আজকের দিনে যুদ্ধের প্রভাব আর মানচিত্রে আটকে থাকে না। এক দেশে বোমা পড়লে অন্য দেশের জলপথে জাহাজ আটকে যায়, আর তার ধাক্কায় আরেক মহাদেশে বাড়ে জ্বালানির দাম। সাধারণ মানুষের সংসারের হিসাব ওখানেই তালগোল পাকিয়ে যায়, যার রেশ গিয়ে পড়ে প্যারিস, মার্সেই, লিয়ঁ ও লিমোজোর মতো শহরের রাজপথে। ফ্রান্সের সাম্প্রতিক অস্থিরতা তাই কোনো একটি দেশের বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; আন্তর্জাতিক যুদ্ধ, দেশের ঋণসংকট, ভেঙে পড়া নাগরিক সেবা আর রাজনৈতিক আস্থাহীনতা কীভাবে একসঙ্গে বড় বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে, এটি তারই উদাহরণ।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে ফরাসি সংকটের একমাত্র কারণ বানানোও ভুল হবে। যুদ্ধ এই ক্ষোভ সৃষ্টি করেনি। যুদ্ধ আগে থেকে জমে থাকা ক্ষোভে জ্বালানি ঢেলেছে। আগুনের উৎস ফরাসি রাষ্ট্রের ভেতরেই ছিল।
আন্দোলনের শুরু কোনো অভিবাসনবিরোধী বিদ্রোহ অথবা হঠাৎ সংঘটিত রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র থেকে হয়নি। সেপ্টেম্বর মাসে প্যারিসের উপকণ্ঠ ক্রোতেইয়ের একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট ও শিক্ষার নিম্নমানের প্রতিবাদ থেকে এর সূচনা। মাত্র দশ দিনের মধ্যে আন্দোলনটি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। অক্টোবরের শুরুতে এক হাজারের বেশি বিদ্যালয়, অর্থাৎ ফ্রান্সের প্রায় প্রতি চারটি বিদ্যালয়ের একটি, কোনো না কোনোভাবে প্রতিবাদে যুক্ত হয়েছিল। বিবিসি ও ল্য মোঁদের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে দীর্ঘ শিক্ষাদিবস, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষকস্বল্পতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অস্বচ্ছ ব্যবস্থা নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের কথা। কোথাও কোথাও শিক্ষক অনুপস্থিত থাকায় শিক্ষার্থীরা মাসের পর মাস প্রয়োজনীয় পাঠ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
একটি ধনী রাষ্ট্রের শিক্ষার্থীরা যখন বিদ্যালয়ে শিক্ষক পাওয়াকে রাজনৈতিক দাবি হিসেবে রাস্তায় তুলতে বাধ্য হয়, তখন সংকটটি আর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সেটি রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের নৈতিক সংকটে পরিণত হয়।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরে যুক্ত হন শিক্ষক, অভিভাবক, শ্রমিক, ট্রেড ইউনিয়ন, কৃষক, বামপন্থি কর্মী এবং ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের পুরোনো অংশগ্রহণকারীরা। শিক্ষার সংকট মিশে যায় জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, স্থবির মজুরি, কমতে থাকা ক্রয়ক্ষমতা এবং সরকারি সেবার অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা বৃহত্তর অসন্তোষে। ১৭ অক্টোবরের কর্মসূচিতে সরকারের হিসাবে প্রায় পাঁচ লাখ পঞ্চাশ হাজার এবং আয়োজকদের হিসাবে প্রায় আট লাখ মানুষ অংশ নেন। শুধু প্যারিসেই অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় এক লাখ দশ হাজার। অধিকাংশ মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করেছেন।
