সমুদ্র উপকূলবর্তী বাদুরতলা গ্রামে কান পাতলেই শোনা যায় কান্নার শব্দ। বুকফাটা আহাজারি। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি—একই দৃশ্য। কোথাও স্বামী হারানোর শোক, কোথাও বাবা হারানোর কষ্ট, কোথাও প্রিয়জনের অপেক্ষা। যেন একেকটি ঝড় শুধু কয়েকটি জীবন কেড়ে নেয়নি, রেখে গেছে দীর্ঘদিনের শূন্যতা। সেই শূন্যতার ছায়া আজও ঘুরে বেড়ায় গ্রামটির পথে-ঘাটে, মানুষের মুখে মুখে।
বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার সদর ইউনিয়নের এই গ্রামটির অনেক মানুষই জীবিকার জন্য সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল। মাছ ধরতে গিয়ে তাদের দিনের পর দিন কাটে উত্তাল সাগরে। কখনো ইলিশের আশায়, কখনো জীবিকার তাগিদে। সমুদ্র তাদের কাছে যেমন জীবনের অবলম্বন, তেমনি মৃত্যুরও এক ভয়ংকর ঠিকানা।
২০১৮ সালের ২১ জুলাই; দিনটির কথা উঠতেই বাদুরতলা গ্রামের বাতাস যেন ভারী হয়ে আসে। সেদিন সমুদ্রগামী একটি বড় ট্রলারে ছিলেন ১৮ জন জেলে। তাদের মধ্যে ১০ জন জীবিত ফিরতে পেরেছিলেন। বাকিরা আর ফেরেননি।
বঙ্গোপসাগরের সেই ভয়ংকর ঝড়ে নিখোঁজ হন ৩০ বছর বয়সী মো. মাসুম মিয়া, ৩৭ বছর বয়সী মো. হিরু মিয়া, ৪০ বছর বয়সী হানিফা, ৪২ বছর বয়সী কবির মিয়াসহ আরও কয়েকজন। নিখোঁজ হওয়া আটজনই ছিলেন এই গ্রামের মানুষ—কারও সঙ্গে কারও ছিল আত্মীয়তার সম্পর্ক, কেউ ছিলেন প্রতিবেশী। ফলে একজনের খোঁজ নিতে গেলে সামনে পড়ে আরেকটি শোকাহত পরিবার। প্রত্যেক বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় অপেক্ষারত মুখ। স্বজনেরা আজও পথ চেয়ে আছেন—হয়তো কোনো একদিন ফিরে আসবেন তারা। কিন্তু দিন গড়িয়েছে, মাস পেরিয়েছে, বছর চলে গেছে। আট বছর পেরিয়েও সেই স্বজনদের অনেকেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি।
এসব পরিবারের মানুষের মুখে বারবার শোনা গেল একজনের কথা—তোতা মিয়া। সেই ডুবে যাওয়া ট্রলার থেকে যিনি জীবিত ফিরে এসেছিলেন। মৃত্যুর এত কাছে গিয়েও কীভাবে তিনি ফিরে এলেন, সেই গল্প যেন বাদুরতলা গ্রামের মানুষের কাছে আজও এক বিস্ময়!
তোতা মিয়া আট বছর আগেও পেশাদার জেলে ছিলেন। সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে জীবনের দীর্ঘ সময় মাছ ধরেছেন। উত্তাল সাগর, কালো মেঘ, ঝড়ো বাতাস—এসব তার কাছে নতুন ছিল না। কিন্তু সেই ২১ জুলাইয়ের ঝড় ছিল অন্য রকম। সেই ঝড় তাকে শুধু মৃত্যুর মুখোমুখি করেনি, কেড়ে নিয়েছে তার বহু সঙ্গীকেও।
এখন তোতা মিয়ার বয়স সত্তরোর্ধ্ব। আগের মতো হাঁটাচলার শক্তি নেই। বয়সের ভারে শরীর অনেকটা নুয়ে পড়েছে। কথাও জড়িয়ে আসে মুখে। সমুদ্রের সেই ভয়ংকর অভিজ্ঞতার পর মানসিকভাবেও তিনি অনেকটা বদলে গেছেন। অনেক কথা ভুলে যান। সকালের ঘটনা দুপুরে মনে থাকে না। কখনো কখনো পরিচিত কথাও মনে করতে সময় লাগে। তবে বিস্ময়কর বিষয় হলো—সেদিনের স্মৃতিগুলো তিনি ভুলে যাননি। ডুবে যাওয়া ট্রলার, উত্তাল সমুদ্র, ভেসে থাকা বয়া, একের পর এক সঙ্গী চোখের সামনে হারিয়ে যাওয়া—সবই যেন আজও তার চোখের সামনে জীবন্ত।
ইলিশ ধরতে গিয়ে সেদিন কীভাবে ট্রলারটি ডুবে গিয়েছিল, সেই গল্পই শুনছিলাম তোতা মিয়ার কাছে। একটু থেমে থেমে তিনি বলতে থাকেন সেই রাতের কথা। বলেন, কীভাবে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছিলেন তিনি। কীভাবে একটিমাত্র ভাসমান বয়া হয়ে উঠেছিল তাদের বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন।
ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে তোতা মিয়া বলেন, সেদিন সমুদ্র ছিল উত্তাল। ঝড় আসছিল। সমুদ্রের অবস্থা খারাপ দেখে তারা তীরের দিকে ফিরতে শুরু করেন। তখন উপকূলের অদূরে মান্দারবাড়িয়ার চরের কাছাকাছি ছিল তাদের ট্রলার। তোতা মিয়া বলেন, ‘ঝড় ওঠার আগেই মনে হচ্ছিল, আজ কিছু একটা হতে চলেছে। সমুদ্রের অবস্থা ভালো ছিল না। তাই আমরা প্রস্তুত হচ্ছিলাম। ফ্লুটগুলো (একধরনের সাদা ভাসমান বল) বেঁধে নিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল, বিপদ হলে এগুলোই হয়তো কাজে লাগবে।’
তার সেই আশঙ্কা কিছুক্ষণের মধ্যে সত্যি হয়ে যায়। ঝড় আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে। বাতাসের গতি বাড়ে। ঢেউ একের পর এক আছড়ে পড়তে থাকে ট্রলারে। এর মধ্যেই পাশ থেকে আসা প্রবল এক ঢেউয়ে মুহূর্তের মধ্যে উল্টে যায় ট্রলারটি। তারপর শুরু হয় বাঁচার যুদ্ধ। ট্রলারের বিভিন্ন অংশ ধরে অনেকে ভেসে থাকার চেষ্টা করছিলেন। কেউ কোনোভাবে একটি ভাসমান বস্তু আঁকড়ে ধরেছেন, কেউ বয়া ধরে আছেন। কিন্তু ট্রলার থেকে যারা ছিটকে গিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই আর ফিরে আসতে পারেননি।
তোতা মিয়া বলেন, ‘একসময় অন্ধকার হয়ে এল। মাঝির কথা মতো সবাই সাঁতার দিতে লাগলাম। আমরা পশ্চিম দিকে যাচ্ছিলাম। প্রথমে তিনটা বয়া ধরে সবাই পাশাপাশি ছিলাম। তখন মনে হচ্ছিল, হয়তো বেঁচে যাব। কিন্তু সমুদ্র কাউকে এত সহজে ছাড়ে না। ঢেউয়ের তোড়ে একেকটি বয়া একেক দিকে সরে যেতে থাকে। পাশাপাশি থাকা মানুষগুলোর মধ্যেও ধীরে ধীরে দূরত্ব বাড়তে থাকে। যে মানুষগুলো কয়েক মুহূর্ত আগেও একে অপরের হাতের নাগালে ছিলেন, তারা ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছিলেন।’
‘মেঘ ছিল, বৃষ্টি হচ্ছিল। আকাশে বিজলি চমকাচ্ছিল। সন্ধ্যার পরও আমরা পাশাপাশি ছিলাম। বিজলীর আলোয় একে অন্যকে দেখা যাচ্ছিল। আস্তে আস্তে যে যার মতো হারিয়ে গেল। বয়াগুলোর দূরত্ব যখন বাড়ছিল, তখন মনে হচ্ছিল এটাই হয়তো শেষ দেখা।’
তোতা মিয়া সেদিনের সেই মুহূর্ত স্মরণে এলে এখনও শিউরে ওঠেন। তিনি বলেন, ‘একসময় বয়া পাশাপাশি থাকায় সবার কণ্ঠ শোনা যাচ্ছিল। কেউ চিৎকার করে আল্লাহকে ডাকছিলেন। কেউ মাকে ডাকছিলেন, কেউ বাবাকে। কেউ হয়তো স্ত্রী-সন্তানের কথা মনে করে কাঁদছিলেন। চারপাশে ছিল শুধু ঢেউ, বৃষ্টি, অন্ধকার আর মানুষের বাঁচার আকুতি। বয়া দূরে চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই কণ্ঠগুলোও দূরে চলে গেল। একসময় আর কারও আওয়াজ শুনতে পাইনি।’
বয়া ধরে তখন চারজন ভাসছিলেন। চারজন মানুষ, একটি বয়া, উত্তাল সমুদ্র। বেঁচে থাকার জন্য প্রত্যেকেরই ছিল মরিয়া চেষ্টা। কিন্তু সমুদ্রের সঙ্গে লড়াইয়ে ক্লান্তি যে কতটা ভয়ংকর, তা সেদিন চোখের সামনে দেখেছেন তোতা মিয়া।
‘একজন ক্লান্ত হয়ে বয়া ছেড়ে দিল। চোখের সামনে দেখলাম, সে তলিয়ে গেল। এরপর আমরা তিনজন ছিলাম এক বয়ায়,’ বলেন তিনি।
