২০০২ সালের ১ মার্চ থেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার আইন করে সারা দেশে পরিবেশ সুরক্ষায় পলিথিনের উৎপাদন, বিপণন ও বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ করে। এরপর দুযুগ পরিয়ে গেছে। তারপরেও পলিথিন নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। বিশেষ করে ক্রেতা বিক্রেতাদের অনীহার কারণেই পরিবেশ ধ্বংসকারী এই পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ করা যায়নি।
বেশির ভাগ ক্রেতা বাজারে যান ব্যাগ ছাড়াই। তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই পলিথিন রাখতে হয় সব মাছ ও সবজির দোকানগুলোতে। পাশাপাশি মুদি দোকান থেকে শুরু করে আলু-পেঁয়াজ, মাছ-মাংস, সবজি ও অন্যান দোকানসহ প্রায় সব ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, যেখানে ব্যাগের প্রয়োজন সেখানেই নিষিদ্ধ পলিথিনে সয়লাব। এর মধ্যে রয়েছে হাতলসহ ও হাতল ছাড়া পলিথিন ব্যাগ। প্রকাশ্যেই আইন ভঙ্গ করে ব্যবসায়ী ও ব্যবহারকারীরা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছেন। বিভিন্ন শপিংমল থেকে শুরু করে ফুটপাত ও মার্কেট গুলোতেও প্রচলিত আইনকে তোয়াক্কা না করে প্রকাশ্যে পলিথিন ব্যবহার করে চলেছেন। অথচ দেখার যেন কেউ নেই। তাই আশঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলেছে অপচনশীল নিষিদ্ধ পলিথিনের ব্যবহার।
নজরদারি না থাকায় নিষিদ্ধ সত্ত্বেও সব নগর-শহর বাজার এমনকি মহল্লাতেও অবাধে পলিখিন বিক্রি ও ব্যবহার হচ্ছে। ফলে চরম হুমকির মুখে পড়েছে পরিবেশ। ব্যবহৃত ওইসব পলিথিনের আশ্রয়স্থল হচ্ছে ময়লার ভাগাড় ও জলাশয়। এসব পলিথিন শেষ পর্যন্ত মাটি ও পানির সঙ্গে মিশে পরিবেশের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় তৈরি করেছে। এসব পলিথিন পুড়িয়ে ফেলার কারণেও পানি, বায়ু ও মাটি দূষিত হচ্ছে। সরেজমিন উপজেলার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, মুদি দোকান, কাঁচাবাজার, মাছের বাজারসহ সর্বত্রই নিষিদ্ধ ছোট, বড়, মাঝারি পলিথিন ব্যাগের ছড়াছড়ি।
পলিথিন ও প্লাস্টিকের বিস্তার ঠেকাতে উৎপাদনকারী অবৈধ কারখানাগুলো বন্ধ করা এবং কাঁচাবাজারে পলিথিনের ব্যবহার শূন্যে নামিয়ে আনতে নিয়মিত নজরদারি করা হচ্ছে। এ ছাড়া পানিতে ভেসে আসা প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্রের তলদেশ ও উপকূলে জমা হওয়ার কারণে মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনের প্রবাল প্রাচীর। এসংকট নিরসনে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এ প্রসঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বলেন, দেশব্যাপী নিষিদ্ধ পলিথিনের উৎপাদন, পরিবহন, বিপণন ও ব্যবহার বন্ধ করতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা জোরদার ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। পরিবেশ রক্ষায় এটি জোরালোভাবে অব্যাহত থাকবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞার পরেও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাট-বাজারে নিষিদ্ধ পলিথিনের ব্যবহার বাড়ছে। মুদিদোকান, কাঁচাবাজার, মাছের আড়ত ও ফলের দোকানে পলিথিন ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব বিভাগ ও সংস্থাকে তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের জন্য কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্যের উপর পলিথিনের ক্ষতিকর প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে সরকার ২০০২ সালে আইন করে পলিথিন শপিং ব্যাগের উৎপাদন, ব্যবহার, বিপণন ও বাজারজাতকরণের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। দলমত নির্বিশেষে দেশের সর্বস্তরের জনগণ তা সানন্দে গ্রহণ করে। এই আইন বাস্তবায়নের ফলে পরিবেশের উপর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করে। কিন্তু বর্তমানে সারা দেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত পলিথিনের ব্যবহার দেখে মনে হচ্ছে পরিবেশ অধিদপ্তর হয়তো ভুলেই গেছে যে, আইন অনুযায়ী বাংলাদেশে পলিথিন উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ এবং সেই আইন বাস্তবায়নের দায়িত্ব তাদেরই। পরিবেশ অধিদপ্তরের নিষ্ক্রিয়তায় বর্তমানে পলিথিন নিষিদ্ধের আইনটি সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী মো. আবদুস সোবহান জানান, রাজধানীসহ সারা দেশে নিষিদ্ধ পলিথিন তৈরির প্রায় এক হাজার তিশত বা তারও বেশি কারখানা রয়েছে। এগুলোর বেশীর ভাগই পুরান ঢাকা কেন্দ্রিক। পুরান ঢাকার অলি-গলিতে রয়েছে প্রায় তিন শত কারখানা। কেরানীগঞ্জ, জিঞ্জিরা, কামরাঙ্গীরচর, মিরপুর, কারওয়ান বাজার, তেজগাঁও, টঙ্গীতে ছোট-বড় বেশ কিছু কারখানা রয়েছে। যাত্রাবাড়ী থেকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা পর্যন্ত বুড়িগঙ্গার পাড় ঘেঁষে গড়ে উঠেছে শতাধিক কারখানা। ঢাকার পলিথিন ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে একাধিক প্রভাবশালী সিন্ডিকেট রয়েছে।