কিন্তু টেলিভিশনের পর্দায় লাখো শান্তিপূর্ণ মানুষের দাবি যতটা জায়গা পায়নি, তার চেয়ে বেশি জায়গা পেয়েছে পোড়া গাড়ি, লুট হওয়া দোকান এবং ধসে পড়া লিমোজ নগর ভবনের ঘড়ির মিনার। গণতন্ত্রে ক্যামেরারও নিজস্ব রাজনৈতিক অর্থনীতি আছে। একটি প্ল্যাকার্ডের চেয়ে একটি জ্বলন্ত ভবন অনেক বেশি আকর্ষণীয় ও বিক্রয়যোগ্য।
শান্তিপূর্ণ মিছিলের পাশাপাশি মুখোশধারী সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী সরকারি ভবন, পুলিশ স্থাপনা, দোকান ও যানবাহনে হামলা চালায়। সুযোগসন্ধানী লুটেরারাও বিশৃঙ্খলার সঙ্গে যুক্ত হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় আগুন ও লুটের পরিচয়। দুটিকে আলাদা রাখা জরুরি। লাখো মানুষের প্রতিবাদকে কয়েক হাজার সহিংস ব্যক্তির কর্মকাণ্ড দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা যেমন অসৎ, তেমনি সামাজিক ক্ষোভের নামে নগর ভবন পোড়ানো ও দোকান লুটকে বৈধতা দেওয়াও বিপজ্জনক। একটি জনপদ পুড়িয়ে শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠন করা যায় না। একটি দোকান লুট করে মূল্যস্ফীতি কমানো যায় না। আগুন রাজনৈতিক বক্তব্য হতে পারে, কিন্তু কোনো কার্যকর জননীতি তৈরি করতে পারে না।
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যর্থতাও ছিল স্পষ্ট। প্রায় ষাট হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের পরও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লঁর নুনেজ স্বীকার করেছেন, কয়েকটি বড় শহরে পুলিশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল। গোয়েন্দা তথ্য ও পূর্বপ্রস্তুতির ঘাটতির দায় নিয়ে তিনি পদত্যাগের প্রস্তাব দেন। প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ পদত্যাগ গ্রহণ না করে তাকে দায়িত্বে রেখেছেন এবং ব্যর্থতার কারণ প্রকাশ ও নতুন কৌশল তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। সপ্তাহান্তে দুই হাজার তিনশর বেশি মানুষকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। প্রায় এক হাজার পুলিশ ও জাঁদার্ম আহত হয়েছেন বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। পুলিশের ব্যবহৃত ভিড় নিয়ন্ত্রণকারী গ্রেনেডে একজন বিক্ষোভকারীর হাত বিচ্ছিন্ন হওয়ার অভিযোগও উঠেছে। কোথাও পুলিশ যথাসময়ে উপস্থিত ছিল না, আবার কোথাও তার উপস্থিতি প্রশ্নবিদ্ধভাবে সহিংস ছিল।
ফরাসি রাষ্ট্রের সক্ষমতার বৈপরীত্যটি দুটি সংখ্যায় ধরা পড়ে। সরকার শিক্ষকসংকট মোকাবিলায় তিন হাজার অতিরিক্ত বিকল্প শিক্ষক দেওয়ার ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে এক দিনের বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে নামিয়েছে ষাট হাজার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সদস্য। সংখ্যাদুটি সরাসরি তুলনাযোগ্য নয়, কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ার রাজনৈতিক ভাষা স্পষ্ট। শ্রেণিকক্ষের সংকটে প্রতিশ্রুতি আসে ধীরে, অথচ রাস্তার সংকটে রাষ্ট্র পৌঁছে যায় ঢাল, জলকামান ও কাঁদুনে গ্যাস নিয়ে। শিক্ষক দেওয়ার সময় যে রাষ্ট্রের বাজেট সংকুচিত, বিক্ষোভ দমনে তার নিরাপত্তা প্রস্তুতি যথেষ্ট উদার।
