আজকাল ওয়েবডেস্ক: অর্থনীতির জটিল সমীকরণে সাইকেলের কোনও প্রত্যক্ষ ভূমিকা থাকার কথা নয়, কিন্তু অমর্ত্য সেনের একটি সাধারণ দু’চাকার সাইকেল বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এক দলিল হয়ে রয়েছে। মূলধারার অর্থনীতি যখন নিছক জিডিপি আর জটিল গাণিতিক সূত্রের গোলকধাঁধায় বন্দি ছিল, তখন অমর্ত্য সেন বেছে নিয়েছিলেন এক নিখাদ মানবিক পথ। ১৯৯৮ সালে যখন তাঁকে অর্থনীতিতে নোবেল সম্মানে ভূষিত করা হয়, তখন রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস স্পষ্টভাবে বলেছিল যে তিনি অর্থনীতির মৌলিক সমস্যাগুলির আলোচনায় এক নৈতিক মাত্রা ফিরিয়ে এনেছেন। আর সেই নৈতিকতার শিকড় প্রোথিত ছিল একেবারে প্রান্তিক মানুষের দৈনন্দিন যন্ত্রণার গভীরে। এই নিয়ে সোমবার হঠাৎই নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদকে নিয়ে সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেছে নোবেল কমিটি। তাহলে কী এবারের সম্ভাব্য নোবেল প্রাপকের গবেষণার নির্যাসও অমর্ত্য সেনের 'যোগান-চাহিদা-ফলাফল' ভাবনার দ্বারা অনুপ্রাণিত? সেই ধোঁয়াশা অবশ্য জিইয়ে রেখেছে নোবেল কর্তৃপক্ষ।
পশ্চিমবঙ্গের গ্রামবাংলায় শিশুকন্যা ও শিশুপুত্রদের পুষ্টিগত ফারাক নিয়ে মাঠপর্যায়ের এক গবেষণার সময়েই জড়িয়ে পড়েছিল এই সাইকেলের গল্প। গবেষণার জন্য শিশুদের ওজন মাপতে গিয়ে এক অদ্ভুত বিপাকে পড়েছিলেন সেনের সহায়ক। শিশুরা কিছুতেই ওজন মাপার যন্ত্রে উঠতে চাইছিল না, এমনকি ক্ষুব্ধ হয়ে এক শিশু তাঁর সহায়কের হাতে কামড় পর্যন্ত বসিয়ে দেয়। তথ্যের খাতিরে পিছিয়ে না গিয়ে স্বয়ং অমর্ত্য সেন বিষয়টি নিজের কাঁধে তুলে নেন। একটি সাধারণ সাইকেলে চড়ে বাংলার মেঠো পথ ধরে গ্রামে গ্রামে ঘুরে তিনি নিজেই শিশুদের ওজন মাপার কাজ সম্পন্ন করেছিলেন। তৃণমূল স্তরের মানুষের প্রতি গভীর নিষ্ঠার স্মারক হিসেবে ব্যবহৃত সেই ঐতিহাসিক সাইকেলটি আজ স্থান পেয়েছে সুইডেনের নোবেল প্রাইজ মিউজিয়ামে।
অমর্ত্য সেনের এই মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতাই পরবর্তীতে বিশ্ব অর্থনীতির সনাতন ধ্যানধারণা আমূল বদলে দেয়। দার্শনিক মার্থা নূসবমের সঙ্গে যৌথভাবে তাঁর গড়ে তোলা ‘ক্যাপাবিলিটিজ অ্যাপ্রোচ’ প্রমাণ করে যে, একজন মানুষের ভাল থাকা কেবল তাঁর আয়ের অঙ্ক দিয়ে মাপা যায় না; বরং সুস্থ থাকা, সুশিক্ষিত হওয়া এবং নিজের মতপ্রকাশের মতো মৌলিক স্বাধীনতা তাঁর কতটা রয়েছে, সেটাই উন্নয়নের আসল মাপকাঠি। রাষ্ট্রসংঘের মানব উন্নয়ন সূচক বা ‘এইচডিআই’-এর ভিত্তি দাঁড়িয়ে রয়েছে এই ভাবনার ওপরই। একইভাবে ১৯৪৩ সালের বাংলার মন্বন্তরের ওপর তাঁর বিখ্যাত ‘এনটাইটেলমেন্ট থিওরি’ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল যে খাদ্যের অভাবে নয়, বরং খাদ্য কেনার ক্ষমতা ও বণ্টনের ব্যর্থতার কারণেই অনাহার আর দুর্ভিক্ষ নেমে আসে। দর্শন ও অর্থনীতিকে একসূত্রে বেঁধে সংখ্যাতত্ত্বের ঊর্ধ্বে মানুষকে বসিয়েছিলেন বলেই অমর্ত্য সেনের অর্থনীতি কেবল তত্ত্ব নয়, হয়ে উঠেছিল মানবিক মুক্তির দিশা।
