জুলাই সনদের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) আয়োজিত মুক্ত আলোচনায় সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা।
বক্তারা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা, রাষ্ট্র সংস্কার এবং গণভোটের রায় কার্যকর না করে সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে। শেখ হাসিনার পতনের উদাহরণ টেনে নেতারা সরকারকে সতর্ক করে বলেন, জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করলে পরিণাম কী হয়, তা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত।
রবিবার (১৮ অক্টোবর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে “জুলাই সনদের এক বছর: প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশার সালতামামি” শীর্ষক এই মুক্ত আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিএনপি ৫ আগস্ট পর্যন্ত মজলুম ছিল, কিন্তু এরপর তারা দ্রুত অতীতের কথা ভুলে গেছে। জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে।
তিনি বলেন, বিএনপি বদলে গেলেও আমরা বদলাব না। জুলাই সনদ ও গণভোট বাস্তবায়ন করেই ছাড়ব। এই সরকার বিরোধী দলের সহযোগিতা পাবার যোগ্য নয়, আজ থেকে সরকারকে নয় ১৮ কোটি মানুষকে সহযোগিতা করবে বিরোধী দল।
তিনি আরো বলেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে এবং বিরোধী দলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত করা রাষ্ট্রের জন্য অপরাধ। তার মতে, এই আন্দোলন শুধু ১১ দলের নয়, বরং ফ্যাসিবাদের পথ রুদ্ধ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার আন্দোলন।
এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার যোবায়ের আহমেদ ভূইয়ার সঞ্চালনায় দলের চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু সভায় সভাপতিত্ব করেন।
বক্তব্যে মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, সরকারের মুখে অক্ষরে অক্ষরে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আশ্বাস শুনতে শুনতে জাতি বিরক্ত হয়ে গেছে। সরকার এত দ্রুত প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসবে, আমরা তা কল্পনাও করিনি।
তিনি বলেন, বিএনপি নিজেরাই দাবি করেছে, জুলাইয়ে তাদের ৮৪৮ জন কর্মী শহীদ হয়েছেন। শহীদদের রক্ত ও জীবনের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই সরকারের উচিত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা।
তিনি আরো বলেন, শেখ হাসিনা জাতির সঙ্গে প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করার পরিণতি ভোগ করেছেন; বিএনপিরও সেই ভুল করা উচিত হবে না। জুলাই সনদে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব ও সাত দফা অঙ্গীকার রয়েছে, যার অনেক কিছুই বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অথচ ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি এমন আচরণ করছে, যেন জুলাই সনদ তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম বলেন, সরকারকে বুঝতে হবে জনগণ কী চায়। প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা রাজনৈতিক নেতৃত্বের নৈতিক দায়িত্ব। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন কার্ড বিতরণ নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা তৈরি করে, অথচ নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখছে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির শায়খুল হাদিস আল্লামা মামুনুল হক বলেন, জুলাই সনদ বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলিল এবং রাষ্ট্র মেরামতের রূপরেখা। রাষ্ট্র সংস্কারে ব্যর্থতার কারণেই ছাত্র-জনতা গণঅভ্যুত্থানে এগিয়ে এসেছিল।
তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপি জুলাই সনদ ও গণভোটের রায়ের ক্ষেত্রে দ্বৈত অবস্থান নিয়েছে,সরকার গঠনের ফলাফল মেনে নিলেও গণভোটের রায় উপেক্ষা করছে। তিনি বলেন, জুলাই সনদ কার্যকর করতেই হবে; অন্যথায় সংবিধান সংস্কার নিয়ে সংকট আরও গভীর হবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আব্দুল্লাহ এমপি বলেন, জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপি জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছে এবং সনদের একাধিক ধারা লঙ্ঘন করেছে। তার মতে, সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি ছিল সংস্কারের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য।
তিনি বলেন, জুলাই সনদবিহীন চলা মানে ফিটনেসবিহীন গাড়িতে ওঠা। তার অভিযোগ, সরকার রাষ্ট্রকে জনকল্যাণের পরিবর্তে ব্যবসায়িক স্বার্থের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জুলাই সনদের মৌলিক চেতনা উপেক্ষা করে রাষ্ট্র পরিচালনা করলে নতুন রাজনৈতিক সংকট তৈরি হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, ২০২৪ সালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লিখিত রাজনৈতিক দলিল হলো জুলাই সনদ। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠন এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এর মৌলিক উদ্দেশ্য।
তিনি বলেন, জুলাই সনদে স্বাক্ষর ও গণভোটের মাধ্যমে সংস্কারের প্রশ্নে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হয়েছে; এখন প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে তা বাস্তবায়ন করা। সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুললেই সংবিধানের দোহাই দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। রাজনৈতিক সংকটের সমাধান রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে এবি পার্টি প্রস্তুত।
আলোচনা সভায় আরো বক্তব্য রাখেন এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আব্বাস ইসলাম খান নোমান।
