স্বপ্নের দেশ ইতালি বৈধ পথে যাওয়ার জন্য ৪৬ লাখ টাকা দিয়েও শেষ পর্যন্ত গন্তব্যে পৌঁছানো হলো না ঝিনাইদহের সোহেল রানা নামে এক যুবকের। অভিযোগ উঠেছে, একটি দালাল চক্র ইতালি পাঠানোর কথা বলে তাকে একের পর এক দেশে নেয়া হয়, জিম্মি করে মুক্তিপণ দাবি করে। টাকা দিতে না পারলে নির্যাতনের শিকার হতে হয়। অবশেষে দেড় বছর পর লাটভিয়ার একটি জঙ্গল থেকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধারের পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ৮ই অক্টোবর তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় নিহত সোহেলের স্ত্রী জেসমিন সুলতানা ঝিনাইদহের মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন ট্রাইব্যুনালে ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। মামলায় অভিযুক্তরা হলো- শামছুন্নাহার (৫৫), তার স্বামী শাহাজান সরকার (৫৮), তাদের দুই ছেলে সোহাগ (৩৫) ও নাসির সরকার (৩২), আবুল কালাম সরকারের ছেলে সোহেল রানা (৪১), শাহাজান সরকারের জামাই আব্দুর রাজ্জাক (৫০), সোহাগ সরকারের স্ত্রী তন্নি সরকার (৩২), রিয়াদ দেওয়ান (৩৫) ও শরিফুল সরকার ( ৪৮) কে আসামি করা হয়েছে। তাদের সবার বাড়ি রামচন্দ্রপুর গ্রামে। অভিযোগে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনের ধারা এবং দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা উল্লেখ করা হয়েছে। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, সোহেলকে বৈধ পথে ইতালি পাঠানোর কথা বলে প্রথমে ২৬ লাখ টাকা নেয়া হয়।
২০২৫ সালের ৬ই এপ্রিল তাকে কাতারে পাঠানো হয়। সেখানে ৯০ দিনের মধ্যে ইতালি নেয়ার আশ্বাস দেয়া হলেও তাকে কাজ দেয়া হয়নি। পরে দেশে ফেরার জন্য টিকিট পাঠানো হলে তাকে ফিরতে না দিয়ে মিসর হয়ে ইতালি পাঠানোর কথা বলে আরও পাঁচ লাখ টাকা দাবি করা হয়। অভিযোগ, ওই টাকা দেয়ার পর ২০২৬ সালের ১৪ই আগস্ট তাকে মিসরে পাঠানো হয়। অভিযোগে আরও বলা হয়, সোহেলকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয় এবং তার পাসপোর্ট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কেড়ে নেয়া হয়। পরে তাকে বিভিন্ন দেশের মধ্যদিয়ে বেলারুশ হয়ে লাটভিয়ায় নেয়া হয়। ২৫শে আগস্ট তার ফোন ব্যবহার করে পরিবারের কাছে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন তারিখে টাকা পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে। ৯ই অক্টোবর ইতালি থেকে অভিযুক্তদের একজন ফোন করে আরও সাড়ে চার লাখ টাকা দাবি করে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। নিহত সোহেলের শ্যালক ইশতিয়াক আহমেদ জানান, সোহেলকে বৈধ পথে ইতালি পাঠানোর কথা বলা হয়েছিল।
কিন্তু তাকে গত দেড় বছর ধরে বিভিন্ন দেশে ঘোরানো হয়। গত বেশ কিছুদিন যোগাযোগ করতে না পারায় পোল্যান্ডে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে তারা জানতে পারেন, লাটভিয়ার সীমান্তরক্ষীরা ৬ অক্টোবর তাকে জঙ্গল থেকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮ই অক্টোবর সকালে তার মৃত্যু হয়। মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানান তিনি। একই চক্রের শিকার ও সোহেলের এক সহযাত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তাকেও বৈধ পথে ইতালি পাঠানোর কথা বলে কাতারে নেয়া হয়েছিল।
পরে জানতে পারেন, ইতালিতে পৌঁছাতে তাকে অবৈধ পথে সীমান্ত পার হওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে হবে। বর্তমানে তিনি দালালের কথায় বিভিন্ন দেশে ঘুরছেন এবং ওই পথে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। এ ছাড়া তিনিসহ ১২ জন এখনো বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন বলে তার জানা। স্থানীয় ইউপি সদস্য শহিদুল ইসলাম বলেন, সোহেল রানার মৃত্যুর খবর তার শ্যালকসহ স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে শুনেছেন। বিদেশে লোক পাঠানোর এই চক্রটি রামচন্দ্রপুরসহ হলিধানী ইউনিয়নের আরও অন্তত ১৫ জনের কাছ থেকে ইতালি পাঠানোর কথা বলে অর্থ নিয়েছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন। তাদের মধ্যে একই এলাকার ১২ যুবক বর্তমানে বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
মামলার বাদীর জেসমিন সুলতানা অভিযোগে উল্লেখ করেন, টাকা ফেরত বা আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে কথা বলতে গেলে অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে মুঠোফোনে তাকে হুমকি দেয়া হয়। ১৫ই অক্টোবর তিনি ঝিনাইদহ সদর থানায় গেলে আদালতে মামলা করার পরামর্শ পান বলে অভিযোগে উল্লেখ করেছেন। সরজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, বিদেশে যাওয়ার জন্য দালালের খপ্পরে এক যুগ ধরে নিখোঁজ রয়েছেন একই এলাকার বেশ কয়েকজন। তাদের মধ্যে গাড়ামারা গ্রামের রসুল মিয়ার ছেলে রিপন মিয়া এবং রামচন্দ্রপুর গ্রামের পশ্চিমপাড়ার আব্দুল্লাহর ছেলে হামেদ আলী ও মৃত তাইজেল মাস্টারের ছেলে জগত আলীও রয়েছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তারা এক সঙ্গে নৌপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে দালালদের মাধ্যমে যাত্রা করেছিলেন। এরপর থেকে তাদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। দীর্ঘ ১ যুগ ধরে তাদের পরিবারের সদস্যরা অপেক্ষায় থাকলেও তারা জীবিত আছেন, নাকি তাদের মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাননি।
