চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার চরতী ইউনিয়নে ৪০ হাজার টাকা পাওনাকে কেন্দ্র করে বিরোধ, মারধর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইয়াবা কারবারের অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়া এবং বালুর পয়েন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। সংঘর্ষে আহত একজন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এক পক্ষের বসতভিটা ও সম্পদে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগও উঠেছে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সরেজমিনে স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ২০ অক্টোবর চরতী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের দরগাহ পাড়া সোনাইছড়ি এলাকায় বিরোধের সূত্রপাত হয়। তবে ঘটনার বিভিন্ন পর্যায় নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য ও অভিযোগের নিরপেক্ষ যাচাই প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
দুবাইপ্রবাসী গিয়াসউদ্দিনের দাবি, একই এলাকার প্রবাসী সালমান আকবরের কাছে তাঁর প্রায় ৪০ হাজার টাকা পাওনা ছিল। সম্প্রতি সুইপুরা বাজারে ওই টাকা চাইতে গেলে সালমান আকবর, রোহান ও তাঁদের সহযোগীরা তাঁর ওপর হামলা চালিয়ে মারধর করেন।
গিয়াসউদ্দিনের অভিযোগ, পরদিন রাতে তাঁর ছোট ভাই রিয়াজউদ্দিন সুইপুরা বাজারে গেলে তাঁকেও কাঠ ও কাঠের তক্তা দিয়ে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে তাঁকে পাশের একটি পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়। পরে পুকুর থেকে তুলে বাজারের একটি বেঞ্চে বসিয়ে তাঁর ভিডিও ধারণ করা হয়। ওই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে তাঁকে ইয়াবা কারবারি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে দাবি করেছে পরিবারটি। তাদের অভিযোগ, সামাজিকভাবে হেয় করা এবং বালুর ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার উদ্দেশ্যে এসব করা হয়েছে। তবে মাদক কারবারের অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, গিয়াসউদ্দিন ও রিয়াজউদ্দিন এলাকা ছেড়ে যাওয়ার পর তাঁদের পরিচালিত বালুর পয়েন্টে ডাম্পার নিয়ে বালু তুলতে যান গিলমান আকবর ও তাঁর সহযোগীরা। খবর পেয়ে রিয়াজউদ্দিন সেখানে গেলে দুই পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতি শুরু হয়।
সংঘর্ষে গিলমান আকবর গুরুতর আহত হন। পরে তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। এ সময় একটি গাড়িও ভাঙচুর করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, গিলমান আকবরের বিরুদ্ধে এর আগেও মাদক-সংশ্লিষ্ট অভিযোগ ছিল। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট নথি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য প্রয়োজন।
সংঘর্ষের পর গিয়াসউদ্দিনের পরিবারের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, প্রতিপক্ষের লোকজন তাঁদের প্রায় ৫০ লাখ টাকা মূল্যের পানবরজ কেটে নষ্ট করেছে, দুটি গরু নিয়ে গেছে এবং একটি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।
পরিবারটির দাবি, এসব ঘটনায় তাঁদের অন্তত ১৪ থেকে ১৬ লাখ টাকার দৃশ্যমান ক্ষতি হয়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। গিয়াসউদ্দিন বলেন, “পাওনা টাকা চাওয়াই আমাদের জন্য কাল হলো। তারা প্রভাবশালী হওয়ায় উল্টো আমাদের মাদক কারবারি বানিয়ে ভিডিও ছড়াল এবং আমাদের বালুর পয়েন্ট দখল করতে চাইল। এখন আমাদের বাড়িঘর ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে, আমরা ভয়ে আত্মগোপনে আছি।”
এদিকে, ঘটনার পর রিয়াজউদ্দিনকে স্থানীয় কয়েকজন মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দেন বলে জানা গেছে। পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠায়। পরে অবস্থার অবনতি হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দেন।
সুইপুরা বাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, গিয়াসউদ্দিন ও রিয়াজউদ্দিনের সঙ্গে সালমানদের বিরোধ দীর্ঘদিনের। তাঁর মতে, বাজারের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করলে প্রথমে কে হামলা করেছে, তা নির্ধারণে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টিও তদন্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। আরেক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, দুই পক্ষের বিরোধের পেছনে বালুর ব্যবসা ও এলাকাভিত্তিক প্রভাব বিস্তারের বিষয় থাকতে পারে। তবে প্রকৃত ঘটনা জানতে নিরপেক্ষ তদন্তের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
চরতী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের গ্রাম পুলিশ আবদু ছবুর বলেন, “টাকা-পয়সার লেনদেন এবং বালুর পয়েন্ট নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যেই দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এটি কেবল একতরফা মাদকের ঘটনা নয়। এলাকায় বালুর ব্যবসা ও প্রভাব খাটানো নিয়েই ঘটনাটি এতদূর গড়িয়েছে।”
চরতী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হানিফ চৌধুরী বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। সুইপুরা বাজারে মারধর এবং বালুর পয়েন্টে সংঘর্ষের খবর পেয়ে তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিরপেক্ষ তদন্তের অনুরোধ জানিয়েছেন। কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারেন না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। মাদকের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা পুলিশ তদন্ত করে দেখবে বলে জানান তিনি।
মামলার বাদী মোহাম্মদ হারুনের বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরিফুল ইসলাম ছিদ্দিকী জানান, সুইপুরা বাজারের ঘটনা ও বালুর পয়েন্টে সংঘর্ষের বিষয়ে পুলিশ অবগত রয়েছে এবং এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। সংঘর্ষে আহত একজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
তিনি আরও জানান, সিসিটিভি ফুটেজ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও বিশ্লেষণ করে ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে। মামলার প্রথম আসামিকে স্থানীয়রা মারধর করে গুরুতর আহত অবস্থায় পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন বলেও জানান তিনি। কারও ওপর অন্যায়ভাবে হামলা বা সম্পত্তি নষ্টের ঘটনা ঘটলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, পাওনা টাকা নিয়ে বিরোধ, বালুর পয়েন্টের নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অভিযোগ—সব দিক বিবেচনায় নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করা প্রয়োজন। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
The post সাতকানিয়ায় পাওনা টাকা নিয়ে সংঘর্ষ, সম্পদ লুটের অভিযোগ appeared first on ভোরের চেতনা.