তখনও যুদ্ধ শেষ হয়নি। ঝড়ের তোড়ে বয়া ধরে রাখাই হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে বড় কষ্ট। কখনো মনে হচ্ছিল ঢেউ তাদের বয়া থেকে ছিটকে ফেলে দেবে। কখনো মনে হচ্ছিল আর শক্তি নেই। তবু বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষায় তারা বয়া আঁকড়ে ধরে ছিলেন। এভাবেই কেটে যায় রাত।
শেষ রাতের দিকে আকাশে তখনও বিজলি চমকাচ্ছিল। চারপাশ অন্ধকার, ক্লান্ত শরীর, অবসন্ন চোখ, আর মৃত্যুর অপেক্ষার মতো এক অনিশ্চয়তা। এমন সময় হঠাৎ দূরে জঙ্গলের মতো কিছু একটা দেখতে পান তোতা মিয়া। মনে হতে থাকে কূলের কাছাকাছি চলে এসেছেন। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ পায়ের তলায় মাটির স্পর্শ অনুভব করেন। বুঝতে পারেন—তারা চরে পৌঁছেছেন।
মৃত্যুর দীর্ঘ রাত পেরিয়ে অবশেষে কূলে উঠলেন তোতা মিয়ারা। সেদিন তারা পৌঁছেছিলেন নারিকেলবাড়িয়া-মান্দারবাড়িয়ায়। সেখানে তাদের সাহায্য করেছিলেন স্থানীয় ডাকাতরা। শুধু কূলে উঠতে সাহায্য করেই তারা থেমে থাকেননি, বাড়িতে ফেরার জন্য গাড়ি ভাড়ার টাকাও দিয়েছিলেন।
মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার সেই অভিজ্ঞতা তোতা মিয়ার জীবন বদলে দিয়েছে। সমুদ্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক থেকে তিনি জানেন, উত্তাল সাগরে টিকে থাকতে হলে শুধু সাহস থাকলেই হয় না, জানতে হয় কখন কী করতে হবে। তিনি বলেন, ‘সমুদ্রে বাঁচার কিছু কৌশল আছে। যারা অধৈর্য হবে, তারা মরবে। সমুদ্রে এমন পরিস্থিতিতে পড়লে শুধু ভেসে থাকার চেষ্টা করতে হবে। সাঁতার কাটার চেষ্টা করা বোকামি। ভেসে থাকতে পারলে ঢেউ তাকে একদিকে নিয়েই যাবে। কিন্তু সাঁতার কেটে কোনো গন্তব্যে যেতে চাইলে হয়রান হয়ে তলিয়ে যেতে হবে। তবে জলোচ্ছ্বাস থাকলে কোনো নিয়মই ঠিক থাকে না। তখনকার কথা বলা যায় না। পানির ঘূর্ণি যদি নিচের দিকে কাউকে টেনে নিতে পারে, তাহলে আর রক্ষা নাই।’
তোতা মিয়া যখন সেই রাতের গল্প বলছিলেন, তার পাশেই ছিলেন স্ত্রী। নীরবে স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন ওই নারী। কথাগুলো শুনতে শুনতে তার চোখে পানি জমে ওঠে। এত বছর পরও স্বামীর বেঁচে ফেরার লড়াই যেন তার কাছে পুরোনো কোনো গল্প নয়; বরং চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এক ভয়ংকর রাত।
তোতা মিয়ার স্ত্রী জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তির কথা জানালেন, স্বামীকে ফিরে পাওয়া। স্বামীর ফিরে আসাকে তিনি আজও আল্লাহর সবচেয়ে বড় উপহার মনে করেন। হয়তো ভালোবাসার টান এমনই। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও মানুষকে ফিরিয়ে আনে আপনজনের কাছে। স্ত্রী-সন্তান, মা-বাবা কিংবা ঘরের মানুষের কথা মনে পড়লে একজন জেলে আবারও আঁকড়ে ধরেন একটি বয়া, একটি কাঠের টুকরা কিংবা ট্রলারের কোনো ভাঙা অংশ।
এই ভালোবাসা বাঁচিয়ে রাখতেই সমুদ্রের সঙ্গে যুদ্ধ করেন জেলেরা। কেউ ফিরে আসেন, কেউ আর ফেরেন না। যারা ফিরে আসেন, তাদের চোখে থাকে বেঁচে থাকার আনন্দ। আর সেই আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে ইলিশের বাজারে—সমুদ্র থেকে উঠে আসা রুপালি মাছের ঝিলিকে, জেলে পরিবারের হাসিতে, আর ঘরে ফিরে আসা একজন মানুষকে ঘিরে আপনজনের স্বস্তির নিঃশ্বাসে। তোতা মিয়া তাদেরই একজন—যিনি একদিন মৃত্যুর হাত ধরে আবার ফিরে এসেছিলেন জীবনের কাছে।
