চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ১৫ বছরের জন্য পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্ত প্রকাশ, শ্রমিকদের অধিকার সংরক্ষণসহ ১০ দফা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট চট্টগ্রাম মহানগর।
বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেলে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সুলতান আহমদ হলে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, চট্টগ্রাম মহানগর আয়োজিত ‘চট্টগ্রাম বন্দর: জাতীয় স্বার্থে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা কোথায়? নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানিকে ইজারা দেওয়া, অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থাপিত প্রবন্ধে এসব দাবি জানানো হয়।
প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের যুগ্ম মহাসচিব মুহাম্মদ আবদুর রহিম।
প্রবন্ধে বলা হয়, উন্নয়নের নামে রাষ্ট্রের কৌশলগত সম্পদের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, জাতীয় নিরাপত্তা কিংবা শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। এনসিটি টার্মিনালের মালিকানা রাষ্ট্রের হাতে থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনাগত নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল তথ্যের নিরাপত্তা, রাজস্ব বণ্টন এবং সংকটকালীন সময়ে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের ক্ষমতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা থাকা প্রয়োজন।
চুক্তির স্বচ্ছতা ও আর্থিক জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবি জানিয়ে বলা হয়, ‘১৫ বছরে রাষ্ট্রের সম্ভাব্য আয়, পরিচালন ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের প্রকৃতি এবং রাজস্ব বণ্টনের শর্ত বিবেচনায় নিয়ে নিরপেক্ষ অর্থনৈতিক মূল্যায়ন করতে হবে। চুক্তির জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট ধারা, ট্যারিফ কাঠামো, বিনিয়োগের সময়সূচি, জরিমানার বিধান ও বিরোধ নিষ্পত্তির শর্ত জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।’
বন্দর শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষার বিষয়ে বলা হয়, ‘আধুনিকায়ন ও অটোমেশনের অজুহাতে কোনো শ্রমিকের কর্মসংস্থান, বেতন-ভাতা, পেনশন, ভবিষ্যৎ তহবিল, চিকিৎসাসেবা ও ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার ক্ষুণ্ন করা যাবে না। নতুন প্রযুক্তির পাশাপাশি কর্মরত শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে হবে।’
জাতীয় নিরাপত্তা ও ডিজিটাল তথ্যের সুরক্ষা প্রসঙ্গে বলা হয়, ‘টার্মিনালের অপারেশনাল ডাটাবেজ, বাণিজ্যিক তথ্য এবং নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট ডিজিটাল ব্যবস্থার ওপর রাষ্ট্রের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা জরুরি। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে সংরক্ষণ, নিয়মিত সাইবার নিরাপত্তা নিরীক্ষা এবং জাতীয় জরুরি অবস্থা বা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপের অধিকার সুস্পষ্ট করতে হবে। পণ্য খালাসের দীর্ঘসূত্রতা কমাতে বন্দর, কাস্টমস, এনবিআর, ব্যাংক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও পরিবহন ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বিত ডিজিটাল সেবা চালু করতে হবে।
১০ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে-
১. এনসিটি চুক্তির পূর্ণাঙ্গ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ধারা, রাজস্ব কাঠামো ও বিনিয়োগের সময়সূচি প্রকাশ করতে হবে।
২. নিরপেক্ষ অর্থনীতিবিদদের মাধ্যমে চুক্তির নিট বর্তমান মূল্য (এনপিভি) নিরূপণ ও আর্থিক নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে।
৩. সংসদে উন্মুক্ত বিতর্কের মাধ্যমে সমন্বিত জাতীয় বন্দর নীতিমালা ও অংশীদারত্ব আইন প্রণয়ন করতে হবে।
৪. এনসিটিতে কর্মরত শ্রমিকদের চাকরি, বেতন-ভাতা, পেনশন ও ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার সুরক্ষিত রাখতে হবে।
৫. দেশীয় জনবলকে স্বাবলম্বী করতে বাধ্যতামূলক প্রযুক্তি হস্তান্তর ও প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
৬. টার্মিনালের অপারেশনাল ডাটাবেজ ও গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল তথ্য বাংলাদেশের সীমানার মধ্যে রেখে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
৭. জাতীয় জরুরি অবস্থা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ ও টার্মিনাল অধিগ্রহণের অধিকার সুস্পষ্ট করতে হবে।
৮. বন্দর, কাস্টমস ও ব্যাংকের সমন্বয়ে ডিজিটাল সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থা চালু করে পণ্য খালাসের দীর্ঘসূত্রতা কমাতে হবে।
৯. প্রতি তিন মাস অন্তর টার্মিনালের কার্যসম্পাদন সূচক (কেপিআই) ও মাশুলসংক্রান্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
১০. চুক্তির কোনো ধারায় জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে তা আইনসম্মতভাবে পুনর্বিবেচনা ও সংশোধন করতে হবে।
তামান্না রুপা/
