিএনপি পরিবা ও ক্রেডিট অ্যাগ্রিকোল—দুটি ব্যাংকই শীর্ষ ১০-এ জায়গা করে নিয়েছে। অন্যদিকে এইচএসবিসির অবস্থান অষ্টম হওয়ায় সম্পদের বিচারে ইউরোপীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার চিত্র স্পষ্ট হয়েছে।
বিশ্বের শীর্ষ ১০ ব্যাংকের তালিকায় দেশভিত্তিক অবস্থান বিবেচনায় চীন এগিয়ে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকগুলোও গুরুত্বপূর্ণ স্থান ধরে রেখেছে। ইউরোপের ব্যাংকগুলোর উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য। তবে সম্পদের আকারের দিক থেকে চীনের ব্যাংকগুলোর সঙ্গে অন্য দেশের ব্যাংকগুলোর ব্যবধান স্পষ্ট।
চীনা ব্যাংকগুলোর সম্পদ বাড়ছে কেন
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চীনা ব্যাংকগুলোর বিপুল সম্পদের পেছনে দেশটির বিশাল অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়, বৃহৎ অর্থনীতি, অবকাঠামো খাতে সরকারি বিনিয়োগ এবং বন্ড ও ঋণবাজারের ভূমিকা রয়েছে। দেশটির ব্যাংকগুলো শিল্প, বাণিজ্য, আবাসন, অবকাঠামো ও সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থায়নের মাধ্যমে বড় ধরনের সম্পদভিত্তি গড়ে তুলেছে।
চীনের বৃহৎ জনসংখ্যা ও অভ্যন্তরীণ বাজারও ব্যাংকগুলোর আমানত সংগ্রহ এবং ঋণ কার্যক্রম সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বড় ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে অর্থায়ন দেশটির ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করেছে। তবে মোট সম্পদের আকার বড় হলেই কোনো ব্যাংকের মুনাফা, সম্পদের গুণগত মান কিংবা আর্থিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা একই অনুপাতে শক্তিশালী—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এসব মূল্যায়নে খেলাপি ঋণ, মূলধন পর্যাপ্ততা, মুনাফা এবং তারল্যের মতো সূচকও বিবেচনা করতে হয়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ব্যাংকগুলোর শক্তির অন্যতম উৎস হলো বিনিয়োগ ব্যাংকিং, পুঁজিবাজার, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, করপোরেট অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন। জেপি মরগান চেজের মতো প্রতিষ্ঠান শুধু ঋণ ও আমানতনির্ভর কার্যক্রমেই সীমাবদ্ধ নয়; বৈশ্বিক পুঁজিবাজার ও বিভিন্ন আর্থিক সেবায়ও তাদের বিস্তৃত উপস্থিতি রয়েছে। এ কারণে মোট সম্পদে চীনা ব্যাংকগুলো এগিয়ে থাকলেও বাজারমূল্য ও মুনাফার মতো অন্যান্য সূচকে প্রতিযোগিতার চিত্র ভিন্ন হতে পারে।
ইউরোপের বড় ব্যাংকগুলোও বহুজাতিক ব্যবসা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থায়ন, করপোরেট ব্যাংকিং এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফ্রান্সের বিএনপি পরিবা ও ক্রেডিট অ্যাগ্রিকোল এবং যুক্তরাজ্যের এইচএসবিসির অবস্থান এ প্রতিযোগিতারই প্রতিফলন।
সব মিলিয়ে, মোট সম্পদের বিচারে বিশ্বের বৃহত্তম ব্যাংকগুলোর তালিকা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এশিয়ার, বিশেষ করে চীনের, ক্রমবর্ধমান আর্থিক উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকগুলোর পুঁজিবাজারকেন্দ্রিক শক্তি এবং ইউরোপের ব্যাংকগুলোর আন্তর্জাতিক কার্যক্রমও বৈশ্বিক ব্যাংকিং খাতে তাদের প্রভাব বজায় রেখেছে। তবে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত সক্ষমতা তুলনা করতে সম্পদের পরিমাণের পাশাপাশি মুনাফা, মূলধন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও বাজারমূল্যের মতো সূচকও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