এখানেই বৈশ্বিক যুদ্ধের সঙ্গে ফরাসি সংকটের সংযোগ। হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশ্ববাজারে তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে। ফরাসি সরকারও স্বীকার করেছে, আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রভাব জ্বালানির ঐতিহাসিক মূল্যবৃদ্ধি এবং সাধারণ নাগরিকের জীবনযাত্রায় পড়ছে। জি সেভেন দেশগুলো কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর অর্থ সংকটটি কল্পিত নয়। আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় বাস্তব চাপ রয়েছে।
কিন্তু আন্তর্জাতিক যুদ্ধ দাম বাড়ালেও সেই দাম সমাজের কোন শ্রেণি কতটা বহন করবে, তা নির্ধারণ করে জাতীয় সরকার। একজন ধনী নাগরিক ও একজন নিম্ন আয়ের কর্মী একই পাম্প থেকে একই দামে জ্বালানি কিনতে পারেন। একজনের জন্য মূল্যবৃদ্ধি ভ্রমণ পরিকল্পনায় সামান্য পরিবর্তন, অন্যজনের জন্য কর্মস্থলে যাওয়া, ঘর গরম রাখা এবং সন্তানকে খাওয়ানোর মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নেওয়ার নির্বাচন। যুদ্ধ অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে, আর রাষ্ট্রীয় নীতি সেই চাপের সামাজিক বণ্টন নির্ধারণ করে। ঝড় সৃষ্টি করা সরকারের কাজ না হলেও নাগরিকের ঘরের ছাদ শক্ত রাখা সরকারের দায়িত্ব।
আধুনিক যুদ্ধের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য হলো, সিদ্ধান্ত ও ব্যয় একই জায়গায় থাকে না। যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেন কয়েকজন রাষ্ট্রনায়ক ও সামরিক কৌশলবিদ। তার মূল্য দেন বাসচালক, শিক্ষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী এবং মাসের শেষে হিসাব মেলাতে না পারা পরিবার। তারা বোমার শব্দ শোনেন না, বাজারের রসিদে যুদ্ধের প্রতিধ্বনি পড়েন।
ফ্রান্সের পরিস্থিতি একই সঙ্গে একটি আর্থিক সংকট। সরকারি ঋণের চাপ বাড়ছে, অর্থনীতি দুর্বল এবং বাজেট নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন তীব্র। অস্থিরতার পর ফরাসি শেয়ারবাজারে পতন ও সরকারি বন্ডের সুদের হার বৃদ্ধি দেখিয়েছে, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা কত দ্রুত আর্থিক ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে। জনসেবা উন্নত করতে অর্থ প্রয়োজন, আবার ঋণ কমাতে ব্যয়সংকোচন দরকার। ব্যয় কমালে ক্ষোভ বাড়বে, ব্যয় বাড়ালে বাজার ও ঋণদাতাদের উদ্বেগ বাড়বে। প্যারিস এখন একই সঙ্গে নাগরিক ও বন্ডবাজারকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। দুর্ভাগ্য হলো, বন্ডবাজার ভোট দেয় না, কিন্তু সরকারের ওপর তার প্রভাব প্রায়ই ভোটারের চেয়ে বেশি।
২০১৮ ও ২০১৯ সালের ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের সময় সরকার বড় অর্থনৈতিক ছাড় দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। এবার সেই আর্থিক অবকাশ অনেক সংকীর্ণ। তাই বর্তমান সংকট মোকাবিলায় কেবল ভর্তুকি কিংবা সাময়িক অনুদান যথেষ্ট হবে না। ফ্রান্সকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তার সামাজিক রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি এখনও কার্যকর থাকবে, নাকি নিরাপত্তা রাষ্ট্র ধীরে ধীরে কল্যাণ রাষ্ট্রের জায়গা নেবে।
