আজকাল ওয়েবডেস্ক: স্মার্টফোনে হাত ছোঁয়ালেই যখন পুজোর সময় মেলে, মোবাইলের অ্যালার্ম পুজোর লগ্নের জানান দেয়, তখনও সন্ধি পুজোর সময় জানাতে গর্জে ওঠে ৩৫০ বছরের পুরনো কামান। মুর্শিদাবাদের কান্দির ছাতিনা কান্দির গোপীবাবুর বাড়ির সন্ধিপুজোর কামান ফাটানো শুধু একটি পারিবারিক রীতি নয়, এটি গোটা কান্দি মহকুমার ঐতিহ্য, ইতিহাস আর পরম্পরার জীবন্ত দলিল।
পারিবারিক রীতি মেনে সোমবার ভোরে মহাঅষ্টমীর পুজো শেষ এবং মহানবমীর পুজো শুরুর মাঝের সেই মহাসন্ধিক্ষণে ফের একবার গর্জে উঠল এই ঐতিহাসিক কামান। আর সেই গর্জন শুনতেই ভোরের আলো ফোটার আগেই ছাতিনা কান্দির গোপীবাবুর বাড়ির প্রাঙ্গণে ভিড় জমালেন শত শত মানুষ।
প্রসঙ্গত, দুর্গাপুজোর সবচেয়ে পবিত্র এবং রহস্যময় মুহূর্ত হল সন্ধিপুজো। অষ্টমী তিথির শেষ ২৪ মিনিট এবং নবমী তিথির শুরুর ২৪ মিনিট, এই মোট ৪৮ মিনিটের সন্ধিক্ষণেই দেবী চামুন্ডা রূপে অসুর নিধন করেছিলেন বলে বিশ্বাস। এই ৪৮ মিনিটের মধ্যেই হয় সন্ধিপুজো ও বলিদান।
ছাতিনা কান্দির গোপীবাবুর বাড়িতে এই পুজোকে কেন্দ্র করেই রয়েছে কামান ফাটানোর ৩৫০ বছরের প্রাচীন প্রথা। এখানে সন্ধিপুজোয় দু'বার কামান ফাটানো হয়। একবার সন্ধিপুজো শুরুর লগ্নে এবং আরেকবার ঠিক অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে, যখন বলিদান হয়।
এলাকার বাসিন্দা রক্তিম সিদ্ধান্ত বলেন, "ছোটবেলা থেকেই আমরা গোপীবাবুর বাড়ির কামান ফাটানো দেখে আসছি। এটা আমাদের কাছে পুজোর একটা অঙ্গ। প্রথম কামান ফাটলেই আমরা বুঝি সন্ধিপুজো শুরু হল, আর দ্বিতীয় কামানের আওয়াজে বলিদানের মুহূর্ত।"
এই রীতির পেছনে রয়েছে এক চমকপ্রদ ইতিহাস। আজ থেকে কয়েকশো বছর আগে যখন হাতঘড়ি বা দেওয়াল ঘড়ির প্রচলন হয়নি, গ্রাম বাংলার মানুষ সময় জানতেন সূর্য দেখে বা ঢাকের আওয়াজ শুনে। সেই সময় কান্দি ও তার আশপাশের ছাতিনা কান্দি সহ বিভিন্ন গ্রামের দুর্গাপুজো কখন শুরু হবে, তা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হত।
তখনই এই সমস্যার সমাধান করে দিয়েছিল গোপীবাবুদের বাড়ির এই কামান। পঞ্জিকা মতে সন্ধিপুজোর নির্ভুল লগ্ন গণনা করে এই বাড়ি থেকেই কামান দাগা হত। আর সেই প্রচণ্ড আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ত মাঠ-ঘাট পেরিয়ে আশেপাশের বহু গ্রামে। সেই আওয়াজ শুনেই আশেপাশের সমস্ত পুজো মণ্ডপের পুরোহিতরা সন্ধিপুজো শুরু করতেন।
আর এক স্থানীয় বাসিন্দা সৌরভ কুমার সিদ্ধান্ত জানান, "এই রীতি এখনও বর্তমান। এখন ঘড়ি আছে, মাইক আছে, কিন্তু এখনও অনেক পুরোনো পুজো বাড়ি এই কামানের আওয়াজ শুনেই সন্ধিপুজো শুরু করেন। এটা আমাদের কাছে একটা আবেগ। দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ এই দৃশ্য দেখতে আসেন। সন্ধিপুজোর সময় প্রতি বছর বদলায়, কিন্তু এই কামান ফাটানোর উৎসাহ একই থাকে।"
আসলে, দুর্গাপুজো শুধু থিম আর আলোর প্রতিযোগিতা নয়। পুজো মানে পরম্পরা। আর ছাতিনা কান্দির গোপীবাবুর বাড়ির এই কামান সেই পরম্পরাকেই আজও বাঁচিয়ে রেখেছে।
