ছুটিতেও ভিসির প্রবেশ ঠেকাতে পাহারায় থাকবে শিক্ষার্থীরা
দুর্গাপূজা উপলক্ষে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) শুরু হয়েছে টানা সাত দিনের ছুটি। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে শুরু হওয়া
চট্টগ্রাম ব্যুরো
দুর্গাপূজা উপলক্ষে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) শুরু হয়েছে টানা সাত দিনের ছুটি। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে শুরু হওয়া এ ছুটিতে অধিকাংশ শিক্ষার্থী বাড়ি ফিরতে শুরু করলেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষার্থীদের একটি অংশ। নতুন ভিসি অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমের ক্যাম্পাসে প্রবেশ ঠেকাতে ছুটির দিনগুলোতেও পাহারায় থাকবেন তারা। একই সঙ্গে সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের পুনর্বহালের দাবিতে চলমান শাটডাউন কর্মসূচিও অব্যাহত থাকবে।
অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে পূর্ণ কর্মবিরতি পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে চুয়েটের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী সমিতি। ছুটির সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দাবি, ক্যাম্পাসে আর প্রবেশ না করার শর্তে ভিসি অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি আবারও ক্যাম্পাসে প্রবেশের চেষ্টা করলে আন্দোলন আরও কঠোর করা হবে। এ কারণে ছুটির সময়েও ক্যাম্পাসে অবস্থানরত শিক্ষার্থীরা সতর্ক থাকবেন বলে জানিয়েছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া ছুটি চলবে টানা সাত দিন। শুক্রবার ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি এবং রোববার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দুর্গাপূজার ছুটি নির্ধারিত রয়েছে। আগামী ২৫ অক্টোবর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কর্মদিবস শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
চুয়েট কর্মচারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক প্রিয়তোষ চক্রবর্তী গতকাল বৃহস্পতিবার বলেন, ‘চুয়েটে দুর্গাপূজার সাত দিনের ছুটি শুরু হয়েছে। শুক্রবার ও শনিবার দুদিন সাধারণ সাপ্তাহিক ছুটি এবং রোববার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পাঁচ দিন পূজার ছুটি। এ সময়েও আমাদের কর্মবিরতি চলবে। সব ধরনের প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার প্রবীর চন্দ্র ভৌমিক বলেন, একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী পাঁচ দিন পূজার ছুটি রয়েছে। তবে অন্যান্যবার ছুটির আগে আগাম নোটিশ দেওয়া হলেও এবার কোনো নোটিশ জারি করা হয় নি। তিনি নিজেও কোনো নোটিশ হাতে পান নি। তবে ছুটি শুরু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেন তিনি। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা জানান, দুর্গাপূজার ছুটির আগে বৃহস্পতিবার ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ কর্মদিবস। এদিন দুপুর থেকেই বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা আবাসিক হল ছাড়তে শুরু করেন। তবে আন্দোলনের কারণে অনেক শিক্ষার্থী বাড়ি না ফিরে ক্যাম্পাসে অবস্থান করবেন।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, ছুটির দিনগুলোতে সরাসরি কোনো আন্দোলন কর্মসূচি না থাকলেও ভিসির প্রবেশ ঠেকাতে নজরদারি অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটডাউন কর্মসূচিও চলবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আন্দোলনকারী এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘ছুটিতে সব শিক্ষার্থী বাড়িতে যাচ্ছে না। অনেকেই হলে থাকছে। আমরা নতুন ভিসি শেখ শরীফুল আলমের প্রবেশ ঠেকাতে সজাগ থাকব। বন্ধের দিনেও আমাদের নিয়মিত পাহারা থাকবে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।’
এদিকে, আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা। বুধবার বিকেলে দেওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তারা জানান, সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের পুনর্বহালের এক দফা দাবিতে চলমান আন্দোলনের বিষয়ে তারা অনড় রয়েছেন। একই সঙ্গে চলমান সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষার্থীরা বলেন, তাদের আন্দোলনকে বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টা করছে। এমনকি ছাত্রলীগের একটি পেজ থেকেও আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে প্রচার চালানো হয়েছে বলে তারা উল্লেখ করেন।
শিক্ষার্থীদের দাবি, তাদের সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক দাবিকে কেউ সরকারবিরোধী, আবার কেউ রাষ্ট্রবিরোধী অসন্তোষের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। এ ধরনের অপব্যাখ্যা ও রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার প্রচেষ্টা তারা প্রত্যাখ্যান করছেন।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, কোনো রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় আনা বা ক্ষমতা থেকে সরানো, রাষ্ট্রকে হেয় করা কিংবা সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রচার চালানো তাদের আন্দোলনের উদ্দেশ্য নয়। চুয়েটের শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবিকে কোনো পক্ষের রাজনৈতিক বক্তব্য প্রতিষ্ঠার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয় বলেও উল্লেখ করেন তারা।
জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে শিক্ষার্থীরা বলেন, ওই সময়ের সহিংসতা, দমন-পীড়ন ও প্রাণহানির স্মৃতি তাদের কাছে গভীর বেদনা ও জবাবদিহির প্রশ্ন। তাদের বক্তব্য, সেই অভিজ্ঞতা অস্বীকার করে কিংবা শিক্ষার্থীদের আত্মত্যাগকে রাজনৈতিক প্রচারণার আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে কোনো সংগঠন তাদের আন্দোলনের নৈতিক সমর্থক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারে না।
এদিকে, চুয়েটের ভিসি অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম হাসপাতাল থেকে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে ফিরেছেন। এর আগে গত ১৩ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজ দপ্তরে প্রায় ৩৪ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর তাকে উদ্ধার করেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপার (এসপি)। পরে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।
ভিসির অবরুদ্ধ থাকা এবং পরবর্তী সময়ে তাকে উদ্ধার করে ক্যাম্পাসের বাইরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে চুয়েটে চলমান অচলাবস্থা আরও আলোচনায় আসে। শিক্ষার্থীরা সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।
বর্তমানে দুর্গাপূজার ছুটি শুরু হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও আন্দোলনের অবসান ঘটেনি। ছুটির সময় শিক্ষার্থীদের একাংশের ক্যাম্পাসে অবস্থান, ভিসির প্রবেশ ঠেকাতে পাহারা এবং শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মবিরতির কারণে চুয়েটের অচলাবস্থা আপাতত অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত মিলছে।