এই সংঘাতের আরেকটি স্তর ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ম্যাক্রোঁ আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। তার ক্ষমতার শেষ মাসগুলোতে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব দুর্বল দেখালে রাজনৈতিক সুবিধা পাবে দুই প্রান্ত। মেরিন লো পেনের জাতীয়তাবাদী ডানপন্থা আইনশঙ্কার সংকটকে রাষ্ট্রের পতনের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করবে। জঁ লুক মেলঁশোঁর কট্টর বামপন্থা সামাজিক ক্ষোভকে ম্যাক্রোঁ যুগের বৈষম্যমূলক অর্থনীতির বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ হিসেবে তুলে ধরবে।
মধ্যপন্থি রাজনীতির সংকট এখানেই। তার কাছে হিসাব আছে, কিন্তু মানুষের ক্ষোভ ধারণ করার ভাষা ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে। ডানপন্থা বলছে রাষ্ট্র যথেষ্ট কঠোর নয়। কট্টর বাম বলছে রাষ্ট্র কঠোর, কিন্তু ন্যায়সংগত নয়। আর মধ্যপন্থা বলছে, অংশীজনদের নিয়ে বৈঠক করে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তৈরি করা হবে। আগুন যখন রাস্তায়, তখন কমিটির ভাষা সাধারণত খুব বেশি রাজনৈতিক উষ্ণতা তৈরি করতে পারে না।
ফ্রান্সে তরুণদের আন্দোলন ঐতিহাসিকভাবে সরকারকে উদ্বিগ্ন করে। ১৯৬৮ সালের স্মৃতি এখনও দেশটির রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে জীবিত। তরুণদের আন্দোলনের নির্দিষ্ট নেতা ও স্থায়ী কাঠামো প্রায়ই থাকে না। ফলে সরকারের পক্ষে আলোচনার জন্য একটি কেন্দ্র খুঁজে পাওয়া কঠিন। একই সঙ্গে পুলিশের হাতে কোনো শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হলে জনমত খুব দ্রুত সরকারের বিরুদ্ধে চলে যেতে পারে। বর্তমান আন্দোলনের শুরুতে পুলিশের কঠোর আচরণ ও হাজার হাজার গ্রেপ্তার নিয়ে যে সমালোচনা উঠেছিল, সেটিও পরবর্তী ক্ষোভকে তীব্র করেছে। রাষ্ট্র যখন প্রতিটি স্কুলগেটকে নিরাপত্তা সমস্যা হিসেবে দেখতে শুরু করে, শিক্ষার্থীরাও রাষ্ট্রকে শিক্ষক সরবরাহকারী নয়, বরং নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি হিসেবে দেখতে শেখে।
এই আন্দোলন তাই সামাজিক ও প্রজন্মগত বিদ্রোহ। তরুণেরা শুধু বিদ্যালয়ের ভাঙা দেয়াল নিয়ে ক্ষুব্ধ নয়। তারা এমন একটি ভবিষ্যৎ নিয়ে অসন্তুষ্ট, যেখানে শিক্ষার মান কমছে, আবাসন ব্যয় বাড়ছে, চাকরির নিশ্চয়তা দুর্বল হচ্ছে এবং রাষ্ট্র তাদের কাছে ধৈর্য চাইছে, অথচ সেই ধৈর্যের বিনিময়ে বিশ্বাসযোগ্য সামাজিক প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে না। একটি প্রজন্ম যখন ভবিষ্যৎকে সুযোগের বদলে ক্রমাগত সংকোচনের তালিকা হিসেবে দেখে, তখন শ্রেণিকক্ষের ক্ষোভ রাষ্ট্রের প্রতি অনাস্থায় পরিণত হয়।
ফ্রান্সের অস্থিরতা তাই মূলত সামাজিক চুক্তির সংকট। ফরাসি প্রজাতন্ত্র নাগরিককে উচ্চ করের বিনিময়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা এবং মর্যাদাপূর্ণ নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এখন বহু নাগরিকের অনুভূতি হলো, তারা কর দিচ্ছেন, কিন্তু বিনিময়ের প্রতিশ্রুতি ক্রমে দুর্বল হচ্ছে। রাষ্ট্র যখন সামাজিক সেবা কমায় এবং একই সঙ্গে নিরাপত্তা উপস্থিতি বাড়ায়, তখন নাগরিকের কাছে রাষ্ট্রের পরিচয় বদলে যায়। সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
ম্যাক্রোঁ শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের দাবি এবং সহিংস গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড আলাদা করে দেখেছেন। এটি প্রয়োজনীয়। কিন্তু ভাষাগত পার্থক্য যথেষ্ট নয়। সরকারকে নীতিতেও পার্থক্যটি দেখাতে হবে। লুটেরার বিচার যেমন প্রয়োজন, তেমনি শিক্ষকসংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারি সেবার অবক্ষয়ের বিশ্বাসযোগ্য সমাধানও প্রয়োজন। শুধু গ্রেপ্তার করে রাস্তা খালি করা যায়, কিন্তু রাজনৈতিক শূন্যতা খালি করা যায় না।
