আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) অক্টোবর ২০২৬-এর ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে এমন চিত্র উঠে এসেছে। ‘রেজিলিয়েন্স আন্ডার স্ট্রেইন, আর্জেন্ট চয়েসেস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, বৈশ্বিক অর্থনীতি নানা ধাক্কা সামলে টিকে থাকলেও সব দেশ সমানভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারছে না। প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের সুবিধা পাওয়া দেশগুলো তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকলেও জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো বেশি চাপে রয়েছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংকও। সংস্থাটির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে গতি কমেছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের কারণে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতির সমস্যা বাড়ছে।
বিশ্বব্যাংকের অক্টোবর ২০২৬-এর ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার এসব চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হয়েছে। ‘মেক সাবসিডিজ অ্যান্ড সোশ্যাল প্রটেকশন ওয়ার্ক বেটার ফর দ্য পুওর’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে ব্যাংক খাতের সংস্কার, জ্বালানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সুশাসন জোরদার এবং কর-রাজস্ব বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ সংস্থাটির মতে, ভর্তুকি ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করা গেলে সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা বাড়বে এবং দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়নে তা আরো বেশি ভূমিকা রাখতে পারবে। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানির উচ্চমূল্য ও বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনার চাপে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কমছে। এর মধ্যে জ্বালানি আমদানি নির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতিও বাড়তি ঝুঁকিতে পড়ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। আগামী বছর তা কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশে নামতে পারে।
একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি আবার বাড়ার আশঙ্কা করেছে সংস্থাটি। বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে মেটাতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বাড়ে। এতে ডলারের চাহিদা, বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যয় এবং উৎপাদন খরচের ওপর চাপ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ে পণ্য ও সেবার দামে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরো বাড়িয়ে দিতে পারে।
আইএমএফ চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। অব্যাহত অর্থনৈতিক সংকট ও নানামুখী অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মুখে বিশ্বব্যাংক ও এডিবির পর এবার আন্তর্জাতিক এই সংস্থাও তাদের পূর্বাভাস সংশোধন করল। চলতি বছরের এপ্রিলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আইএমএফ পূর্বাভাস দিয়েছিল যে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সম্মেলন চলাকালে গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত সর্বশেষ ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনে এই নতুন প্রাক্কলন তুলে ধরা হয়।
আইএমএফের নতুন এই হিসাব বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সাম্প্রতিক পূর্বাভাসের চেয়েও কম। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক চিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, অঞ্চলটিতে প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও ৪ দশমিক ৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতি নিয়ে এই অঞ্চলে প্রবৃদ্ধির শীর্ষে রয়েছে ভারত। এর পরেই ভুটানের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৯ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। সংস্থাটির মতে, মালদ্বীপে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৮ শতাংশ (মূল্যস্ফীতি ২ দশমিক ৫ শতাংশ) এবং নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ (মূল্যস্ফীতি যথাক্রমে ৫ দশমিক ৮ ও ৫ দশমিক ৪ শতাংশ) হতে পারে।
এসব তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যাচ্ছে, সবচেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি (১০ দশমিক ৯ শতাংশ) ও সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি (৩ দশমিক ২ শতাংশ) নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ পেছনের সারিতে অবস্থান করছে। এদিকে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩.৬ শতাংশ সেখানে প্রবৃদ্ধি বাড়লেও অর্থনীতিতে কোন স্বস্তির খবর নেই। এশিয়ার কয়েকটি দেশের তুলনায় বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও কম। আইএমএফের হিসাবে, ২০২৬ সালে ভারতের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৭ শতাংশ, ভিয়েতনামের ৮ দশমিক ৪ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার ৫ দশমিক ১ শতাংশ এবং চীনের ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস নেপালের সমান, ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে বিভিন্ন দেশের অর্থবছর ও হিসাবের সময়সীমায় পার্থক্য থাকায় এসব পূর্বাভাস তুলনার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।
মূল্যস্ফীতি আবার বাড়ার আশঙ্কা : বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য আরো উদ্বেগের বিষয় মূল্যস্ফীতি। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা কমে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। কিন্তু ২০২৭ সালে আবার বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে।
এ পূর্বাভাস সত্য হলে আগামী বছর মূল্যস্ফীতি গত বছরের গড়কেও ছাড়িয়ে যাবে। অর্থাৎ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার উচ্চমূল্যের কারণে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বাড়লে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ও বাড়তে পারে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো সেই বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ পণ্যের দামে যুক্ত করলে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর খাদ্য, বাসস্থান, যাতায়াত ও চিকিৎসার ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
চলতি হিসাবে বাড়তে পারে ঘাটতি : আইএমএফের পূর্বাভাসে বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য নিয়েও উদ্বেগের ইঙ্গিত রয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের চলতি হিসাবের ভারসাম্য ছিল জিডিপির প্রায় শূন্য শতাংশ। ২০২৬ সালে তা ঘাটতিতে পড়ে জিডিপির শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে। ২০২৭ সালে ঘাটতি বেড়ে ২ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়ানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
চলতি হিসাবে ঘাটতি বাড়লে আমদানি ব্যয়, রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয় ও সেবা খাতের বৈদেশিক লেনদেনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে আমদানি বিল বাড়তে পারে, যা বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে চলতি হিসাবের ঘাটতির পূর্বাভাস থেকেই রিজার্ভ বা ডলারের বাজারে ঠিক কতটা চাপ তৈরি হবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এর জন্য রপ্তানি, প্রবাসী আয়, মূলধনি প্রবাহ এবং অন্যান্য বৈদেশিক লেনদেনের পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ।
জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে ঝুঁকি : আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে অপরিশোধিত তেলের গড় দাম ২০২৫ সালের তুলনায় ৪১ শতাংশ বেশি থাকতে পারে। প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বাড়তে পারে ৪৮ শতাংশ। বাংলাদেশের জন্য এর প্রভাব বহুমুখী। জ্বালানি আমদানিতে বেশি ডলার ব্যয় হলে অন্য পণ্য আমদানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়তে পারে।
জ্বালানি ব্যয় বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, পরিবহন ও কৃষির উৎপাদন খরচেও প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। অপরদিকে বৈশ্বিক চাহিদা দুর্বল হলে রপ্তানি আয়ের ওপরও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিআলো/অর্নব