ছবির ক্যাপশন: .
মো. আসিফ চৌধুরী, বিশেষ সংবাদদাতা
দীর্ঘদিনের ময়লা-আবর্জনার ভাগাড় থেকে সবুজে ঘেরা দৃষ্টিনন্দন এলাকায় রূপ নিয়েছে রাজধানীর প্রবেশপথ আমিনবাজার। পরিকল্পনা, সদিচ্ছা ও সম্মিলিত উদ্যোগ থাকলে পরিবেশের এমন ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, সরকারের উদ্যোগে একটি এলাকা পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব করে গড়ে তোলা গেলেও সেই অর্জন ধরে রাখার দায়িত্ব স্থানীয় জনগণকেও নিতে হবে।
রবিবার (১৮ অক্টোবর) দুপুরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের আমিনবাজারে গাছের চারা রোপণের মাধ্যমে মহাসড়কের দুই পাশে সবুজায়ন ও সৌন্দর্যবর্ধন কর্মসূচির উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, প্রায় দুই মাস আগে আমিনবাজার এলাকার যে অবস্থা ছিল, বর্তমানে সেখানে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘদিনের বর্জ্য ও দুর্গন্ধের পরিবেশ থেকে এলাকাটি এখন অনেক বেশি দৃষ্টিনন্দন হয়েছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্যও তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, পরিবেশের সৌন্দর্য ধরে রাখতে স্থানীয় জনগণকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি এলাকাবাসীর সহযোগিতা থাকলে পরিবেশদূষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যাগুলো ধীরে ধীরে সমাধান করা সম্ভব হবে।
আমিনবাজারকে ঘিরে নেওয়া উদ্যোগের জন্য ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমসহ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ শুধু একটি এলাকার চেহারা বদলায় না, মানুষের জীবনযাত্রার পরিবেশ উন্নয়নেও ভূমিকা রাখে।
প্রধানমন্ত্রী আমিনবাজারের আশপাশে ঢাকা জেলার আওতাধীন এলাকাগুলোতেও সবুজায়ন কার্যক্রম সম্প্রসারণের নির্দেশনা দেন। মহাসড়কের দুই পাশে থাকা মিল ও কারখানার মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে নির্দিষ্ট এলাকার পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব তাঁদের দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার পরামর্শ দেন তিনি।
এ ছাড়া যেসব স্থানে এখনো ময়লা-আবর্জনা জমে রয়েছে, সেসব স্থান চিহ্নিত করে পরিকল্পিতভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তারেক রহমান। এ কাজে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও সম্পৃক্ত হওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষ যেন নির্মল পরিবেশে বুকভরে শ্বাস নিতে পারে এবং প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে, সে লক্ষ্যেই সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের এ উদ্যোগকে দেশের অন্য ৬৩ জেলার জেলা প্রশাসকদের জন্য অনুসরণযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ উদ্যোগ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে অন্য জেলার প্রশাসকেরাও নিজ নিজ এলাকায় পরিবেশ উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য, ডাকসুর সাবেক ভিপি ও পাঁচবারের সংসদ সদস্য আমান উল্লাহ আমান এবং ঢাকা জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার ইরফান ইবনে আমান অমি।
বর্জ্যের স্তূপ সরিয়ে ৬ হাজার ৫৮৫টি গাছ:
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই দশক ধরে আমিনবাজারে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে ময়লা-আবর্জনা ফেলে প্রায় ৩০ ফুট উঁচু বর্জ্যের স্তূপ তৈরি হয়েছিল। গত জুলাই মাসে মানিকগঞ্জের সিংগাইরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বর্ষাকালীন মহড়া পরিদর্শনে যাওয়ার পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ওই ভাগাড়ের দুর্গন্ধ ও দুরবস্থা প্রত্যক্ষ করেন। পরে তিনি স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের তত্ত্বাবধানে সাভার উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভার সহযোগিতায় বর্জ্য অপসারণের কাজ শুরু হয়। প্রায় তিন মাসের প্রচেষ্টায় বিপুল পরিমাণ বর্জ্য সরানোর পর এলাকাটিকে সবুজায়নের উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়।
প্রকল্পের আওতায় জমি প্রস্তুত, মাটির সুরক্ষায় প্যালিসেডিং, পানি নিষ্কাশনের জন্য ২০টি সারফেস ড্রেন এবং সার্ভিস শেড নির্মাণ করা হয়েছে। মাটির ক্ষয়রোধে লাগানো হয়েছে নেপিয়ার, দুর্বা ও বিন্নাসহ বিভিন্ন প্রজাতির ঘাস।
প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ ও ১০ থেকে ২৫ মিটার চওড়া এ এলাকায় ১ হাজার ৫০টি নিমগাছ, ৩ হাজার ৮১৫টি সুপারি, ৬০টি তালগাছ, ৬৫০টি মাধবীলতা, ৪৫টি সিজিয়াম ও ৭০০টি রঞ্জনসহ মোট ৬ হাজার ৫৮৫টি গাছ ও শোভাবর্ধক উদ্ভিদ রোপণ করা হয়েছে।
পরিবেশবান্ধব অবকাঠামোর অংশ হিসেবে স্থাপন করা হয়েছে ২ কিলোওয়াটের সোলার প্যানেল ও ১ কিলোওয়াটের উইন্ড টারবাইন। এগুলোর মাধ্যমে মোট ৩ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা রয়েছে। রাতের আলোকসজ্জার জন্য স্থাপন করা হয়েছে ১২০টি বৈদ্যুতিক বাতি।
দীর্ঘদিনের বর্জ্যের ভাগাড়কে সবুজ বাগানে রূপান্তরের এ উদ্যোগ রাজধানীর অন্যতম প্রধান প্রবেশপথ আমিনবাজারের পরিবেশ ও সৌন্দর্য উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে এ পরিবর্তন স্থায়ী করতে নিয়মিত পরিচর্যা, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় জনগণের সচেতন অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