সহিংসতার পর রাষ্ট্র যদি শুধু নিষেধাজ্ঞা, নজরদারি ও কঠোর পুলিশি ব্যবস্থার দিকে যায়, সাময়িক শৃঙ্খলা ফিরতে পারে। তবে তার বিনিময়ে গণতান্ত্রিক বৈধতা আরও ক্ষয় হবে। আবার সামাজিক ক্ষোভের প্রতি সহানুভূতির নামে অগ্নিসংযোগ ও লুটকে ছোট করে দেখলে রাজনৈতিক প্রতিবাদের নৈতিক ভিত্তি ধ্বংস হবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে একই সঙ্গে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ এবং যে অসন্তোষকে সহিংস গোষ্ঠী ব্যবহার করছে, তার রাজনৈতিক উত্তর দিতে হয়। শুধু প্রথমটি করলে রাষ্ট্র কর্তৃত্ববাদী হয়। শুধু দ্বিতীয়টির কথা বলে প্রথমটি উপেক্ষা করলে রাষ্ট্র অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফ্রান্স এখন এই দুই ব্যর্থতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে।
সংকটটির ভূরাজনৈতিক তাৎপর্যও গভীর। ইউরোপ যখন ইউক্রেন, মধ্যপ্রাচ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা ও সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির চাপে রয়েছে, তখন তার ভেতরের সামাজিক সংহতি দুর্বল হচ্ছে। একটি রাষ্ট্র বাইরে কৌশলগত শক্তি প্রদর্শন করতে পারে, কিন্তু ভেতরে যদি শিক্ষক, শ্রমিক ও শিক্ষার্থী মনে করেন তাদের জীবন ক্রমাগত অনিরাপদ হচ্ছে, তবে সেই শক্তির ভিত্তি ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। সামরিক শক্তি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা পরস্পরের বিকল্প নয়। নাগরিকের আস্থা ছাড়া ভূরাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
ফ্রান্সের রাস্তায় তাই শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে না; দেখা যাচ্ছে এমন এক ইউরোপের সংকট, যে বিশ্বরাজনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে চায়, কিন্তু সেই ভূমিকার অর্থনৈতিক মূল্য নিজের নাগরিকদের কাছে ন্যায়সংগতভাবে ব্যাখ্যা ও বণ্টন করতে পারছে না। যুদ্ধ দূরে ঘটলেও তার রাজনৈতিক বিস্ফোরণ ঘরের ভেতর হতে পারে। মানুষ অনির্দিষ্টকাল এমন একটি ব্যবস্থা সমর্থন করে না, যেখানে সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক, মুনাফা ব্যক্তিগত এবং ক্ষতি সামাজিক।
ফরাসি সরকারের সামনে তাই শুধু দাঙ্গা থামানোর কাজ নেই। তাকে প্রমাণ করতে হবে, প্রজাতন্ত্র এখনও নাগরিকের কথা আগুন জ্বলার আগেই শুনতে সক্ষম। রাষ্ট্রের শক্তি কতজনকে গ্রেপ্তার করা যায় সেই সংখ্যায় পরিমাপ করা যায় না। রাষ্ট্রের শক্তি বোঝা যায় কতজন মানুষকে সে বিশ্বাস করাতে পারে যে বিদ্যালয়ে শিক্ষক, জীবনে নিরাপত্তা এবং রাজনীতিতে মর্যাদা পাওয়ার জন্য তাদের শহর পোড়াতে হবে না।
যে রাষ্ট্র নাগরিকের কণ্ঠ শোনার আগে কাঁদুনে গ্যাসের শব্দ শোনে, সে হয়তো রাস্তার নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়; কিন্তু ধীরে ধীরে হারায় রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিক অধিকার।
ড. লুবনা ফেরদৌসী: যুক্তরাজ্য প্রবাসী শিক্ষক, গবেষক ও সমাজবিশ্লেষক। ই-মেইল: lferdowsi@yahoo.com
