পিরোজপুরের অন্যতম অর্থকরী ফসল সুপারি। কম খরচে বেশি লাভের আশায় বাড়ছে এর চাষ। আকর্ষণীয় রং ও আকারে বড় হওয়ায় এ অঞ্চলের সুপারির চাহিদা রয়েছে দেশজুড়ে। পাইকারদের হাত ঘুরে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। তবে, লবণাক্ততা ও পরিবেশগত নানা কারণে দিন দিন কমছে সুপারির ফলন। উৎপাদন কমে যাওয়ায় কাঙ্ক্ষিত লাভ পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন চাষিরা।
কাউখালী সুপারির হাটে গিয়ে দেখা গেছে, ভোরের আলো ফুটতেই ক্রেতা-বিক্রেতার দর-কষাকষিতে মুখর হয়ে ওঠে এ হাট। শুক্র ও সোমবার— এই দুই দিন কোটি টাকার সুপারি বেচাকেনা হয় এখানে। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এ হাটের সুপারি সরবরাহ করা হচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। এই হাটের সুপারির ব্যবসাকে কেন্দ্র করে কর্মসংস্থান হয়েছে শতাধিক মানুষের।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, প্রতি বছর সুপারির মৌসুমে কাউখালীর এ হাটসহ আশপাশের বিভিন্ন বাজার থেকে সুপারি কেনেন তারা। পরে কাঁচা সুপারি শুকিয়ে কিংবা পানিতে ভিজিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। এরপর চাহিদা অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয়। সুপারি কেনাবেচাকে ঘিরে এ হাটে নিয়মিত কাজ করেন শতাধিক মানুষ। তারা সুপারি বাছাই, পরিবহন, কেনাবেচা ও অন্যান্য কাজে সহযোগিতা করে জীবিকা নির্বাহ করেন। ফলে, এ বাজার শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র নয়, স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানেরও গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কাউখালীর সুপারি ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। এ হাটে ২১ ঘার বা ২১০টি কাঁচা সুপারি নিয়ে এক কুড়ি হিসাব করা হয়। শ্রেণিভেদে প্রতি কুড়ি কাঁচা সুপারি বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৭০০ টাকায়। অন্যদিকে, প্রতি মণ বা ৪০ কেজি শুকনো সুপারি বিক্রি হচ্ছে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকায়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ৪ হাজার ৬৬৯ হেক্টর জমিতে সুপারির আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্য ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৬৭৬ মেট্রিক টন। আনুমানিক বাজার মূল্য ৮৪০ থেকে ৯৩০ কোটি টাকা। পিরোজপুর সদর, কাউখালী, নেছারাবাদসহ সাত উপজেলায় গত বছরের চেয়ে এবার সুপারির ফলন কম হয়েছে। বড় মোকামে চাহিদা কম থাকলেও স্থানীয় বাজারে ভালো চাহিদা থাকায় মিলছে কাঙ্ক্ষিত দাম।
সুপারি চাষি আল-আমীন এ প্রতিবেদককে বলেছেন, “গত বছরের তুলনায় এবছর ফলন কম হয়েছে। তবে, ফলন কম হলেও দাম ভালো পাচ্ছি। আশা করি, সামনের বছর সুপারির ভালো ফলন হবে।”
কৃষক মোতালেব হাওলাদার বলেন, “গত বছর যে বাগানে ২ লাখ টাকার সুপারি বিক্রি করছি। সেই বাগানে এবছর ১ লাখ টাকার সুপারি বিক্রি করতে পারব না। ফলন কম হওয়ার এবার লোকসান হয়েছে।”
বাজারের ব্যবসায়ী ফোরকান মিয়া জানান, এবছর সুপারির সরবরাহ কম হওয়ায় দাম অনেক বেশি। গত বছর এ সময় প্রতি হাটে ২১ ঘা বা ২১০টি কাঁচা সুপারি পাইকারি বিক্রি হয়েছে ৩০০-৫০০ টাকায়। তবে এবার তা বিক্রি হচ্ছে ৫০০-৭০০ টাকায়। ফলে, গত বছরের তুলনায় এবার সুপারির দাম অন্তত ৩০ শতাংশ বেশি।
নেছারাবাদ উপজেলার সুপারি ব্যবসায়ী ফয়সাল হোসাইন বলেন, “এই সিজনে আমি সুপারি কিনে মাটিরি নিচে পলিথিন সংরক্ষণ করি। প্রায় ৬ মাস এভাবে রাখার পরে এগুলো বিক্রি করা হবে। তখন কাঁচা সুপারি না থাকায় ভাল দাম পাওয়া যায়। তাই, আমি এই পদ্ধতিতে সুপারি রাখি।”
বাজারের ইজারাদার রফিকুল ইসলাম জানান, কাউখালীর এই বাজারটি শত বছরের পুরনো। এখানে পিরোজপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলাসহ ঝালকাঠি থেকেও সুপারি বিক্রি করতে আসেন লোকজন। মূলত, বাজারের খাজনা কম হওয়ায় ক্রমেই বাড়ছে ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতি। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সপ্তাহের শুক্র ও সোমাবার নিয়মিত এ বাজার বসবে।”
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সৌমিত্র সরকার জানান, পিরোজপুরে এবার সুপারির ফলন কম হয়েছে। অন্যান্য ফসলের তুলনায় সুপারি লাভজনক। তাই, অনেকেই এখন সুপারির বাণিজ্যিক বাগান করছেন। তবে, গত বছরের তুলনায় এবার ফলন কম হওয়ায় বাজারে দাম বেশি পাচ্ছে কৃষক।
তিনি আরও বলেন, সুপারি চাষে নিয়মিত পরিচর্যার বিষয়ে পরামর্শসহ চাষিদের বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা দিচ্ছে কৃষি বিভাগ।
