অধিকৃত পশ্চিম তীরে গতকাল একদল ইউরোপীয় কূটনীতিকের ওপর হামলা চালিয়েছেন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা। এর এক দিন আগে ওয়াশিংটন পোস্টের এক সাংবাদিকও বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় আহত হন। তবে এ ধরনের ঘটনা নিয়ে বরাবরই সন্দেহ প্রকাশ করে আসছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। কূটনীতিকদের ওপর হামলার খবরের পর চাইলেন প্রমাণ। খবর সিএনএনের।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ও ফিলিস্তিনের সরকারি বার্তা সংস্থা ওয়াফার তথ্যানুযায়ী, রামাল্লাহর পূর্বে অবস্থিত ফিলিস্তিনি খ্রিষ্টান অধ্যুষিত তাইবেহ গ্রামে ইউরোপীয় কূটনীতিকদের দলটির ওপর হামলা চালান বসতি স্থাপনকারীরা। ওই কূটনীতিকরা ছিলেন ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও পোল্যান্ডের প্রতিনিধি।
এ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাক্সিম প্রেভো। তিনি বলেছেন, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের নীতির সঙ্গে এই হামলার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক বিবৃতিতে প্রেভো বলেন, ‘দখলদার শক্তি হিসেবে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ফিলিস্তিনিদের সুরক্ষা দেয়া, কূটনীতিক ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হামলার জন্য দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা।’
তিনি আরো বলেন, ‘সহিংস ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের দায়মুক্তির অবসান ঘটাতে হবে।’ তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দলের মধ্যে ক্যাথলিক প্রতিনিধিরাও ছিলেন।
পোল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক বিবৃতিতে হামলার নিন্দা জানিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমরা আশা করি, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জরুরি ভিত্তিতে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেবে, হামলার জন্য দায়ীদের শনাক্ত করবে এবং তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করবে।’
মন্ত্রণালয় আরো বলেছে, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার বিরোধিতা পোল্যান্ড বরাবরই করে এসেছে। কূটনৈতিক কোরের সদস্যদের ওপর হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে হামলাটিকে ‘আপত্তিকর’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি ইসরায়েল সরকারকে অবিলম্বে হামলার জন্য দায়ীদের গ্রেফতারের আহ্বান জানিয়েছেন।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ভাইস প্রেসিডেন্ট হুসেইন আল-শেখ এই হামলার জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করে দেশটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের ফিলিস্তিনি জনগণ প্রতিদিন যে মাত্রার সন্ত্রাসের শিকার হচ্ছেন, এই ঘটনা তারই একটি ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি। ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য আন্তর্জাতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে দৃঢ় আন্তর্জাতিক অবস্থান নেয়া প্রয়োজন।’
ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সার হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, ইসরায়েলি দাঙ্গাকারীদের গুরুতর সহিংস কর্মকাণ্ডের তিনি তীব্র নিন্দা জানাচ্ছেন। তিনি আরো বলেন, ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তা করছে।
অন্যদিকে, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, হামলার সময় ওই এলাকায় তাদের কোনো সেনা ছিল না। এছাড়া কূটনীতিকদের এই সফরের বিষয়ে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে আগে থেকে সমন্বয় করা হয়নি।
কূটনীতিকদের ওপর হামলার এক দিন আগে আরেকটি ঘটনা ঘটে। সেদিন বার্ষিক জলপাই সংগ্রহের মৌসুম শুরুর সময় একদল ফিলিস্তিনির সঙ্গে থাকা ওয়াশিংটন পোস্টের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক হেইডি লেভিনের ওপর হামলা চালান বসতি স্থাপনকারীরা।
ওই হামলায় আহত লেভিনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং তার অস্ত্রোপচার করতে হয়। তিনি জানান, হামলাকারীরা তার ক্যামেরা ও পাসপোর্ট চুরি করেছেন। লেভিনের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ১০ মিনিট ধরে হামলা চলে। অথচ তার পরনে স্পষ্টভাবে ‘প্রেস’ লেখা সুরক্ষাবর্ম ছিল।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এর আগেও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতাকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। লেভিনের ওপর হামলার বিষয়েও তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন।
নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘যেকোনো ব্যক্তির ওপর সহিংসতার আমরা দ্ব্যর্থহীনভাবে নিন্দা জানাই।’ তবে ভিডিওতে লেভিনের ওপর হামলা চালাতে দেখা যাওয়া মুখোশধারী ও সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারীদের কর্মকাণ্ডের নিন্দা তিনি জানাননি।
শনিবারের হামলার ঘটনা নিয়েও নেতানিয়াহু আবার সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তার কার্যালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘গুরুতর অভিযোগের জন্য গুরুতর প্রমাণ প্রয়োজন।’
অন্যদিকে ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সার এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ কূটনীতিকদের ওপর হামলার স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন নিন্দা জানিয়েছেন। হারজগ ঘটনাটিকে ‘আপত্তিকর ও মর্মান্তিক সহিংসতা’ বলে অভিহিত করেছেন।