ঢাকা ও আশপাশের এলাকা ছাড়াও চট্রগ্রামসহ জেলা শহরগুলোতে গড়ে উঠেছে শত শত পলিথিন কারখানা। পলিথিন বাজারজাতকরণে পরিবহন সিন্ডিকেট নামে আরেকটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে। ‘জরুরি রপ্তানি কাজে নিয়োজিত’ লেখা ট্রাকে করে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হচ্ছে নিষিদ্ধ পলিথিন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, নাফ নদীর মোহনা ও টেকনাফ এবং আশপাশের দেশের উপকূলীয় এলাকা থেকে বর্জ্য আসছে। মাছ ধরার নৌকা, জাহাজ ও সমুদ্রে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক স্রোতে ভেসে দ্বীপে পৌঁছাচ্ছে। পর্যটক, স্থানীয় বাসিন্দা ও মাছ ধরতে ব্যবহারের প্লাস্টিকও সমুদ্র সৈকতে জমা হচ্ছে।
তারা বলেন, সেন্ট মার্টিন বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ। সেখানে প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, খাবারের প্যাকেট ও অন্যান্য বর্জ্য জমে থাকা সামুদ্রিক পরিবেশের জন্য গুরুতর হুমকি। এসব বর্জ্য সমুদ্রের ঢেউ ও স্রোতের মাধ্যমে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছড়াচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সংকট নিরসনে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কাজ করছে সরকার। পর্যটন নিয়ন্ত্রণে কঠোর নির্দেশনা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সরকারের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে সমুদ্র সৈকতে রাতে আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দে গান বাজানো, বারবিকিউ পার্টি করা, কেয়া বনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ বা সামুদ্রিক প্রাণী কচ্ছপ, পাখি, প্রবাল, তারা মাছ ক্ষতি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. তানভীর আহমেদ বলেন, পরিবেশ সুরক্ষায় পলিথিনের উৎপাদন বন্ধ করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের জোরালো ভূমিকা রাখা দরকার। এ ছাড়া স্থানীয় সরকারের অধীনে থাকা সংস্থাগুলো পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য যথাযথভাবে সংগ্রহ করলে পরিবেশের জন্য সুফল বয়ে আনবে।
ড. তানভীর আরো বলেন, গরু, ছাগল, কচ্ছপ, মাছ ও সামুদ্রিক পাখি প্লাস্টিক খেতে পারে। এতে তাদের অপুষ্টি, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। বায়ুদূষণ ও জলবায়ুর ওপর এসবের প্রভাব পড়ে। এ ছাড়া পলিথিন ও প্লাস্টিক পোড়ানোর ধোঁয়ায় ক্ষতিকর গ্যাস ও কণা থাকতে পারে। এই ধোঁয়া শ্বাসনালিতে জ্বালা, কাশি এবং শ্বাসকষ্ট সৃষ্টি করতে পারে। প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে ক্ষুদ্র কণা ও কিছু রাসায়নিক পরিবেশে ছড়িয়ে খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করতে পারে। পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্যে পরিবেশদূষণ, নালা-নর্দমা বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতা, মাটি ও পানির গুণগত মান নষ্ট হওয়া এবং জলজ প্রাণীর ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ছে।
এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্যরে বিস্তার ঠেকাতে এটি ব্যবহারের পরিবর্তে বিকল্প ব্যাগ তৈরি করা প্রয়োজন। এ ছাড়া পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণে সংশ্লিষ্টদের কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। পলিথিন বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান আরো জোরদার ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, পলিথিনের পরিবর্তে কাপড়, পাট বা বারবার ব্যবহারযোগ্য ব্যাগ ব্যবহার করা প্রয়োজন। প্লাস্টিকের বোতলের পরিবর্তে নিরাপদ ও পরিষ্কার কাচ বা স্টেইনলেস স্টিলের বোতল ব্যবহার করা উচিত। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বোতল বারবার ব্যবহার না করা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।
বিআলো/অর্নব